হুমকির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা

হুমকির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা

আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। অশান্তির আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করেছে সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাজেক উপত্যকাকে। এই আগুন যেন কিছুতেই নেভার নয়। অথচ ১৯৯৭ সালের বিতর্কিত শান্তিচুক্তির পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের এক-দশমাংশ জায়গাজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অপ্রতুল ভূমির একটি অংশ, যেখানে মাত্র এক শতাংশ মানুষের বাস। চুক্তিটিকে বিতর্কিত বলায় কেউ কেউ হয়তো নাখোশ হতে পারেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, শান্তিচুক্তির ভেতরেই বোনা হয়েছিল অশান্তির বীজ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্কহীন একদল সেনাবিদ্বেষী মানুষের প্রণীত শান্তিচুক্তির মধ্যেই ছিল সার্বভৌমত্ববিরোধী অনেক উপাদান।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দেশরক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তথাকথিত শান্তিবাহিনী যখন কোণঠাসা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনাক্যাম্পে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ যখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, রাতের অন্ধকারে বা দিনের আলোতে ভারতে পালিয়ে যাওয়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের প্রত্যাবর্তনের সারি যখন দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে, তখন অনেকটা তড়িঘড়ি করে শান্তিচুক্তির নামে লিখে ফেলা হলো এমন একটি দলিল, যার পরতে পরতে রয়েছে সার্বভৌমত্ব বিসর্জনের নীলনকশা।

শান্তিচুক্তি নিয়ে কোনো বিরোধিতা নেই। বিরোধিতার জায়গাটি হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং মাটির মানুষের কাছাকাছি থাকা সেনাবাহিনীর কোনো পরামর্শ গ্রহণ না করে চুক্তিতে এমন কিছু ধারা সংযোজন করা হয়, যা সেনাবাহিনী তথা পরোক্ষভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী বলে প্রতিপন্ন হয়। এর মাশুল আমরা এখন প্রতিনিয়ত গুনছি।

বিতর্কের বেড়াজালে শান্তিচুক্তি

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বিতর্কিত কয়েকটি ধারা, যেগুলোকে লেখকের মতে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচনা করা যায় এবং অশান্ত অতীতের পটভূমি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

শান্তিচুক্তির খণ্ড ‘ঘ’-এর ১৭(ক) ধারা—‘Rehabilitation, General Amnesty and Other Matters’ অংশ অনুসারে, জনসংহতি সমিতির সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পর সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সব অস্থায়ী ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে স্থায়ী সেনানিবাসে ফিরিয়ে নিতে হবে। সেই মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ছয়টি গ্যারিসন রাখার শর্তে ২৪১টি অস্থায়ী ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট অল্পসংখ্যক ক্যাম্পও সরিয়ে নেওয়ার কাজ এখনো চলছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অনুরূপ পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েন করা যাবে। তবে তা হবে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীন এবং আঞ্চলিক পরিষদ প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে পারবে। চুক্তির ১৭(খ) ধারায় বলা হয়েছে, পরিত্যক্ত ক্যাম্প বা সেনানিবাসের জমি প্রকৃত মালিক অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

চুক্তির ‘খ’ ও ‘গ’ খণ্ড অনুযায়ী, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অবশ্যই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য হতে হবে। জেলা পরিষদে ৩৫ জন সদস্যের মধ্যে একজন চেয়ারম্যানসহ ২৪ জন পাহাড়ি সদস্যের বিপরীতে বাঙালিদের জন্য আসন রয়েছে মাত্র ১১টি। অনুরূপভাবে, আঞ্চলিক পরিষদে ২৫ জন সদস্যের মধ্যে চেয়ারম্যানসহ ১৮ জন পাহাড়ি সদস্যের বিপরীতে বাঙালি প্রতিনিধি রয়েছেন মাত্র সাতজন। এতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও সামাজিক বিচারের ওপর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রায় নিরঙ্কুশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে লেখকের দাবি।

ভূমিসংক্রান্ত ধারা, বিশেষ করে ‘ঘ’ খণ্ডের ভূমি জরিপ, মালিকানা নিশ্চিতকরণ ও ভূমি কমিশনসংক্রান্ত অংশে ভূমির মালিকানা নির্ধারণ ও ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং পাহাড়ি ভূমির হস্তান্তর বা বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেক বাঙালি বসতি স্থাপনকারীকে ইতোমধ্যে ‘অবৈধ’ বা বিতর্কিত দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এতে বাঙালিদের ভবিষ্যৎ চিরস্থায়ী ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে।

চুক্তির ১৭ ও ১৮ ধারায় সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সব স্তরের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে শুধু যোগ্য স্থানীয় প্রার্থী না থাকলে সীমিত সময়ের জন্য বাইরের লোক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। একইভাবে, জেলা পরিষদের হাতে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পুলিশ নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। লেখকের মতে, এসব ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রথমত, লেখকের দাবি অনুযায়ী, ৫১ শতাংশ বাঙালি-অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদ বাঙালিদের জন্য বৈষম্যের প্রথম ধাপ, যা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’-এর ৯ জন সদস্যের সাতজনই স্থানীয় পাহাড়ি সম্প্রদায়ের। বাকি দুজনের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং অন্যজন বিভাগীয় কমিশনার, যারা বাঙালি বা পাহাড়ি—উভয়ই হতে পারেন।

লেখকের মতে, এই বৈষম্যের খেসারত দিচ্ছে ৮১টি গুচ্ছগ্রামে প্রায় মানবেতর জীবনযাপন করা এক লাখ ২৮ হাজারের বেশি বাঙালি পরিবার। তার দাবি, ‘পাহাড়ে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্স’ এসব পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করে আসছে; জমির মালিকানা পাওয়া তো অনেক দূরের কথা।

সাংবিধানিক সংঘর্ষ

বাংলাদেশের সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র। লেখকের মতে, এখানে কোনো আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের সুযোগ নেই। কিন্তু চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানকে ‘বিশেষ অঞ্চল’ ঘোষণা করে আঞ্চলিক পরিষদকে একচেটিয়া কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।

অনুরূপভাবে, সংবিধানের ৬৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের কর্তৃপক্ষ জাতীয় সংসদ। কিন্তু পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ২২ নম্বর ধারা এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য যেকোনো নতুন আইন, বিধি বা প্রশাসনিক নির্দেশ জারির আগে আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের ‘পূর্ব সম্মতি’ নেওয়া বাধ্যতামূলক বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে। তবে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সংশোধনী অনুযায়ী, জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে বলে লেখকের দাবি।

অর্থাৎ, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি ও সেনা মোতায়েনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়ে আমরা প্রকৃত অর্থে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলছি—এমনটাই লেখকের বক্তব্য। তার অভিযোগ, যাদের হাতে আজ বিচার করার ক্ষমতা রয়েছে, তাদের এবং তাদের পূর্বসূরিদের হাত আমাদের রক্তে রঞ্জিত। প্রতিবেশী দেশের ছত্রছায়ায় থেকে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য দায়ী।

ইতিহাসের দর্পণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ও ভারতীয় ইন্ধন

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে নিজেদের স্বতন্ত্র দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে চাকমাদের নিয়ে ১৯৭২ সালে গড়ে উঠেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ১৯৭৩ সালে আত্মপ্রকাশ করে এর সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে পালিয়ে যান এবং ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ সাহায্য-সহযোগিতায় পুরো আশি ও নব্বইয়ের দশকজুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন বলে লেখকের দাবি।

প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার ও পুলিশের সাত শতাধিক সদস্য এবং কয়েক হাজার বাঙালি বসতি স্থাপনকারী নিহত হওয়ার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে দুদেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে সামরিক বা নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তৃতীয় পক্ষকে সহযোগিতা না করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একটি শাখা থেকে প্রকাশিত ‘Cascade of Violence’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরদিনÑঅর্থাৎ ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ সালে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মানবেন্দ্র লারমার সঙ্গে দেখা করে বলে লেখক দাবি করেছেন।

একই বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নেতাদের সাক্ষাৎকারে ভারত কর্তৃক শান্তিবাহিনীকে দেওয়া প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও আশ্রয়ের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

১৯৮৮ সালের ৩ জুন প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত এনায়েতুল্লাহ খানের সম্পাদিত ‘উইকলি ফ্রাইডে’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ১৯৭৬ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সঙ্গে ভারতের মাটিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাক্ষাতের একটি চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশিত হয় বলে লেখক জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সাক্ষাতের সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাশকতা সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হলেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পরবর্তীকালে সংঘাতের পথ পরিহার করে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ভারতীয় পক্ষের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি শান্তিবাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে বলে লেখকের দাবি।

লেখকের মতে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা কখনোই চায়নি যে মানবেন্দ্র লারমা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান করুন। এ কারণে ধারণা করা হয়, ১৯৮৩ সালের ১০ ডিসেম্বর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের কল্যাণপুর ক্যাম্পে মানবেন্দ্র লারমার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতীয়দের হাত ছিল। পরবর্তীকালে মানবেন্দ্র লারমার হত্যাকারী পিকে চাকমাকে আগরতলায় ভারতীয় সুরক্ষায় বসবাসের সুযোগ দেওয়া হলে বিষয়টি স্পষ্ট হয় বলে লেখক দাবি করেছেন।

শুধু তা-ই নয়, ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে ভারত কলকাতায় চার দিনব্যাপী একটি ‘বিশ্ব চাকমা সম্মেলন’ আয়োজন করে। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করা এবং ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের মতো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এসব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য শান্তিবাহিনীকে দীর্ঘকাল মদত দিয়ে গেছে।

এই আলোচনা থেকে লেখকের সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখা, নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতনির্ভরতা সৃষ্টি করা এবং সর্বোপরি বাধাহীনভাবে বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত জলরাশিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের প্রবেশপথ উন্মুক্ত রাখার মতো বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করাই ছিল ভারতের মূল উদ্দেশ্য।

ভারতবান্ধব সরকার ক্ষমতায় আসা এবং শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় কিছু সময়ের জন্য স্থিতাবস্থা বিরাজ করলেও মাত্র এক বছর পরÑঅর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর, প্রসিত বিকাশ খিসার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতি ভেঙে গঠিত হয় ইউপিডিএফ, যাদের চুক্তিবিরোধী কট্টর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চুক্তিপন্থিদের সঙ্গে তাদের গোলাগুলির নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলেছে।

এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে নাথান বমের নেতৃত্বাধীন কেএনএফ বা ‘কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট’, যা ২০১৮ সালে গঠিত কেএনডিও বা ‘কুকি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশন’-এর সামরিক শাখা বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তাদের তাণ্ডবে কিছুদিন আগেও বান্দরবান জেলার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল উত্তপ্ত ছিল।

ইউপিডিএফের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ না পাওয়া গেলেও নাথান বমের মিজোরামে লুকিয়ে থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে বলে লেখক দাবি করেছেন। তবে কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর বসবাস বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার—এই তিন দেশে বিস্তৃত হওয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে মদত দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই কমবেশি সতর্ক থাকবে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়।

দেশে দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন ও বিশেষ সুরক্ষা আইন

ওপরের আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তথাকথিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি এখনো সুদূরপরাহত। অনেকটা একপেশে শান্তিচুক্তি করে আমরা নিজেরাই নিজেদের পাশার দান উল্টে দিয়েছি। তাই এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।

যেহেতু শান্তিবাহিনী এবং পরবর্তীকালে ইউপিডিএফ বা কেএনএফের উত্থানের পেছনে বহিঃশক্তির যোগসূত্র রয়েছে বলে লেখক মনে করেন, সেহেতু শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা দ্রুত সংশোধন করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম দুটি বিষয় হচ্ছে সেনাক্যাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেনাবাহিনীর অভিযানের অধিকার শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া।

এজন্য প্রয়োজনে আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলে একই ছাতার নিচে থাকা অন্য তিন দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করা যেতে পারে। যুক্তরাজ্যের ‘সিভিল অথরিটিজ (স্পেশাল পাওয়ার্স) অ্যাক্ট (নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড), ১৯২২’ সংগঠন বা সভা নিষিদ্ধ করা, কারফিউ আরোপ, বিনা বিচারে আটক এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় শক্তি প্রয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছিল বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। বিভাজন-সংক্রান্ত সহিংসতা ও পরবর্তী আইআরএর কার্যক্রমের সময় আইনটি ব্যবহৃত হয়েছিল।

ভারতের ‘আর্মড ফোর্সেস (স্পেশাল পাওয়ার্স) অ্যাক্ট’ (এএফএসপিএ), ১৯৫৮ এ ক্ষেত্রে পথ দেখাতে পারে বলে লেখক মনে করেন। কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্যের গভর্নর কর্তৃক ‘বিশৃঙ্খল’ ঘোষিত এলাকার জন্য আইনটি প্রযোজ্য হয়। এটি সশস্ত্র বাহিনীকে সমাবেশ বা অস্ত্রসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ—সতর্ক করার পর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগসহ—সন্দেহের ভিত্তিতে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, বিনা পরোয়ানায় প্রাঙ্গণে প্রবেশ ও তল্লাশি এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত আশ্রয়স্থল বা অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করার ক্ষমতা দেয়।

পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে ‘অ্যান্টি-টেররিজম অ্যাক্ট’, ১৯৯৭ (পরবর্তী সংশোধনীসহ) এবং সাংবিধানিক জরুরি অবস্থা বা গভর্নর শাসনের বিধান বেলুচিস্তান, সাবেক ফাটা বা উপজাতীয় অঞ্চল এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, কলম্বিয়া, সৌদি আরব, ইসরাইল ও নাইজেরিয়াসহ প্রায় সব দেশ এ ধরনের বিশেষ ক্ষমতাসংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করে থাকে বলে লেখকের বক্তব্য।

আমাদের করণীয়

১. আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। কিছুদিন আগে খবর বেরিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এক হাজার এপিসি কেনা হবে। আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন, দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য খোলা পিকআপে টহলরত সৈনিকদের জন্য পাহাড়ি রাস্তায় চলাচল উপযোগী এপিসি ও ড্রোন কেনা বেশি প্রয়োজন, নাকি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এগুলো বেশি প্রয়োজন? অর্থনৈতিক এই দুঃসময়ে আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।

২. আমাদের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মাণ করতে হবে সুরক্ষিত সীমান্তপ্রাচীর, তৈরি করতে হবে আন্তঃযোগাযোগ রক্ষাকারী টানেল এবং অসংখ্য সীমান্তচৌকি। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি শত্রুকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে হবে।

৩. স্থানীয় প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা না হলে কোনো কার্যক্রমই ফলপ্রসূ হবে না। আমরা দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেকোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে প্রথমেই বাঙালি এবং সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনীর প্রতি আঙুল তোলা হয়। কিন্তু যারা প্রকৃত ক্ষমতাবান এবং যাদের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না বলে লেখক মনে করেন, সেই পরিষদ নেতারা সবসময় জবাবদিহির বাইরে থেকে যান। তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা হলে এবং সরকার প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধার হিসাব চাওয়া হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে।

৪. বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে দেশের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত করার আন্তরিক প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই সংঘাতের জায়গায় ফুটবে সহমর্মিতার ফুল, বইবে ভ্রাতৃত্বের সুবাতাস।

ভারত কখনোই চাইবে না যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন কোনো জাতিরাষ্ট্র গঠিত হোক। কারণ, তাতে দেশটির একাধিক স্বাধীনতাকামী জনপদে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরো উৎসাহিত হতে পারে। কাজেই আমাদের পাহাড়ি বন্ধুদের যেমন বাইরের কারো ফাঁদে পা দেওয়া চরম বোকামি কিংবা আত্মহত্যার শামিল, তেমনি আমাদের সরকারকেও বুঝতে হবে, এই সমস্যাকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ মনে করে দাবার ঘুঁটি সাজাতে হবে; আতঙ্কিত হয়ে আত্মসমর্পণ করা চলবে না।

পরিশেষে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় জনগণকে বুঝতে হবে, পর্যটন ও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ অপার সম্ভাবনাময় এই পার্বত্যভূমির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ইস্পাতের মতো কঠিন ও দৃঢ়। চার দশক ধরে আমরা সেই দায়বদ্ধতার কথা লিখে চলেছি রক্তের দলিলে।

সাজেক, বান্দরবান বা রাঙামাটির মতো দর্শনীয় স্থানগুলোর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি যেখানে পর্যটন ও কৃষিনির্ভরতা, সেখানে পর্যটন এবং কৃষিপণ্য বিপণনের পথ বন্ধ করে দিলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাবে, অবৈধ মাদক চোরাচালানের দ্বার উন্মুক্ত হবে এবং সাধারণ মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। পাহাড়ে ফিরে আসবে আশি ও নব্বইয়ের দশকের সেই জোর করে উদ্বাস্তু বানানোর অন্ধকার যুগ।

তাই পাহাড়ে বসবাসকারী পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সব নিরীহ জনগণের প্রতি অনুরোধ থাকবে, মাত্র তিন হাজার সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীর কাছে আপনারা ১০ লাখ মানুষ জিম্মি না থেকে খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে আসুন। বিশাল বাংলাদেশের গর্বিত প্রতিনিধিত্ব করুন দেশে ও বিদেশে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল; চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস)

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন