বাংলাদেশের চিরায়ত পরিচয় নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু এই পরিচয়ের পথে এখন তৈরি হচ্ছে হুঁশিয়ারি, যা শুধু দেশের মানচিত্র নয়, দেশবাসীর জীবনের জন্য হুমকি। পানির অপর নাম জীবন, এই পানির স্তর কমে যাওয়া মানেই আরেক বিপৎসংকেত। জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ভূগর্ভস্থ পানির অতিমাত্রিক ব্যবহার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের ব্যবহৃত পানির ৭৯ শতাংশই উত্তোলন করা হয় মাটির নিচ থেকে। এই নির্ভরতা বেড়েছে গ্রাম শহর নির্বিশেষে সবখানেই। এটি শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি একটি সার্বভৌম হুমকি; অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মৌলিক ভিত্তিকে ধসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকার দিকে তাকালে আমরা এই সংকটের গভীর উন্মোচন করতে পারি। ঢাকা ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর দৈনিক ২৪০ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের ৮৭ শতাংশই আসে গভীর নলকূপের মাধ্যমে। এই উত্তোলনের চাপ এতটাই তীব্র যে, এটি শহরের নিচের একুইফারকে একটি ফাঁপা, ক্ষয়প্রাপ্ত খোলসে পরিণত করছে। ঢাকায় বছরে গড়ে ২,০০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু নগরায়ণের কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে যায় প্রকৃতির এই দান। পাকা সড়ক, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং হ্রাসকৃত জলাধার—এসবের কারণে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ স্তরে পুনঃসংরক্ষণ হয় না। এটি একটি চরম অপচয়, যেখানে প্রকৃতি দিচ্ছে, কিন্তু আমরা তা ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
এর ফলে বিপর্যস্ত হচ্ছে নগর। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল মাত্র ১১-১৫ মিটার গভীরে, কিন্তু আজ তা মিরপুর, উত্তরা বা গুলশানের মতো এলাকায় ৭৫ থেকে ৮০ মিটারেরও নিচে নেমে গেছে। বছরে গড়ে দু-তিন মিটার হারে এই পতন চলছে, যা শহরটিকে বিশ্বের দ্রুততম ভূগর্ভস্থ পানি নিঃশেষ হওয়া মহানগরীর তালিকায় ঠেলে দিয়েছে। লন্ডন বা নিউ ইয়র্ক শতাব্দী ধরে তাদের একুইফার ব্যবস্থাপনা করেছে, কিন্তু ঢাকার ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন রিজার্ভকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
পানির স্তর নেমে যাওয়া বহুমুখী সমস্যার সৃষ্টি করে। পানির স্তর যত নিচে নামছে, ততই বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ছে। পানির পাম্পগুলো আরো শক্তি প্রয়োগ করতে হয় গভীর থেকে পানি তোলার জন্য, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের বিলের মাধ্যমে ফিরে আসে, যা জনগণের প্রাপ্য ও অধিকার হওয়ার কথা ছিল, তা এখন জনগণকে অধিক মূল্য দিয়ে কিনতে হচ্ছে। দিন দিন পানির বিল বেড়ে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ এটি।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার দেশের কৃষি খাত, যা দেশের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থার ৮০ শতাংশই নির্ভর করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর, যার সিংহভাগ ব্যবহৃত হয় বোরো ধান চাষে। দেশের সবুজ বিপ্লবের এই প্রিয় শিশুটি আজ বৃহত্তম পানি-খাদক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চিন্তার বিষয় হলো, দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশ আসে এই মৌসুম থেকেই। এর মানে হলো, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বিশাল স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি সম্পদের ওপর, যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
কিন্তু প্রতিটি কিলোগ্রাম বোরো ধান উৎপাদনের খরচ অত্যন্ত ভারী। গড়ে ৫৫০-৬৫০ লিটার পানি লাগে মাত্র এক কেজি ধান উৎপাদনে। এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে গভীর নলকূপ স্থাপনের খরচ গত দেড় দশকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি গভীর টিউবওয়েলের দাম আজ কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যার রক্ষণাবেক্ষণও সমান ব্যয়বহুল। এর সরাসরি শিকার হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষক। যাদের জমি কম, তাদের পক্ষে এত বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না। ফলে তারা হয় বড় কৃষক বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে সেচের পানি কিনতে বাধ্য হন, নয়তো সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এভাবেই পানির সংকট খাদ্য উৎপাদনের ভিতকেই নড়বড়ে করে তুলছে। এটি একটি নতুন ধরনের গ্রামীণ বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে—যেখানে পানি প্রবেশাধিকারই সম্পদ ও ক্ষমতার নতুন নির্ধারক হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো শুধু বীজ বা সার নির্ভর হবে না, এটি নির্ভর করবে কোন কৃষকের নলকূপে কতটা পানি অবশিষ্ট আছে তার ওপর।
ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের একটি ভয়াবহ ও অপূরণীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো আর্সেনিক দূষণ, যা বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সূচক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি লাখো পরিবারের দৈনন্দিন আতঙ্ক। আর্সেনিক হচ্ছে এক নীরব ঘাতক, যা দীর্ঘদিন ধরে শরীরে জমে শেষ পর্যন্ত ক্যানসার (ত্বক, ফুসফুস ও মূত্রথলি), ত্বকের কেরাটোসিস এবং অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে পানির স্তর দ্রুত ও অতিরিক্ত নিচে নেমেছে, সেখানে ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে চাপের পরিবর্তন ঘটায় আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। যখন পানি উত্তোলনের মাধ্যমে একুইফারে শূন্যতা তৈরি হয়, তখন অক্সিজেনযুক্ত পানি নিচের স্তরে প্রবেশ করে এবং আর্সেনিকসমৃদ্ধ শিলাকে বিক্রিয়া করতে প্ররোচিত করে, ফলে বিষাক্ত আর্সেনিক পানিতে মিশে যায়। দীর্ঘসময় ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি বা খাবার গ্রহণের ফলে সৃষ্ট একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ আর্সেনিকোসিস। আর্সেনিকোসিসের চিকিৎসা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। এছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা শ্রমক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা পরিবারের আয় ও জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, আজ আমরা যে পানি তুলছি, তার মূল্য আমরা শুধু বিদ্যুৎ বিলে দিচ্ছি না, দিচ্ছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মাধ্যমে।
পানিসংকটের কঠিন ও মানবিক সংকট ফুটে ওঠে ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষত, শুষ্ক মৌসুমে মার্চ ও মে মাসে দেশের উত্তরবঙ্গীয় অঞ্চল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের অঞ্চল খুলনা এবং সাতক্ষীরায় অবস্থা আরো করুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, এ সময় প্রায় ৩৫ শতাংশ নলকূপ আংশিক বা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষকে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের, তখন দূরের পুকুর, দূষিত নদী বা বিলুপ্তপ্রায় খাল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এর ফলে পানি সংকটের কারণে তারা দূষিত পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যার দরুন তাদের টাইফয়েড, ডায়রিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়।
একই সময়ে শহরে, বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রামে, গভীর নলকূপ ও উন্নত জলাধার ব্যবস্থার সাহায্যে পানি সরবরাহ অব্যাহত থাকে, যদিও তা চাপের মধ্যে থাকে। এই বৈষম্য ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে পানিজনিত অভিবাসন। যখন গ্রামে পানির সংকট চলে, তখন তারা শহরমুখী হয়। তারা আশ্রয় নেয় শহুরে বস্তিতে, যা ইতোমধ্যেই জনসংখ্যা ও পরিষেবার চাপে ভারসাম্যহীন। এই নতুন অভিবাসন শহুরে অবকাঠামো, বেকারত্ব এবং সামাজিক অস্থিরতার ওপর নতুন ইন্ধন জোগাচ্ছে। এভাবে, শহরে পানির সংকট থাকা সত্ত্বেও গ্রামের সংকটগুলো শহরে আরো সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরির দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
আবার দেশের প্রধান নদীগুলোর ৯০ শতাংশের উৎস উজানে, প্রধানত ভারত ও নেপালে অবস্থিত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ মারাত্মক হ্রাস পায়। ফারাক্কা বাঁধ ইতিহাসের একটি বড় উদাহরণ, কিন্তু তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পানিবণ্টন নিয়েও চলমান জটিলতা বিদ্যমান। যখন উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করা হয়, তখন বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে যায়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। গবেষণা বলছে, নদীর পানি কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ হার ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। নদী ও একুইফারের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সংযোগ থাকে; নদীর পানি ভূগর্ভস্থ স্তরকে পুষ্ট করে। নদী শুকিয়ে গেলে এই রিচার্জ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে বাংলাদেশ একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির শিকার হচ্ছে।
আমাদের দেশের যা সম্পদ ছিল একসময়, তা এখন বাঁচিয়ে রাখতে দেশকে আরো সচেতন হতে হবে, আরো বেশি কর্মঠ হতে হবে, আরো বেশি পরিকল্পিত হতে হবে। গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। এর সবকিছু প্রয়োজন এই বহুমুখী সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ গ্রহণে। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন, বিকল্প উৎসের সৃষ্টি করা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, নদী, খাল-বিলের শোধন করা একেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কৃত্রিমভাবে পুনর্ভরণ করা। অর্থাৎ যা আমরা ব্যবহারের জন্য তুলে নিচ্ছি, তা আবার ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৃষ্টির পানি ব্যবহার বা পানি পুনর্ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
আঞ্চলিক কূটনৈতিক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সক্রিয় ও কার্যকর কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য উপকার সমাধান খুঁজতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

