আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

সানা খান

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব
ছবি: প্রেস টিভি

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি, বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং এবং সর্বশেষ দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর ইসরাইলি ও মার্কিন বিমান হামলার পরও টিকে আছে ইরানের ইসলামপন্থি সরকার। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সরকার পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকি বাস্তবায়নে তিনি ইরানে যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারেন।

সে জন্য ইরানের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ প্রস্তুতিও জোরদার করছে। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে তাদের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের কাছাকাছি পাঠিয়েছে। পথে রয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। পাশাপাশি অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করার যে হুমকি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে বৃহত্তর পরিসরে যুদ্ধে না জড়িয়ে ভেনেজুয়েলার মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থাপনাগুলো টার্গেট করা হতে পারে বলে মার্কিন ও পশ্চিমা অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সীমিত হামলার মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ ধর্মীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের হত্যা কিংবা আটক করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে ট্রাম্পের। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও ধ্বংস করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের। এই পরিস্থিতিতে খামেনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছেন। তিনি এমন একসময়ে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন, যখন এই দেশ দুটো মধ্যপ্রাচ্যের বা আঞ্চলিক মানচিত্রকে নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণ করছে।

সংগতভাবেই যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, তা হলোÑআলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করে খামেনি কি পারবেন ইসলামি বিপ্লবের পথচলা অব্যাহত রেখে ৪৮তম বার্ষিকী উদযাপন করতে? নাকি ৪৭তম বছরেই থেমে যাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পথ চলা? খোমেনির পর ১৯৮৯ সালে ৪৯ বছর বয়সে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হন তিনি। এরপর থেকে ৩৬ বছর ধরে সুপ্রিম লিডার হিসেবে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন খামেনি। এর আগে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার ৩৬ বছরের শাসনামলের এই পর্যায়ে এসে ৮৬ বছর বয়সি খামেনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছেন। ইসলামি শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক চাপের ভারসাম্য বজায় রাখাই তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা না করার ওপর নির্ভর করছে ইরান এবং তার আশপাশের অঞ্চলের ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ।

ইরানে চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের সাম্প্রতিক ব্যাপক আন্দোলন দমনে সরকার সহিংস পন্থা অবলম্বন করায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ট্রাম্প এ বিষয়টিকে সামনে এনে এর সঙ্গে পরমাণু ইস্যু যুক্ত করে ইরানে হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। খামেনি এই কঠিন সময় কীভাবে মোকাবিলা করবেনÑসেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও খামেনির প্রভাব আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। প্রধান মিত্রদের মধ্যে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি এখন দুর্বল এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও ক্ষমতায় নেই। গাজা উপত্যকার হামাস অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এবং ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীও এখন নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রধান মিত্র এবং প্রতিনিধিরা দুর্বল হয়ে পড়ায় বা পতন ঘটায় ইরানও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। তদুপরি গত বছর জুন মাসে ইসরাইলি এবং মার্কিন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি এখনো পঙ্গু।

কিন্তু তা সত্ত্বেও খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা এবং তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অতীতে বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব এবং বিদেশি চাপ মোকাবিলা করে ইসলামি বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে ৮৬ বছর বয়সি এই বয়োবৃদ্ধ নেতার। কিন্তু এবার তিনি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, কর্তৃত্ব এমনকি নিজের জীবনও এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে কারাবাস, ব্যাপক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং হত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে থাকা খামেনি নিঃসন্দেহে একজন লড়াকু মানুষ। খামেনি একটি অনুগত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে আপেক্ষিক দুর্বলতা থেকে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল রপ্ত করার পর্যায়ে নিজেকে উন্নীত করেছেন। তার শাসনামলের প্রথমদিকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তার ধর্মীয় যোগ্যতার অভাব ছিল। কিন্তু তিনি আইআরজিসি, বাসিজ এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সেতাদ নামে পরিচিত একটি বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের মাধ্যমে তার ক্ষমতা একীভূত করেছিলেন।

এগুলো তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত ও সামরিক উদ্যোগের তহবিল সংগ্রহের ক্ষমতা উভয়কেই শক্তিশালী করেছে। ক্ষমতার ওপর শক্ত দখল বজায় রাখার জন্য প্রতিশ্রুতবদ্ধ একজন নেতা হিসেবে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার অভিজ্ঞতা ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে দৃঢ় করে তুলেছে।

খামেনি একটি সুগঠিত নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেন, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর ওপর ব্যাপক নির্ভর করেন তিনি। এসব বাহিনী অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিক্ষোভ দমন করে থাকে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যু এবং সর্বশেষ গত মাসের (জানুয়ারি) ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর অস্থিরতা দমনে এই বাহিনীগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এ জন্যই খামেনি ট্রাম্পের হামলার হুমকির জবাবে পাল্টা হুমকিও দিয়েছেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জেনেভায় দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরুর দিনই যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খামেনি। সেদিন তেহরানে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ইরান চাইলে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দেওয়া’ সম্ভব। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও এমন আঘাত পেতে পারে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো তাদের জন্য কঠিন হবে। খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা বলছে। যুদ্ধজাহাজ নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক, তবে আমাদের কাছে এমন অস্ত্রও আছে, যা সেই জাহাজকে সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দিতে পারে।

এদিকে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড ও বিভিন্ন উদ্ধার সংস্থাকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ইসরাইলি গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। দৈনিক ইয়েডিওথ আহরোনোথ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থায় ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে।

ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার ১৯ ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করে গতকাল রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) নির্ধারণ করা হয়েছিল। কেএএনর খবর অনুযায়ী, ইরানের ব্যালাস্টিক মিসাইল সিস্টেমে আঘাত করার জন্য ইসরাইল ট্রাম্প প্রশাসনের সবুজসংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে। ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন বলেছেন, ‘আমরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে হামলার অনেক কাছাকাছি অবস্থানে আছি।’

নেতানিয়াহুর সরকার মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান তার প্রথম প্রতিক্রিয়া জানাবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। দুই ইসরাইলি সূত্রের বরাতে সিএনএন আরবি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত আক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ায় ইসরাইলও ইরানি মিসাইল হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন