আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দেখা-অদেখা দুর্নীতি : ঠেকানোর নতুন কায়দা কী

খাজা মাঈন উদ্দিন

দেখা-অদেখা দুর্নীতি : ঠেকানোর নতুন কায়দা কী

নাগরিকের সুস্থ ও সুষ্ঠু জীবনযাত্রা এবং শাসন পরিচালনায় বাংলাদেশের এক নম্বর সমস্যার নাম দুর্নীতি এ কথা সচেতন জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাই জানেন, স্বীকার করেন এবং অনেকে বলেনও। কিন্তু দুর্নীতি রোধ বা প্রতিরোধের প্রসঙ্গ এলেই এমন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুরু হয়ে যায় যে বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোঝাপড়ার বাইরে চলে যায়, ঘটমান দুর্নীতির কারবারও থেকে যায় জনসমাজের প্রতিকার পাওয়ার ঊর্ধ্বে।

দীর্ঘদিন দুর্নীতিতে ডুবে থাকা দেশে আজ আশার কথা এই যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও শরিকদের সরকার দুর্নীতি দমনকে এই মেয়াদের অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই কাজে সরকারকে সফল করে দেশের জনগণকে মুক্তি দিতে বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টান্তসহ গঠনমূলক আলোচনা হওয়া দরকার।

বিজ্ঞাপন

আমরা জেনেও জানি না যে প্রতিদিন শহরের ফুটপাত ও কাঁচাবাজারের সবজি এবং ফল বিক্রেতাদের দিতে হয় এক ধরনের অঘোষিত ‘কর’, যা আবার নগর কর্তৃপক্ষ বা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। গ্রামের কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখনই তথাকথিত বাজার সরবরাহ ব্যবস্থায় নিজেদের মাথা ঢুকিয়ে দেন, সঙ্গে সঙ্গেই কিছু ‘ইনাম’ দিতে হয় জনপরিসর, যাদের ‘বাপ-দাদার সম্পত্তি’ তাদের।

একেবারেই সাধারণ মানুষ জমির খাজনা দিতে যান আর সেবাপ্রাপ্তির বিল পরিশোধের উদ্দেশ্যে অফিস-আদালতে হাজির হন, তাদের ‘হাতের ময়লা’ কিছু একটা না দিলে চেয়ার-টেবিল নড়ে না, ফাইলও কথা বলে না। একজন চাকরিপ্রার্থী বিদেশে পাড়ি জমাতে সচেষ্ট হলে কিংবা কেউ ব্যবসা করার উদ্যোগ নিলে পদে পদে কিছু খরচপত্র না করলে অনুমতি মেলে না।

সাম্প্রতিক দশকে সরকারি কোনো সেবা নিতে গেলেই মানুষ বুঝতে পেরেছেন কতটা ‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’ তারা। জনগণকে কষ্ট দেওয়ায় দুর্নাম হয় শুধু দু-একটি বিভাগের অথচ এমন কোনো সেক্টর কি আছে এ দেশে, যেখানে জনগণ নির্বিঘ্নে সেবা পেতে পারেন?

উৎকোচ, বকশিশ, স্পিড মানি, কমিশন (বৈধ ব্যবসার বাইরে), আন্ডারহ্যান্ড ডিলিংস, চাঁদা, বখরা এবং সমঝোতার মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্তি বা অন্যজনের অর্থ-সম্পদ জুলুম করে বেদখলÑতাকে যে নামেই ডাকি না কেন, তা আসলে নাগরিকদের ক্ষমতাশালীদের কাছে অসহায় করে ফেলা নৈতিকতা-বিবর্জিত অপকর্ম ওরফে দুর্নীতি।

তবে ‘ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না’; এ দেশের মানুষ দুর্নীতিপ্রবণ শাসন ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার ভোগান্তিতে সংক্ষুব্ধ হন, কিন্তু দিন শেষে তারা আবার এই ব্যবস্থাকে জীবনের নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা বা ‘নিউ নরমাল’ ভেবে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে মনোনিবেশ করেন।

বিষয়টি এমনও নয় যে, সমাজের সব মানুষ দুর্নীতিকে শেষ পর্যন্ত মেনে নেন। যখন নিজেই ক্ষমতাশালী হওয়া বা তদবির করা ছাড়া সরকারি কোনো কাজ এমনকি সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না, তখন বোঝা যায় দুর্নীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শক্ত বাসাই বেঁধেছে।

অনেক বছর আগে এই লেখকের এক ইউরোপিয়ান শিক্ষক ঢাকার বাইরে যাওয়ার সময় ট্রেনের টিকিট পাচ্ছিলেন না। তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি নিজেই ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। ভদ্রলোকের মন্তব্য ছিল : ‘আই লাভ থিস কান্ট্রি। নাথিং ইজ সার্টন, এভরিথিং ইজ পসিবল। (এই দেশটিকে আমি ভালোবাসি। এখানে কিছুই নিশ্চিত নয়, সবকিছুই সম্ভব।)’

দৈনন্দিন জীবনে মানুষ যেসব দুর্নীতির শিকার হয় এবং বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-পরিজনের ভোগান্তির গল্প শোনে, সেখানে তাদের আলোচনা নিবদ্ধ থাকে এবং ওই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ না দেখে হতাশাও হয়। তবু এই ‘পেটি করাপশন’ বা ‘ছোট’ দুর্নীতি সম্পর্কে অনুসন্ধানী, গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন এবং প্রতিকারের সরকারি আয়োজন কমই চোখে পড়ে।

এসব দুর্নীতি থেকে জনগণকে মুক্ত রাখতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কার্যকর করতে হয় এবং গণতান্ত্রিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে সাহসী ভূমিকা নিতে হয়। উল্টোদিকে, দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি করলেও ক্ষমতাধরদের সুরক্ষা (দায়মুক্তি) দেওয়ায় অথবা সাবেক অর্থমন্ত্রীর ঘুসকে স্পিড মানি বলার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় পায় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত দুর্নীতি বাস্তবায়ন কমিশনে পরিণত হয়।

অন্যদিকে পরোক্ষ অথচ বড় দুর্নীতি নিয়ে নানা মাধ্যমে শুধু মুখরোচক আলোচনা-সমালোচনাই লক্ষ করা যায়, কারণ অধিকাংশ মানুষ, উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চুক্তির ফলে তাদের জীবনে সরাসরি প্রভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতি ও প্রকল্পের অতিরিক্ত খরচ এবং পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয় পাঁচ গুণ বেড়ে যাওয়ায় ঋণের দায় যে এ দেশের মানুষকেই বইতে হবে, তা চট করেই গণমানুষের বোধগম্য হওয়ার কথা নয়।

বৃহৎ প্রকল্প, সরকারি ক্রয়, ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ, বৃহৎ করদাতাদের কর, বিশেষ সুবিধা প্রদান-সংক্রান্ত লাইসেন্স—এ জাতীয় কাজে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থাকে, যদি না গণমাধ্যম ও সামাজিক এবং রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্টরা সেগুলো ফাঁস এবং ধারাবাহিকভাবে জনসমাজের দৃষ্টিতে আনেন। এটা যাতে না ঘটতে পারে, সে জন্যই তো শেখ হাসিনা সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথ একেবারে বন্ধ করে দেয়।

ফলে শত বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা তাদেরই বইতে হবে তা সাধারণ মানুষকে জানানো হয় না, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও জনগণের কিছু করার থাকে না, শেয়ার মার্কেটে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টাকা লুট হলেও বিচার হয় না এবং জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার হলে হুমকিতে পড়েন সাধারণ আমানতকারীরাই।

তাই বলে যতই রাগ করুন, দুর্নীতির যে সর্বগ্রাসী চেহারা আজ মানুষের সামনে বীর দর্পে দাঁড়িয়ে, তাকে সহজে সরিয়ে বা বদলিয়ে ফেলতে পারবেন না। দুর্নীতির প্রণোদনায় পৃষ্ঠপোষক-উপকারভোগী (প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট) সম্পর্কের অবসান ঘটাতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও বন্দোবস্ত থাকতে হবে।

আদর্শিকভাবে যদি রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, দুর্নীতির বিষবৃক্ষ শাখা-প্রশাখা ছড়াতে পারে না। কিন্তু কবে সমাজে ন্যায়বিচারের পরিবেশ আসবে আর কবে দুর্নীতি দূর হবে, কে জানে?

তবে দুর্নীতি দমন করতে চাইলে, এর শুরু তো করতে হবে কখনো না কখনো। এটাই সেই মুহূর্ত যখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতায় এবং সংসদের বিরোধীদলীয় আসনে। প্রকাশ্যে দুর্নীতির পক্ষাবলম্বন করা এখন সহজ ব্যাপার নেই।

এই লেখকের বিবেচনায় বাংলাদেশের চলমান উত্তরণের সময়ে দুর্নীতি রোধে কিছু ‘ম্যাজিক’ সমাধান রয়েছে। সেটা হচ্ছেÑনবনির্বাচিত দরকারের রাজনৈতিক সিগন্যাল। সেই সিগন্যাল হতে পারে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতিমুক্ত থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার করা এবং দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার সুযোগগুলো নষ্ট করে দেওয়া।

ক্ষমতা কেন্দ্রের প্লেয়ারদের সদিচ্ছা এবং উপযুক্ত কর্মকৌশল দুর্নীতিকে শুধু আপাতত কমানো নয়, সমূলে উৎপাটন করতে পারে। দুর্নীতি নির্মূলের এই যাত্রায় রাষ্ট্রনায়ক ও দুর্নীতি ফাঁসকারী উভয়কে ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন হয় আর দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন সম্পন্ন হলে দুর্নীতিবিরোধী জোটও (কোয়ালিশন) সমাজে সুরক্ষা পেতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন