২০২৬ সালে হজ অনুষ্ঠিত হবে মে মাসের শেষ সপ্তাহে—চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে মূল হজের দিনগুলো ২৫-৩০ মে ২০২৬-এর মধ্যে পড়বে বলে প্রত্যাশিত। সে সময় যখন বিশ্বের প্রায় ১৭ লাখ মুসলিম মক্কায় হজ পালনের জন্য সমবেত হবেন, তখন বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার হাজি এই পবিত্র সফরে অংশ নেবেন। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হিসেবে হজ যেমন গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও এটি একটি বিশাল আর্থিক প্রবাহ—যা আমাদের নীতিনির্ধারকরা এখনো যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি। গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি অস্বস্তিকর চিত্র উঠে আসে : সৌদি আরব বাংলাদেশকে যে কোটা বরাদ্দ দিয়েছে, আমরা তা পূরণ করতে পারছি না। ২০২৪ সালে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের কোটার বিপরীতে প্রায় ৮৫ হাজার জন এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৮৭ হাজার ১০০ জন হজে যেতে পেরেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের হজ কোটা কমিয়ে ৭৮ হাজার ৫০০ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই পতনের পেছনে কোনো ধর্মীয় ঔদাসীন্য নেই; আছে নিছক অর্থনৈতিক বাস্তবতা—ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার সংকোচন।
ব্যয়ের চাপ ও টাকার অবমূল্যায়ন
২০২২ সালে যেখানে সরকারি প্যাকেজে একজন হাজিকে ব্যয় করতে হতো চার লাখ ৬২ হাজার টাকা, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৮৩ হাজার টাকায়। অন্তর্বর্তী সরকারের চেষ্টায় ২০২৫ সালে এটি কমে আসে চার লাখ ৭৮ হাজার টাকায়। কিন্তু ২০২৬ সালে আবার বেড়ে হয়েছে প্রায় ছয় লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই উত্থান-পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন। ২০২২ সালে এক সৌদি রিয়ালের দাম ছিল ২৪ দশমিক ৩০ টাকা, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫০ টাকায়। মাত্র তিন বছরে ৩৪ শতাংশ অবমূল্যায়ন। সৌদি প্রান্তে কোনো মূল্যবৃদ্ধি না ঘটলেও শুধু এই বিনিময়হারের কারণেই একজন হাজির ব্যয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা বেড়ে যায়। সমস্যাটি এখানেই—হাজির আয় টাকায়, ব্যয় ডলার ও রিয়ালে।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, একই মানের হজ প্যাকেজে একজন বাংলাদেশি পাকিস্তানিদের চেয়ে ৪৭ শতাংশ এবং ইন্দোনেশীয়দের চেয়ে ৯৩ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছেন। কেন? কারণ ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে একটি কেন্দ্রীয় হজ তহবিল আছে, যারা আগেভাগে বড় পরিমাণে বিমান টিকিট ও হোটেল রুম বুক করে রাখে। বাংলাদেশে শত শত বেসরকারি এজেন্সি প্রতিযোগিতার নামে শেষ মুহূর্তে দাম পরিশোধ করে। ফলে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না।
বৈদেশিক মুদ্রার বার্ষিক বহিঃপ্রবাহ
প্রত্যেক হাজি ব্যক্তিগত খরচের জন্য কমপক্ষে ৪০ হাজার সৌদি রিয়াল এবং কোরবানির জন্য আরো ৭৫০ রিয়াল সঙ্গে নিয়ে যান। প্যাকেজের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত বিমান ভাড়া, হোটেল, মোয়াল্লেম ফি—সবই বিদেশি মুদ্রায় পরিশোধিত। গড়ে একজন বাংলাদেশি হাজির বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয় তিন হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোর হিসাব মেলালে বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক হজ-সংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ থেকে ৫৫ কোটি ডলারে। সংখ্যাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের তুলনায় ছোট মনে হতে পারে কিন্তু এর তাৎপর্য সংখ্যায় নয়, সময়ে। এই পুরো অর্থ এপ্রিল থেকে জুন মাত্র ছয় থেকে ১০ সপ্তাহের একটি সংকুচিত সময়সীমার মধ্যে দেশের বাইরে চলে যায়, ঠিক যখন বাংলাদেশ ব্যাংক জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির জন্য ডলার সংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ করুন ওমরাহ, যা এখন বৈশ্বিকভাবে হজের চেয়েও বড় তীর্থযাত্রা। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে এক কোটি ৬৯ লাখ মানুষ ওমরাহ পালন করেছেন। বাংলাদেশ থেকেই প্রতি বছর এক লাখের বেশি যান। হজ ও ওমরাহ মিলিয়ে বার্ষিক বহিঃপ্রবাহ সম্ভবত ৫০ থেকে ৭০ কোটি ডলার—একটি মাঝারি আকারের আমদানি খাতের সমতুল্য।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের মডেল
১৯৬৩ সালে মালয়েশিয়া পৃথিবীর প্রথম স্বতন্ত্র হজ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘লেমবাগা তাবুং হাজি’ (টিএইচ) প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে এর ৯৩ লাখ আমানতকারী রয়েছেন, সঞ্চয়ের পরিমাণ ৭৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত ছাড়িয়েছে এবং মালয়েশিয়ায় ১২৫টি শাখা ও সৌদি আরবে একটি অফিস রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তাবুং হাজি প্রতি হাজিকে ভর্তুকি দেয়। ২০১৯ সালে যখন প্রকৃত হজ খরচ ছিল ২২ হাজার ৯০০ রিঙ্গিত, তাবুং হাজি প্রতিটি হাজির কাছ থেকে নেয় মাত্র ৯ হাজার ৯৮০ রিঙ্গিত। অর্থাৎ মাথাপিছু ১২ হাজার ৯২০ রিঙ্গিত ভর্তুকি, যা আমানতকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আয় থেকে অর্থায়ন হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ২০১৪ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ‘বাদান পেংগেলোলা কেউয়াঙ্গান হাজি’ (বিপিকেএইচ) প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০১৮ সাল থেকে এটি কার্যকর। প্রত্যেক নিবন্ধনকারী দুই হাজার ২০০ ডলার প্রাথমিক জমা দেন এবং ১২ বছরের অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকেন। ২০১৭ সালেই বিপিকেএইচে ছিল ৭ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। ছোট দেশ মালদ্বীপও ২০১৩ সালে বেসরকারি অপারেটরদের প্রতারণার পর রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘মালদ্বীপ হজ করপোরেশন’ গঠন করে। কোটার ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রীয়, বাকি ৫০ শতাংশ লাইসেন্সধারী বেসরকারি খাতে।
অথচ বাংলাদেশে যেখান থেকে বছরে এই তিনটি দেশের যৌথ সংখ্যার চেয়েও বেশি হাজি যান, কোনো কেন্দ্রীয় হজ তহবিল নেই। ২০২৫ সালে আমাদের কোটার মাত্র ৮ শতাংশ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ছিল, বাকি ৯২ শতাংশ বেসরকারি এজেন্সির হাতে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ কয়েকটি ব্যাংকে ‘মুদারাবা হজ সঞ্চয় হিসাব’ আছে বটে কিন্তু এই জমা টাকা হজের জন্য নির্দিষ্ট বিনিয়োগে যায় না, যায় ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগ পুলে। ফলে আমানতকারী মুনাফা পান কিন্তু সম্মিলিত দরকষাকষির সুবিধা পান না।
কোরবানি অর্থনীতি : এক উপেক্ষিত খাত
হজের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বিশাল অর্থনৈতিক ঘটনা হলো ঈদুল আজহার কোরবানি, যা বাংলাদেশে এক বিস্ময়কর মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে কোরবানি হয়েছে এক কোটি চার লাখ আট হাজার ৯১৮টি পশু। এরমধ্যে রয়েছে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার গরু, ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ছাগল, চার লাখ ৭১ হাজার ভেড়া এবং এক লাখ ১৩ হাজার মহিষ। শিল্প খাতের অনুমান অনুযায়ী, ঈদুল আজহাকেন্দ্রিক মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমাদের জাতীয় জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ, মাত্র তিন দিনের মধ্যে।
এই কোরবানি থেকেই বছরের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, যা আমাদের ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের চামড়া রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল। কিন্তু সাভারের হেমায়েতপুরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) আজও পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না। ফলে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ সনদ আমাদের নাগালের বাইরে। ২০২৫ সালে ট্যানারি মালিকরা চীনা ক্রেতাদের কাছে চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৪৫ ডলার প্রতি বর্গফুটে, যা এক দশক আগের ১ দশমিক ৪০ ডলারের তিন ভাগের এক ভাগ। ওই বছর কোরবানির সংখ্যাও কমে দাঁড়ায় ৯১ লাখে—চার বছরের সর্বনিম্ন। কারণ ২৭ মাস ধরে চলমান ৯ শতাংশের ঊর্ধ্বে মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ভেঙে দিয়েছে।
কোরবানি কি নিষ্ঠুর? বিজ্ঞান কী বলে
ইউরোপের কিছু দেশে দাবি ওঠে, স্তব্ধকরণ (স্টানিং) ছাড়া পশু জবাই অমানবিক। জার্মানির হ্যানোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি স্কুলের অধ্যাপক উইলহেম শুলৎসে ও ডা. হাজিম নুমান ইসিজি ও ইইজি যন্ত্র ব্যবহার করে যে পরীক্ষা চালান, তার ফলাফল স্পষ্ট—ইসলামি পদ্ধতিতে জবাইয়ের পর তিন সেকেন্ডের মধ্যেই পশুর মস্তিষ্কের ব্যথা-সংকেত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বিপরীতে পশ্চিমা ক্যাপ্টিভ-বোল্ট স্টানিংয়ে পশুটি দৃশ্যত স্থির হলেও মস্তিষ্ক তীব্র ব্যথার সংকেত পেতে থাকে। অতএব আধুনিক যন্ত্রনির্ভর জবাইয়ের তুলনায় শরিয়াহসম্মত কোরবানিই বেশি মানবিক। এ কথা ধর্মীয় যুক্তিতে নয়, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে প্রমাণিত। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পশ্চিমে হালাল সরবরাহ চেইনের আইনি বৈধতা মাঝে মাঝেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
একটি বাংলাদেশ হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ—এখনই
আমাদের সুপারিশ স্পষ্ট। বাংলাদেশের একটি সংবিধিবদ্ধ হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (বিএইচএমএ) গঠন করা উচিত—তাবুং হাজি ও বিপিকেএইচ মডেলে। প্রাথমিক মূলধন সরকারি অনুদান এবং বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকে অলস পড়ে থাকা প্রাক-নিবন্ধন ফি থেকে আসতে পারে। কর্তৃপক্ষ শরিয়াহসম্মত সুকুক, হালাল অর্থনীতির ইক্যুইটি এবং সৌদি প্রান্তে আবাসন যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করবে। হাজির পক্ষে আগেভাগে বিমান টিকিট ও হোটেল কিনে রাখবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ফরোয়ার্ড বৈদেশিক মুদ্রা চুক্তির মাধ্যমে এক বা দেড় বছর আগেই রিয়াল-টাকা বিনিময়হার আটকে রাখবে, যাতে টাকার অবমূল্যায়নের পুরো বোঝা হাজির ঘাড়ে চাপতে না পারে।
একই সঙ্গে কোরবানি অর্থনীতিকে কৌশলগত রপ্তানি খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। হেমায়েতপুরের সিইটিপি পুনর্গঠন এবং এলডব্লিউজি সনদ অর্জন হবে অগ্রাধিকার। কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণের সময় একে ‘দাতব্য সামগ্রী’ হিসেবে নয়, শিল্পপণ্য হিসেবে দেখতে হবে। বেসরকারি হজ এজেন্সি ও হাব-কে অবিলুপ্ত নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত অংশীদার হিসেবে রাখতে হবে—মালদ্বীপের ৫০:৫০ মডেলে। ওমরাহ-কেও এই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। কারণ, ওমরাহ-সংক্রান্ত বহিঃপ্রবাহ এখন হজের চেয়েও বড়।
মালয়েশিয়া ১৯৬৩ সালেই এই পথ ধরেছে, ইন্দোনেশিয়া ২০১৪ সালে, মালদ্বীপ ২০১৩ সালে। বাংলাদেশ এই তিন দেশের যৌথ সংখ্যার চেয়েও বেশি হাজি পাঠায়। অথচ ছয় দশক ধরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়েনি। সমস্যা প্রযুক্তির নয়, রাজনৈতিক ইচ্ছার। মডেল প্রস্তুত, পথ চিহ্নিত—অপেক্ষা শুধু সিদ্ধান্তের। যারা বছরের পর বছর সঞ্চয় করেন একটিমাত্র পবিত্র সফরের জন্য, তাদের প্রতি এ দায়িত্ব আমাদের রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কোরবানি : ত্যাগের আনন্দ, হারানোর প্রাপ্তি