মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ ১৯৯১ সালে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। তেহরানের ক্ষমতা থেকে সে দেশের সরকারকে আমেরিকা সরাতে পারেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের মিত্রদের রক্ষা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতেও তাদের করুণদশা দেখা গেছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার ন্যূনতম ইচ্ছাও ইসরাইলের আর নেই। এসব ব্যর্থতা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিল। সেটি হলো, কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা আর সহিংসতার নীতি আসলে কতটা অর্থহীন ছিল। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রাখার প্রধান যৌক্তিকতা ও মূল নিরাপত্তা চুক্তিকেও ভেঙে দিয়েছে।
৩৫ বছর ধরে ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল ইসরাইলকে সুরক্ষা দেওয়া আর ইরান ও ইরাককে চাপে রাখা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি এই পুরোনো কৌশলকেই চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। শক্তি খাটিয়ে ইরানি হুমকি চিরতরে মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে আমেরিকান নেতারা ঠিক যেভাবে সামরিক শক্তির দম্ভ করেছিল, এবারও সেটাই করেছে। তারা শত্রুকে তুচ্ছ ভেবেছেন। মিত্রদের ইচ্ছাকে পাত্তা দেননি। আর সাধারণ মানুষের জীবনের তোয়াক্কাই করেননি। এই যুদ্ধটি আসলে আমেরিকার ভুল মধ্যপ্রাচ্য নীতিরই এক বিশৃঙ্খল বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে এখন নতুনের জন্ম হচ্ছে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতনের সূচনা করেছিল। যদিও সেই প্রভাব পড়তে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। আমেরিকার প্রভাবও যে আজকেই হুট করে উধাও হয়ে যাবে, তা নয়। তবে তাদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা নিয়ে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তা এবার সব সীমা পার করে গেছে। গাজা ও ইরানের যুদ্ধ বন্ধু ও শত্রু উভয়েরই হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। নতুন কোনো যুদ্ধ কিংবা ওয়াশিংটনে নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট এসেও এই ফাটল আর জোড়া লাগাতে পারবে না।
আগামীতে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল রাখতে পারলে ইসরাইল ও ইরান দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়। ইসরাইল তাদের সীমানা বাড়াতে চায়, ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করতে চায় আর পুরো অঞ্চলে গায়ের জোর খাটাতে চায়। অন্যদিকে, তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতনেরও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তেহরান চেষ্টা করবে আমেরিকাকে দীর্ঘমেয়াদি এক ছায়াযুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে।
আমেরিকা যদি তার এই ব্যর্থ নীতি ত্যাগ করতে পারে, তবে হয়তো খানিকটা উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সামরিক হামলা আর অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে বাঁচতে মধ্যপ্রাচ্যের নেতা ও সাধারণ মানুষ এখন মরিয়া। এই বিপর্যয়ের জন্য তারা ওয়াশিংটনের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। তবে ওয়াশিংটন যদি স্বৈরশাসকদের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে, মিত্রদের অপরাধের জন্য ছাড় দেওয়া থামায় এবং সামরিক আগ্রাসনের নীতি বাতিল করে, তবে হয়তো একটা সুস্থ ধারার সম্পর্ক আবার তৈরি হতে পারে।
ভিত্তিতে ফাটল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিযোগিতা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং কুয়েত মুক্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ আমেরিকান আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন ব্যবস্থা চালু করেন। ওয়াশিংটন সেখানে ইরাক ও ইরানকে ঠেকানোর অজুহাতে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে এবং নিজেদের অপরিহার্য প্রমাণের চেষ্টা করে। তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থনে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি স্বৈরাচারী সরকার টিকে থাকার সুযোগ পায়।
নিজের আধিপত্যকে জায়েজ করতে ওয়াশিংটন আরব-ইসরাইল শান্তি আলোচনার নাটক শুরু করে। তারা চেয়েছিল তাদের আরব মিত্র ও ইসরাইলকে একই নিরাপত্তা জোটে নিয়ে আসতে। ফলে পুরো অঞ্চল দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একভাগে ছিল আমেরিকার অনুগত ইসরাইল, তুরস্ক এবং বেশিরভাগ আরব দেশ। অন্যভাগে ছিল ইরান, সিরিয়া, হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুতিরা। প্রায় তিন দশক ধরে এই মেরূকরণ একইভাবে চলেছে।
ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল এই ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়িত্ব আনবে এবং তেল, ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। বহু দশক ধরে ইসরাইল কোনো রাষ্ট্রীয় হুমকির মুখে পড়েনি। ফিলিস্তিন সমস্যার কোনো সমাধান না হওয়া সত্ত্বেও আরব দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়েছিল। তেলের প্রবাহ ঠিক ছিল, কম দামে তেল পাওয়া যাচ্ছিল এবং আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো বড় শক্তি সেখানে ছিল না।
তবে ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য মার্কিন শাসন নিয়ে এসেছিল শুধু সহিংসতা আর দারিদ্র্য। গত ৩৫ বছরে ইসরাইল ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে বহু ছোট-বড় যুদ্ধ হয়েছে। শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলা হয়েছে এবং গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইরাকে আমেরিকা কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বোমা ফেলেছে। ২০০৩ সালে দেশটিতে আক্রমণ চালিয়ে সরকার পতন ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে লেবানন, লিবিয়া, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনকেও যুদ্ধের আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই পুরো ব্যবস্থাটি টিকে ছিল আরব স্বৈরশাসকদের দেওয়া আমেরিকার নিরাপত্তা আশ্বাসের ওপর। সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রের দাবি চেপে রাখাটাই ছিল চুক্তির মূল শর্ত। ২০১০-১১ সালের আরব বসন্তের ধাক্কা সামলে বেশিরভাগ স্বৈরাচারী সরকার টিকে যায়। পরে তারা মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকান ধাঁচের অর্থনৈতিক সংস্কার শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ধনী করেছে। সাধারণ মানুষকে বানিয়েছে আরো নিঃস্ব। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে মিত্র দেশগুলো নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি চালিয়েছে এবং বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিয়েছে। ধনী তেলসমৃদ্ধ দেশ এবং সামান্য কিছু সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণি ছাড়া বাকি সাধারণ মানুষের কাছে এই আমেরিকান শাসনের অর্থ ছিল শুধুই অন্ধকার ও হতাশা। শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতির বিচারে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ে।
আমেরিকান এই নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি মিত্রদের ভেতরে একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাব তৈরি করেছিল। বাইরে থেকে কোনো দেশ এসে তাদের ওপর হামলা চালাবে নাÑএই বিশ্বাসে তারা একের পর এক ধ্বংসাত্মক নীতি গ্রহণ করেছে। লিবিয়া, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের সময় তারা ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করেছে। ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিল তাদের বেশিরভাগ দেশ। ২০১৭ সালে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলে কাতারকে বয়কট ও অবরুদ্ধ করে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের তথাকথিত ঐক্য মাটিতে মিশে যায়।
২০১০-১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আরব শাসকরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তারা মনে করেছিল ভেতর থেকে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী, ইসলামপন্থি বা তরুণ আন্দোলনকারীরা তাদের ক্ষমতা কেড়ে নেবে। আমেরিকা যখন মিসরের হোসনি মোবারকের পতন নীরবে দেখেছে, তখন তারা বুঝে যায় বিপদে ওয়াশিংটন তাদের বাঁচাতে আসবে না। ফলে নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে তারা নিজেরাই ভিনদেশে হস্তক্ষেপ শুরু করে। এরই ফলে মিসরে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং অন্যান্য দেশে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি ইরান ও ইসরাইল উভয় পক্ষকেই আরো বেপরোয়া হতে উৎসাহিত করেছে। ইরান ধরে নিয়েছিল যে আমেরিকার শত্রুতা চিরস্থায়ী। তাই তারা সরকারি কাঠামোর বাইরে নানা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে নিজস্ব শক্ত বলয় গড়ে তোলে। পশ্চিমা অস্ত্রের পথ বন্ধ থাকায় তারা কম খরচের ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে জোর দেয়। পাশাপাশি নিজেদের ভেতরের যেকোনো বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করে।
অন্যদিকে ইসরাইল পেয়েছিল আমেরিকার নিঃশর্ত সমর্থন। তাদের নেতারা ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইল সামরিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তারা চরম সহিংস হয়ে ওঠে এবং গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক দখলদারিত্বের ব্যপ্তি বাড়ায়।
বহু বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের ঘটনা ছিল বিরল। ফলে আমেরিকার সুরক্ষার ওপর সবার আস্থা ছিল ঠিকঠাক। কিন্তু সেই আস্থায় প্রথম বড় ধাক্কা লাগে ২০১৯ সালে, যখন সৌদি তেলের স্থাপনায় ইরানি হামলার পরও আমেরিকা চুপ ছিল। এরপর ২০২২ সালে যখন হুতিরা আমিরাতে হামলা চালায়, তখনো তারা নীরব ছিল। অর্থাৎ এই শাসনব্যবস্থার ফাটল বহু আগেই দেখা দিয়েছিল।
ওয়াশিংটন বারবার চেয়েছিল আরব মিত্রদের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক জোড়া লাগাতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের স্বার্থকে পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে এই নীতি জোরদার করেন। ২০২০ সালে তার প্রশাসন ইসরাইল, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো ও সুদানের মধ্যে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরে মধ্যস্থতা করে। পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই তালিকায় সৌদি আরবকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি সাধারণ মানুষের প্রবল ফিলিস্তিনপ্রীতি এবং সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার তীব্র প্রতিযোগিতাকে বুঝতে ভুল করেছিলেন।
পরপর দুই ধাক্কা
মার্কিন শাসন এর আগেও অনেক সংকট পার করেছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ কিংবা ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিবারই আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা বলতেন তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাত গুটিয়ে নেবেন। কিন্তু দিনশেষে তারা আবার সেই পুরোনো ফাঁদেই পা দিতেন।
তবে এবার গাজার ওপর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ আর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ আমেরিকান আধিপত্যকে এক চূড়ান্ত ও প্রাণঘাতী ধাক্কা দিয়েছে। গাজায় ইসরাইলের নৃশংসতায় সমর্থন দিয়ে আমেরিকা তার নৈতিক অবস্থান পুরোপুরি হারিয়েছে। আর ইরানের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা আমেরিকান সামরিক শক্তির দীর্ঘদিনের ভীতি আর ভাবমূর্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আরব দেশগুলো এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে তাদের নিজস্ব কোনো প্রভাব নেই আর আমেরিকার নিরাপত্তার গ্যারান্টিও এখন মূল্যহীন।
বাইডেন এবং ট্রাম্প প্রশাসন গাজা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে পাত্তাই দেয়নি। গাজায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার পরও বাইডেন সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য জেদ ধরে বসেছিলেন।
এই জেদি নীতি আমেরিকার মিত্রদের মধ্যে বিভেদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময়ও আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল এবং ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরব আমিরাত-ইসরাইল অক্ষকে নিজেদের নেতৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে। এমনিতেই সিরিয়া ও ইয়েমেন ইস্যুতে রিয়াদ এবং আবুধাবির মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। এই নতুন বিভাজন ইরানের বিরুদ্ধে কোনো যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বন্ধ করে দেয়।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আমেরিকান শাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ওমানের মধ্যস্থতায় যখন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই তাদের না জানিয়ে ওয়াশিংটন ও ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করায় উপসাগরীয় নেতারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা সরাসরি গিয়ে পড়ে আমিরাত ও বাহরাইনের মতো দেশে। আমেরিকা যে সামরিক ঘাঁটির জাল বিছিয়ে রেখেছিল, ইরান সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধ্বংস বা অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হয়।
আমেরিকা আর ইসরাইল যখন ইরানি শাসনকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হলো, তখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ভরসা পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। তাছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা থেকেও তারা ইরানকে আটকাতে পারেনি। উল্টো আমেরিকা যখন ইরানি পানি শোধনাগারে আর ইসরাইল তেলের ডিপোতে হামলা চালাল, তখন ক্ষোভের আগুন আরো জ্বলে উঠল। উপসাগরীয় নেতারা বুঝতে পারলেন, ইরানের পাল্টা হামলায় তাদের পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এতে পুরো দেশ মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন সুরক্ষার মূল চুক্তি আজ ধ্বংসস্তূপে রূপ নিয়েছে। ওয়াশিংটন যদি তার অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনাই না করতে পারে, শত্রুকে হারাতে না পারে কিংবা মিত্রদের বাঁচাতে না পারে, তবে তাদের নিরাপত্তার এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলে কী হবে?
এবারের গল্পটা আলাদা
ইরান যুদ্ধকে অনেকেই ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন। ওই সংকট ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল। তবে ব্রিটেন ও ফ্রান্স কিন্তু সেদিনই মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে চলে যায়নি। ফ্রান্সকে আলজেরিয়ায় আরো ছয় বছর যুদ্ধ করতে হয়েছিল আর ব্রিটেন ১৯৭১ সাল পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করেছিল। যেকোনো বড় পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে সময় লাগে।
ইরানে আমেরিকার এই ব্যর্থতার আসল ধাক্কা স্পষ্ট হতেও কিছুটা সময় লাগবে। এ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আমেরিকার ভূমিকা হুট করে শেষ হয়ে যাবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোও রাতারাতি আমেরিকার হাত ছেড়ে দেবে না। কারণ তাদের সামনে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প নেই। সৌদি আরব এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যদিও ট্রাম্প শর্ত বদলে দেওয়ায় বিষয়টি ঝুলে আছে। পাশাপাশি ইসরাইলের উন্নত প্রযুক্তি পাওয়ার আশায় আরব দেশগুলো তাদের সঙ্গে মোটামুটি একটা ব্যবসায়িক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবে।
এসব ছোটখাটো ঘটনা দেখে মনে হতে পারে যে কিছুই বদলায়নি। পুরোনো ব্যবস্থা বুঝি এখনো চলছে। কিন্তু এই ভঙ্গুর ব্যবস্থা আর বেশি দিন টানা সম্ভব নয়। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে পড়েছিল স্বাধীনতার আন্দোলন আর তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের কারণে। একইভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এতদিনের তৈরি করা সাম্রাজ্য ধ্বংস হচ্ছে, তাদের কয়েক দশকের ভুল নীতি আর মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলার কারণে।
আমেরিকান নেতারা যদি এখনো সেই একই ভুল পথে হাঁটে, একইভাবে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের সমর্থন দিয়ে যান, তবে ফলাফল আগের মতোই হবে। অস্থিতিশীলতা বাড়বে, অর্থনীতি ধ্বংস হবে আর সহিংসতা ছড়াবে। এই শেষহীন যুদ্ধ চলতেই থাকবে।
আরব মিত্ররা আমেরিকার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছে, তাই তারা এখন থেকে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেবে। তারা হয়তো ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে কিংবা লিবিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি নাক গলাবে।
আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা নতুন কিছু শক্তি এবার নতুন মধ্যপ্রাচ্য তৈরি করবে। আমেরিকা যা-ই বলুক না কেন, ইসরাইল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। তারা লেবানন ও সিরিয়ায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা ধ্বংস করা কিংবা পশ্চিম তীর দখল করার সিদ্ধান্ত থেকে তাদের পিছু হটানোর মতো কোনো চাপ নিজের দেশের ভেতর থেকেও আসছে না।
ইরানের জন্যও এই সংঘাত জিইয়ে রাখা জরুরি। বাইরের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ জারি থাকলে তারা অর্থনৈতিক ব্যর্থতার দায়ে অন্যকে দোষ দিতে পারবে। দেশে তীব্র অসন্তোষ থাকলেও তেহরানের মূল ক্ষমতা এখনো অক্ষত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি তাদের হাতে রয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় রয়েছে।
এই অঞ্চলের দেশগুলোর জোট আর ইরানের বিরোধী জোট হিসেবে থাকবে না। নিজেদের বাঁচাতে উপসাগরীয় দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে আলাদা বোঝাপড়া করে নেবে। অন্যদিকে, নেতৃত্ব দখলের জন্য সৌদি আরব এবং আমিরাতের মধ্যে শুরু হবে নতুন প্রতিযোগিতা। সেটি এই অঞ্চলকে আরো বেশি অস্থির করে তুলবে। যুদ্ধের আগেই রিয়াদ আমিরাত-ইসরাইল জোটকে টেক্কা দিতে মিসর, পাকিস্তান, কাতার এবং তুরস্ককে নিয়ে একটি নিজস্ব অক্ষ গড়ে তুলেছিল। এই লড়াই আবার নতুন করে শুরু হবে এবং নতুন সংকট তৈরি করবে।
যুদ্ধের ফলে যে মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড অসন্তোষ ছড়িয়ে দেবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিসরে জ্বালানি ও খাবারের আকাশচুম্বী দাম এবং সুয়েজ খালের আয় কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক আকার নিয়েছে। এর ওপর আমেরিকার সাহায্য ছাঁটাই আর উপসাগরীয় বিনিয়োগ কমে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। গাজা নিয়ে মানুষের ভেতরে যে ক্ষোভ জমে আছে, তা ২০১১ সালের মতো আরো একটি বড় গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিতে পারে।
শেষ সুযোগ
পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়া মানে আমেরিকার জন্য নিজেদের নীতি শুধরে নেওয়ার এক নতুন সুযোগ। ওয়াশিংটনকে অবশ্যই বেপরোয়া স্বৈরশাসকদের তোষামোদ করা বন্ধ করতে হবে। বহু দশক ধরে তারা ধরে নিয়েছিল যে স্বৈরশাসকরা চাইলেই সব গণদাবি বুটের তলায় পিষে দিতে পারবে, আর ফিলিস্তিনের জন্য দুটি আলাদা রাষ্ট্রের ফাঁকা বুলি আওড়ালেই সবাই শান্ত থাকবে। আমেরিকা সবসময় মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে এড়িয়ে গেছে, কারণ তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতির জন্য এই স্বৈরাচারী শাসকদেরই প্রয়োজন ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই পুরোনো নীতি বদলাবে না, তবে ভবিষ্যতের কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট চাইলে তা পারতেন। ওয়াশিংটনকে অবশ্যই সামরিক শক্তি প্রদর্শন আর বিমান হামলা চালিয়ে কূটনীতি করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। আগ্রাসনের বদলে আমেরিকার নজর দেওয়া উচিত প্রতিরক্ষার দিকে। ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটিগুলো নতুন করে না বানিয়ে তাদের উচিত গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার দিকে মনোযোগ দেওয়া।
কাউকে চেপে রেখে নয়, বরং কূটনীতি এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমেরিকাকে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। ওয়াশিংটনকে এমন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, যা ইরানকেও একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসে। ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে যে উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো এই প্রস্তাবে রাজি হতে পারে।
ওয়াশিংটনকে অবশ্যই ইসরাইলসহ তার অন্য মিত্রদের সঙ্গে ব্যবহারের ধরন বদলাতে হবে। ইসরাইলকে চোখ বন্ধ করে সাহায্য দেওয়ার বিপক্ষে খোদ আমেরিকার ভেতরেই জনমত গড়ে উঠছে। পরবর্তী আমেরিকান প্রশাসনের উচিত হবে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা মানবাধিকারকে সম্মান করে, পশ্চিম তীর দখল করা বন্ধ করে এবং লেবানন ও সিরিয়ায় হামলা চালানো থামায়।
এছাড়া আমেরিকাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। সিরিয়া ও ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সুদান ও লিবিয়ায় ছায়াযুদ্ধ থামাতে হবে। নিজ দেশে স্থায়িত্ব আনতে হলে গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রয়োজন, যার অর্থ হলো স্বৈরাচারী মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা রাজনৈতিক নির্যাতন বন্ধ করে।
নতুন এই নীতি হয়তো এক রাতেই সব শান্তি ফিরিয়ে আনবে না। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে তারা হয়তো আমেরিকার কড়া সমালোচনাও করতে পারে। তবে নিজের দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহি করার মতো সরকার যদি মধ্যপ্রাচ্যে আসে, তবেই এই অঞ্চল দীর্ঘ মেয়াদে শান্ত থাকবে। পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। আমেরিকান নেতারা যদি এখনো নিজেদের ভুল শুধরে না নেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের এতদিনের সাম্রাজ্যকে তারা চোখের সামনেই সলিল সমাধি হতে দেখবেন।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

