বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির হিসাব বদলাচ্ছে। পুরোনো প্রভাবের জায়গায় নতুন শক্তির উত্থান, আর সেই পরিবর্তনের মাঝেই নিজের অবস্থান খুঁজছে বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট হলেও ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক গুরুত্ব তাকে বৈশ্বিক শক্তির হিসাবের বাইরে থাকার সুযোগ দিচ্ছে না। প্রশ্ন তাই একটাই—পরাশক্তির এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ শুধু হিসাবের একটি অংশ হবে, নাকি নিজের স্বার্থের হিসাবটাও নিজেই লিখবে?
বাংলাদেশ ঘিরে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নয়, রয়েছে তার অবস্থানগত গুরুত্বও। দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড, বঙ্গোপসাগরের সান্নিধ্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাবনা দেশটিকে ক্রমেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারত নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ায় সীমান্ত, নদী ও নিরাপত্তাসহ নানা বিষয় জড়িত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তিন শক্তির স্বার্থের ভিন্ন ভিন্ন রেখা এসে মিলছে এই ভূখণ্ড ঘিরে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের প্রতি এই আগ্রহের ভিত্তি কোথায়? উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে স্থায়ী সম্পদের দিকে—তার ভূগোলের দিকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূগোল অনেক সময় এমন এক শক্তি, যার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অবস্থানও তেমন। ভূগোল এখন বাংলাদেশের প্রধান কূটনীতি। একটি দেশের মানচিত্র শুধু তার সীমানা নির্ধারণ করে না; কখনো কখনো তার সম্ভাবনার পরিধিও ঠিক করে দেয়। যে ভূগোল একসময় শুধু অবস্থান ছিল, সঠিক পরিকল্পনায় সেটিই হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পদ।
তবে ভূগোল সম্ভাবনা তৈরি করে, সাফল্য নিশ্চিত করে না। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব শক্তিতে রূপ দিতে হলে সমুদ্রের দিকে আরো গভীরভাবে তাকাতে হবে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সমুদ্রসীমা নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও কৌশলগত বাস্তবতারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগর যত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, বাংলাদেশের জন্য ততই প্রয়োজন হবে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা। কারণ সমুদ্রের গুরুত্ব কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক শক্তির হিসাব। আর সেখান থেকেই আসে বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু বাণিজ্য বা প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারত্বেও। এই পরিবর্তনের ভেতরেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তৈরি হয়—একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও কীভাবে নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা যায়?
পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য শুধু চাপ নয়, তৈরি করেছে অনেক বড় সুযোগ। কোনো প্রকল্পে কত অর্থ এলো, সেটিই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। দেখতে হবে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব, সম্ভাব্য কৌশলগত ঝুঁকি এবং ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার ওপর এর প্রভাব কতটা।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা দেশের সক্ষমতা বাড়ায়—এমন নির্ভরতা তৈরি করে নয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ একসময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সুযোগ গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি কৌশল, যা বাংলাদেশকে কারো প্রতিপক্ষ না বানিয়ে নিজের অবস্থানটিও স্পষ্ট রাখবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে বহুমুখী ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতি। একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, অন্যটির সঙ্গে প্রযুক্তি, আরেকটির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা—ক্ষেত্রভেদে অংশীদারত্ব নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এখানে ভারসাম্য মানে সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব রাখা নয়; বরং কোথায় সহযোগিতা প্রয়োজন, কোথায় সতর্কতা দরকার এবং কোন বিষয়ে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করা যাবে না, সেটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। কারো সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার অর্থ নিজের অবস্থান বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং দক্ষ কূটনীতি হলো এমন জায়গা তৈরি করা, যেখানে মতপার্থক্য থাকলেও সহযোগিতার দরজা খোলা থাকে। তবে কূটনৈতিক কৌশল যতই পরিণত হোক, তার পেছনে যদি দেশের নিজস্ব শক্তি না থাকে, তাহলে সেই ভারসাম্য দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই সবচেয়ে বড় শক্তি নিজের সক্ষমতা অর্জন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর। শক্তিশালী অর্থনীতি, বহুমুখী রপ্তানি, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা—এসবই একটি রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই শুধু বাইরের অংশীদার খোঁজা নয়, নিজেদের বিকল্পও বাড়ানো। রপ্তানি বাজার বহুমুখী করা, প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, মানবসম্পদের মান উন্নত করা এবং সমুদ্রসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা—এসব পদক্ষেপ দেশকে আরো আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে নিতে পারে। কারণ বিকল্প যত বেশি, নির্ভরতা তত কম। আর নির্ভরতা কমলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও বাড়ে।
পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসলে—কে তার বন্ধু, তা নয়; বরং সে নিজেকে কতটা শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাতে পারবে। বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলাবে, শক্তির কেন্দ্রও এক জায়গায় স্থির থাকবে না; কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রয়োজন থেকেই যাবে।
তাই কোনো একটি শক্তির ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চেয়ে প্রয়োজন এমন একটি অবস্থান তৈরি করা, যেখানে সম্পর্ক থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ভার থাকবে নিজের হাতে। নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে সমান মর্যাদায় কথা বলতে পারাই প্রকৃত স্বাধীনতার পরিচয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

