ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্প যতই যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় দাবি করেন না কেন এটা এখন স্পষ্ট যে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এক অসম্মানজনক পরাজয় বরণ করেছে। ‘যুদ্ধ শুরু না করা’ এবং ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি যে আজ একেবারেই অন্তঃসারশূন্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি তার এই মিথ্যাচারের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এজন্য তিনি সেই সব বিশ্বনেতার ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন যারা তার এই উন্মাদনাকে সমর্থন করেন না (এমনকি তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ স্লোগানের কিছু অনুসারীও এর মধ্যে আছেন)। ইরানি সভ্যতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্প পোপ লিওকে ‘একজন পরাজিত’ ব্যক্তি বলে আক্রমণ করেছেন এবং নিজেকে যিশুর পুনর্জন্ম হিসেবে তুলে ধরেছেন। এখন অনেকেরই প্রশ্ন— ডোনাল্ডের এই ভ্রান্ত জঘন্য কর্মকাণ্ডের কি কোনো শেষ নেই?
আরো খারাপ ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের চাটুকার অনুচরেরা তার ক্ষমতার লালসাকে প্রশ্রয় দেন এবং তার স্বৈরাচারী আচরণের অনুকরণ করেন। এর একটা উদাহরণ হলো, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম দফার ২১ ঘণ্টা শান্তি আলোচনার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মার্কিন দাবি মেনে নিতে ইরানের ‘ব্যর্থতার’ নিন্দা করেছেন।
তিনি যেন কোনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানির পক্ষে চুক্তি করছেন, এমনভাবে কথা বলতে গিয়ে ভ্যান্স জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি তার ‘সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত প্রস্তাব’ দিয়েছেন ইরানকে। তার এই আচরণ থেকে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি আলোচনা করতে ইসলামাবাদে যাননি, বরং তিনি গিয়েছিলেন ইরানের ওপর আত্মসমর্পণের শর্ত চাপিয়ে দিতে। বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রাম্প ও ভ্যান্সের জন্য সত্যিকারের আলোচনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তারা আসলে ইসরাইলের দেওয়া শর্তে ইরানের সঙ্গে একটি তাৎক্ষণিক শান্তি চুক্তি করতে চান।
ইরান ঘোষণা করেছে, আলোচনায় মার্কিন পক্ষ তাদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি এবং এর সংগত কারণও আছে। মতপার্থক্যের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নির্ধারিত আলোচনা অধিবেশনের মাঝে দুবার ইরানে অতর্কিত হামলা করে দেশটির নেতৃত্বকে হত্যা করেছে। ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেছে হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। সংগত কারণেই ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রের অসততা নিয়ে সন্দিহান। অথচ ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন) চূড়ান্ত করতে শত শত ঘণ্টা সময় লেগেছিল।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করেই একতরফাভাবে চুক্তিটি বাতিল করে দেন এবং ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরানের জব্দ করে রাখা শত শত কোটি ডলার ছেড়ে দিতে সম্মত হন। কিন্তু পরে তা আর দেওয়া হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই সম্পদ আটকে রেখেছে।
ইরানের পরমাণু ইস্যু নিয়ে বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে ট্রাম্পের স্বৈরাচারী আচরণ। ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে মাত্র ২১ ঘণ্টার শান্তি আলোচনার পর ট্রাম্প তার অনুগত ও ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বাইরে কারো সঙ্গে পরামর্শ না করেই হরমুজ প্রণালি অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা সাধারণত যুদ্ধকালীন একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে দেশটির সঙ্গে আলোচনায় মার্কিন আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং ভিয়েতনামের পক্ষে লে ডুক থো ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করার আলোচনা চূড়ান্ত করতে চার বছর আট মাস সময় নিয়েছিলেন। তাদের আলোচনার সঙ্গে তুলনা করলে ইসলামাবাদে ভ্যান্সের ২১ ঘণ্টার আলোচনার ভান করার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে ভ্যান্স পাকিস্তান ত্যাগ করেন এবং ইরানকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের নিয়ে খেলো না।’ তার এই বক্তব্য ও আচরণ আলোচনাকে কার্যত প্রহসনে পরিণত করেছে।
যে দেশগুলো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে, তাদের দেওয়া ক্ষতিপূরণের কোনো প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেনি ওয়াশিংটন, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণার এই ইতিহাসই ইরানের বর্তমান সংশয়কে আরো বেশি যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করে। উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম উভয়ের সঙ্গেই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করেছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যে দলেরই প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে থাকুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না। প্রেসিডেন্টরা ক্ষমতায় আসেন এবং যান, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অসততা ও প্রতারণা অবিচল থাকে।
ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ইরানের এই দাবির সঙ্গে ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিষয়টি সামনে চলে আসে। ১৯৭৩ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ভিয়েতনামের সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ফাম ভান ডংকে একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে নিক্সন উল্লেখ করেন, উত্তর ভিয়েতনামের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত তার স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত (২৭ জানুয়ারি, ১৯৭৩) যুক্তরাষ্ট্র পূরণ করবে। নিক্সনের অনুমান অনুযায়ী এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে ‘পাঁচ বছরে প্রায় ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার’, যা অনুদান হিসেবে প্রদান করা হবে।
ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা নিক্সনের কথায় বিশ্বাস করে তাদের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত সেই শত শত কোটি ডলারের বাজেট অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশটিকে এক পয়সাও দেওয়া হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমেরিকার আদিবাসী জাতিগুলোর সঙ্গে যে ৫০০টিরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তার মধ্যে এমন একটিও খুঁজে পাওয়া কঠিন, যা রক্ষা করা হয়েছে। ঐতিহাসিকেরা এই শোচনীয় রেকর্ডকে নাম দিয়েছেন ‘ভঙ্গ হওয়া চুক্তির পথ’।
এখানে আরো যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তির ১৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে চলেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, উভয় পক্ষই ‘কোরিয়ার ওপর কোনো ধরনের অবরোধ আরোপ করবে না।’ কিন্তু চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর অবরোধ বজায় রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক ঋণ ও নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্য ও ভ্রমণে বাধা সৃষ্টি করে দেশটির আর্থিক খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইরানের ওপর ট্রাম্পের নতুন অবরোধের মতোই যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে কয়লা ও খনিজ রপ্তানিতে সাহায্যকারী পরিবহন সংস্থা, জাহাজ এবং ব্যক্তিদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও চুক্তিগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অথবা সিনেটে সেগুলোকে কখনোই ভোটের জন্য উত্থাপন না করার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় উপেক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে স্বাক্ষর করেনি এবং এ কারণে এই আদালতের রায় থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে (এবং ইসরাইলকে) রক্ষা করে থাকে। আরেকটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা, যেটাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অপরাধ বলে মনে করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এখন শুভবুদ্ধির উদয় হবে কি না, তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হতে পারে। তারা যে শুধু মানবতার ওপর এক কালো ছায়া ফেলেছেন, তা-ই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডও সামনে কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজ এটা অনেক বেশি সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আবারও ইরানিদের হত্যা করবে এবং দেশটিকে ধ্বংস করে দেবে। এই ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই দানবেরা শান্তি চুক্তির নামে এমন একটি চুক্তি ইরানের ওপর চাপিয়ে দিতে এবং এমন একটি সংঘাতের অবসান ঘটাতে চাইছে, যা ইরান কখনোই মেনে নেবে না।
মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

