বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ। জনগণের প্রত্যাশাও অনেক। সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও ওয়াদা অনুযায়ী কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে, আইন প্রণয়নের চিত্রগুলোতেই সেটা স্পষ্ট। জুলাই সনদের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী সংসদের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে তা বাস্তবায়ন হওয়ার কথা; কিন্তু এখনো নিশ্চিত নয়, জুলাই সনদের ভাগ্যে কী ঘটবে। গণভোট তো ইতোমধ্যেই অস্বীকার করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তৃতীয় অধিবেশনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে। বলা যায়, বিরোধী দলের কোনো দাবি গ্রাহ্য করা হয়নি। সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই এসব আইন পাস করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার কমিশন সংশোধন আইন, গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রণীত আইন এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন। আমার আজকের আলোচনা মানবাধিকার কমিশন আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব। মানবাধিকার কমিশন আইন কতটা জনগণের সুরক্ষা দেবে, চেষ্টা করব সে বিষয়গুলো আইনের ভেতরে খুঁজতে। এতেই বোঝা যাবে, এ আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কতটা আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে মানবাধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মানবাধিকার-বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সনদগুলোয়ও স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এসবের মাধ্যমে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন থেকেই দেশে একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠনের দাবি ছিল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর চারদলীয় জোট সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানবাধিকার কমিশন গঠনের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নেরও উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার মেয়াদের মধ্যে চারদলীয় জোট সরকার মানবাধিকার কমিশন গঠন আইন চূড়ান্ত করতে পারেনি। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে দেশে প্রথমবারের মতো একটি ঠুঁটো জগন্নাথ মানবাধিকার কমিশন আইন পাস করেন এবং কমিশন গঠন করেন। এ কমিশনের দায়িত্ব ছিল শেখ হাসিনার সময়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে সুরক্ষা দেওয়া।
২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লবে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহযোগিতা নিয়েই ভারতে পালিয়ে যান। তার সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা এবং দলের অনেক নেতাকর্মীও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনা পালানোর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ভালো কাজগুলোর মধ্যে একটি ছিল মানবাধিকার কমিশন আইনের সংশোধনী এনে অধ্যাদেশ জারি করা। এটি অধ্যাদেশ নম্বর ৬৫ এবং শিরোনাম ছিল—‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ (২০০৯ সনের ৫৩নং আইন) রহিতক্রমে উহা পুনঃপ্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রণীত অধ্যাদেশ’।
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন ও স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার দিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিধান কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাদেশটিকে সংসদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করেনি। এতে অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আরো ভালো আইন প্রণয়নের জন্য সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন দেখা যেতে পারে সংসদে পাস হওয়া সরকারের ভাষায় ভালো আইন ও অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটির মধ্যে কী ফারাক রয়েছে। মোটামুটি দুটি বিষয়ে ফারাক দেখলেই বোঝা যায়, সরকারের ভালো আইন কাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
প্রথমে আসা যাক মানবাধিকার কমিশন গঠনের বাছাই কমিটি প্রসঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের মানবাধিকার কমিশন গঠনে একটি বাছাই কমিটির বিধান রাখা হয়েছিল। বাছাই কমিটির প্রধান করা হয়েছিল রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। কমিটির অন্যান্য সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছিল সরকারি দল ও বিরোধী দলের মনোনীত একজন করে সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মনোনীত বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার-বিষয়ক গবেষণায় অভিজ্ঞ একজন শিক্ষক অথবা মানবাধিকার-বিষয়ক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নাগরিক প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত একজন মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ নাগরিক প্রতিনিধি, জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্তৃক মনোনীত একজন মানবাধিকার-বিষয়ক অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি। এই বাছাই কমিটি যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য মনোনয়নের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম প্রস্তাব করার বিধান রাখা হয়েছিল অধ্যাদেশে।
এবার দেখা যাক, সরকারের ভাষায় আরো ভালো আইনে বাছাই কমিটি কীভাবে গঠিত হবে। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনে বাছাই কমিটির প্রধান হলেন সংসদের স্পিকার। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দল থেকে একজন করে সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রণীত মানবাধিকার কমিশন আইনে কমিশন গঠনের বাছাই কমিটি ও সরকারের পাস করা আইনে বাছাই কমিটির চিত্রটি দেখে কী অনুমান করা যায়! সরকার কি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠনে আন্তরিক, নাকি আরেকটি দলীয় সংগঠন তৈরির পথ করেছে আইনের মাধ্যমে?
দুই নম্বরে দেখে নেওয়া যেতে পারে তদন্তের এখতিয়ার প্রসঙ্গে। বিলুপ্ত করা অধ্যাদেশে কমিশনকে গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পূর্ণ তদন্তের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনার সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা গুম এবং খুন হয়েছে। আয়নাঘর নামক গোপন বন্দিশালায় মানুষকে ধরে নিয়ে আটক ও নির্যাতন করা হতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অনেকেই নিখোঁজ হয়ে গেছেন। গুম করে কীভাবে হত্যা করা হতো, সে বর্ণনা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীদের বর্ণনায়। শেখ হাসিনার আমলে গুমের সঙ্গে জড়িত থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনেকের এখন বিচার চলছে।
শেখ হাসিনার আমলে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে আমার দেশ অনলাইন প্রকাশের সুযোগ হয়েছিল। তখন শেখ হাসিনার ‘গুম-খুনের রাজনীতি’ শিরোনামে গুমের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছি। প্রায় ৫৬টি গুমের কেস স্টাডি প্রকাশ করা হয়েছিল তখন। পরবর্তী সময়ে একই শিরোনামে একটি বইও প্রকাশ করা হয়েছে। এই ৫৬ গুমের কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। তবে মজার বিষয় ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না তখন। জিডি করার পর উল্টো ভিকটিমের বাড়িতে গিয়ে প্রায়ই বাবা-মা বা স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি করা হতো। উল্টো তাদের কাছে জানতে চাওয়া হতো—নিখোঁজ ব্যক্তিটি কোথায়!
এককথায় বলতে গেলে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনভাবে অভিযোগের তদন্ত করার পাশাপাশি স্বপ্রণোদিত হয়েও তদন্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেটা হোক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করে সরকারের ভাষায় আরো ভালো আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের সুযোগ রাখা হয়নি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী আমলের মতো এখন যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তা অস্বীকার করে, সেটা মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করতে পারবে না। কারণ অভিযোগ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করতে পারবে না।
জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনে পাস করা আইনের ১৯নং ধারাটি হচ্ছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে বলা হয়েছে—১. ‘এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন শৃঙ্খলা বাহিনী বা উহার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে প্রতিবেদন চাহিতে পারিবে।’ আরো মজার বিষয় হচ্ছে, কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য একটি সময় বেঁধে দিতে পারবে। নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনী প্রতিবেদন না দিলে কমিশনের কিছুই করার নেই, বা কমিশনের চিঠির জবাব না দিলেও প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনার আমলের মতোই কারো সন্তান, পিতা বা ভাইকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে, কিন্তু তারপর ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করছে। এখন এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করা হলে কমিশন বড়জোর সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে চিঠি দিয়ে একটি প্রতিবেদন চাইতে পারবে; এর বেশি কিছু নয়। আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিই একটি প্রতিবেদন তৈরি করে দেবেন। বিষয়টি যেন এরকম—শিয়াল মুরগি নিয়ে গেছে, কিন্তু সেই শিয়ালের কাছেই আবার প্রতিবেদন চাওয়া হচ্ছে! এখানে প্রকাশ পেয়েছে সরকারের ভাষায় ভালো আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার সুরক্ষা দেওয়ার আন্তরিকতা।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের মতোই এখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একরকম দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই দায়মুক্তি ততদিনই বহাল থাকে, সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকে। ফৌজদারি অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। শেখ হাসিনার আমলে যারা দায়মুক্তি নিয়ে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের এখন বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সুতরাং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এই দায়মুক্তি দেখে উৎসাহিত হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত হন, তাহলে ভবিষ্যতে বিচারের মুখোমুখি হবেন না, এটা কিন্তু নিশ্চিত নয়। হাসিনার ফ্যাসিবাদের সহযোগী উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারাও কিন্তু রেহাই পাচ্ছেন না। তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে এখন গুম এবং ক্রসফায়ারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে।
একটি স্বাধীন কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন ছাড়া সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলোয় স্বাক্ষরিত মানবাধিকার সুরক্ষা কখনো সম্ভব নয়। প্রকৃত মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সরকার চাইলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের মতোই মানবাধিকার লঙ্ঘনে মেতে উঠতে পারবে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


