একসময় বিশ্বের ক্ষমতার মানচিত্র আঁকা হতো তেলের কূপ ঘিরে। কোথায় তেল আছে, কে তা নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোন পথে তা বিশ্ববাজারে পৌঁছায়—এসব প্রশ্নই নির্ধারণ করেছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্ব এখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারি প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু এই সবুজ রূপান্তরের ভিতও দাঁড়িয়ে আছে মাটির নিচের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর। লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, কপার ও গ্রাফাইট তাই আর কেবল শিল্পের কাঁচামাল নয়, এগুলো হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কৌশলগত সম্পদ।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বলছে, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, বৈদ্যুতিক যান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে এসব খনিজের চাহিদাও বাড়ছে। অর্থাৎ তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথেই বিশ্ব প্রবেশ করছে নতুন এক খনিজনির্ভর বাস্তবতায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ‘মিনারেল কমোডিটি সামারিজ, ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিশ্বে লিথিয়াম খনি উৎপাদন প্রায় ২৯০ হাজার টনে পৌঁছেছে। কোবাল্টের সরবরাহ আরো বেশি কেন্দ্রীভূত; বৈশ্বিক খনি উৎপাদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে। ফলে কোনো উৎপাদক দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমসংকট, পরিবেশগত বিধিনিষেধ বা রপ্তানি নীতির পরিবর্তন ঘটলে তার অভিঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্ববাজারে। এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ শুধু খনিজের মজুত থাকলেই ক্ষমতা আসে না; উত্তোলনের পর প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিশোধন, ব্যাটারি উপাদান তৈরি এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফলে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু খনিজের খনি নিয়ে নয়, বরং কে খনিজ পরিশোধন করবে, কে ব্যাটারি তৈরি করবে এবং কে প্রযুক্তির সরবরাহশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নিয়েও।
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন অংশীদারিত্ব, কৌশলগত মজুত, পুনর্ব্যবহার এবং বিকল্প প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। কারণ খনিজের বাজারে অস্থিরতা শুধু ব্যাটারির দাম নয়, বৈদ্যুতিক যান, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও শিল্পপ্রযুক্তির বিস্তারকেও প্রভাবিত করতে পারে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা এই প্রতিযোগিতাকে আরো জটিল করছে। ফলে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ধারিত হবে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বা জ্বালানি আমদানির সক্ষমতায় নয়—নির্ভরযোগ্য কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও দক্ষতার ওপরও। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইআরইএনএ) বলছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে খনিজ উত্তোলনকে ঘিরে পরিবেশ, পানি, শ্রম অধিকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রশ্নও সামনে আসছে। ফলে সবুজ প্রযুক্তির কাঁচামাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও হতে হবে পরিবেশবান্ধব, স্বচ্ছ ও ন্যায্য। অন্যথায় কার্বন কমানোর নামে এক ধরনের পরিবেশগত চাপ কমিয়ে অন্য ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য আরো গভীর। দেশটি জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভর। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক যান, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থার ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক খনিজের মূল্য ও সরবরাহের ওঠানামা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, পরিবহন খাত, শিল্প উৎপাদন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এই ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সম্ভাবনা। দেশের ক্রমবর্ধমান বাজারকে কাজে লাগিয়ে ব্যাটারি সংযোজন, বৈদ্যুতিক যান, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ব্যাটারি মেরামত ও পুনর্ব্যবহার শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। ব্যবহৃত ব্যাটারিকে বর্জ্য হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করাও জরুরি। এতে ভবিষ্যৎ শিল্প প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থানও আরো শক্তিশালী হতে পারে।
বাংলাদেশের করণীয় তাই হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত। প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ব্যাটারি প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজার পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একক কোনো দেশ বা সরবরাহপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী আমদানি ও প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ, নিরাপদ নিষ্পত্তি ও মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধারে কার্যকর রিসাইক্লিং অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের সমন্বয়ে ব্যাটারি, বিকল্প উপকরণ, শক্তি-সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তিতে গবেষণা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, বৈদ্যুতিক যান ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ ও নীতিগত প্রণোদনা দিতে হবে। ষষ্ঠত, দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক তৈরির জন্য কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। সপ্তমত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শুধু কাঁচামাল আমদানিকারক নয়, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ব্যাটারি ও সবুজ প্রযুক্তি সরবরাহশৃঙ্খলের অংশীদার হওয়ার কৌশল নিতে হবে।
পৃথিবী তেলের যুগ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে; কিন্তু সম্পদকে ঘিরে ক্ষমতার রাজনীতি বিদায় নিচ্ছে না, কেবল তার কেন্দ্র বদলাচ্ছে। তাই বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু অন্যদের তৈরি সবুজ প্রযুক্তি কেনার পথই খোলা নেই; বরং এই প্রযুক্তির অর্থনীতি ও সরবরাহশৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করারও সুযোগ রয়েছে। সবুজ রূপান্তর যদি নতুন নির্ভরতার শৃঙ্খলে বিশ্বকে আবদ্ধ করে, তবে তা পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নিরাপত্তা নয়। প্রকৃত সাফল্য হবে এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণে, যেখানে পরিচ্ছন্ন শক্তি হবে সহজলভ্য, সরবরাহশৃঙ্খল হবে বহুমুখী, প্রযুক্তির সক্ষমতা হবে বিস্তৃত এবং কোনো একক খনিজ বা রাষ্ট্র বিশ্বের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা কখনো একক উৎসে আসে না, বরং এটি আসে বৈচিত্র্য ও সক্ষমতায়। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশ দর্শক নয়, হতে পারে প্রস্তুত নির্মাতা।
জ্বালানি নিরাপত্তা কখনো একক উৎসের ওপর নির্ভর করে আসে না; বরং উৎসের বৈচিত্র্য ও নিজস্ব সক্ষমতার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করা যায়। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশ শুধু দর্শক নয়, বরং হতে পারে সক্রিয় নির্মাতাও ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইডেন মহিলা কলেজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


