ভারতের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন বিরোধী দলের হাতে

ভারতের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন বিরোধী দলের হাতে
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি।

দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নরেন্দ্র মোদিকে একদম অপরাজিত মনে হতো। ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) দেখে মনে হতো তারা বিরোধীদের সব আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে বিতর্ক এলো আর গেল। রাফাল চুক্তির দুর্নীতির অভিযোগের খবর তোলপাড় তুলল ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বিজেপির কোনো ক্ষতি করতে পারল না। বিরোধীদের সব দাবিই পরপর ভেস্তে যাচ্ছিল। তবে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলাতে শুরু করল। ক্ষমতায় ১২ বছর উদ্‌যাপনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় বিজেপি এখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত।

বিজ্ঞাপন

খুব কম মানুষই ভেবেছিল, দলটি রাজপথের আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করবে। অথচ গত জুনে ছাত্রদের টানা আন্দোলনের মুখে পড়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

সেই আন্দোলন তো ছিল কেবল শুরু। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মতো দলগুলো সেই শক্তিকে কাজে লাগাল। ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়াকে ঘিরে তারা আন্দোলন ছড়িয়ে দিল। তাদের অভিযোগ ছিল, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিরোধী ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

বিরোধী দলগুলো এই সুযোগটি হাতছাড়া করেনি। তারা এসআইআর বাতিল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুলল। পরিবর্তনের এই হাওয়া সামলাতে বিজেপি এখন হিমশিম খাচ্ছে। তাদের সামনে এমন এক আন্দোলন দাঁড়িয়েছে, যার কোনো একক নেতা নেই, আক্রমণ করার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো সংগঠনও নেই। পুরোনো কোনো কৌশলই কাজ করছে না। পরিস্থিতি দেখে আন্না হাজারের আন্দোলনের কথা মনে পড়ে যায়। মনে হচ্ছে বড় কোনো সংকটে রূপ নিতে যাচ্ছে সবকিছু।

কেন্দ্রবিহীন এক আন্দোলন

তরুণ আন্দোলনকারীরা যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন, তা কিন্তু নতুন নয়। কংগ্রেসও কয়েক মাস ধরে এসআইআরের বিরোধিতা করে আসছে। তবে এবারের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি অনেক বেশি। আন্দোলনের মাঠে এখন ছাত্র, কৃষক, বুদ্ধিজীবী এবং সিজেপির নেতাকর্মীরা সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিরজা চৌধুরী একটি বিষয়ে নির্দেশ করেছেন। তার মতে, কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা না থাকা সত্ত্বেও নানামুখী দলের অংশগ্রহণে এই আন্দোলন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। একেক শহরে একেক পতাকার নিচে প্রতিবাদ ফেটে পড়ছে। সিজেপি নেতারা গ্রেপ্তার হলে অন্য দলগুলো মাঠ দখলে নিচ্ছে। যেমন ধরুন মুম্বাইয়ের কথা। ২ অক্টোবরের সিজেপির কর্মসূচির পরপরই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে। এভাবে আন্দোলন তার রূপ বদলে চলেছে বারবার। ১২ অক্টোবর রাহুল গান্ধী এই পুরো বিষয়টিকে সবার জন্য এক উন্মুক্ত আহ্বান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। চৌধুরী আরো যোগ করেন, বড় সাফল্য পেতে হলে কংগ্রেসকে ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েই কাজ করতে হবে।

মতাদর্শগত পার্থক্য কিন্তু এই আন্দোলনকে দুর্বল করতে পারেনি। সিজেপির মূল লক্ষ্য জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। অন্যদিকে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ কষছে। সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সংসদ সদস্য রাজীব রাই বলেন, ভেতরের ছোটখাটো মতভেদের চেয়ে আমাদের যৌথ লক্ষ্যটাই এখন বড়।

এসআইআর-সংক্রান্ত সমস্যাটি সবাইকে এক ছাতার নিচে এনে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সংসদ সদস্য মনোজ ঝা স্পষ্ট করে বলেন, প্রশাসনিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে এখন সব দল এক কণ্ঠে কথা বলছে।

বিজেপির দ্বিধাদ্বন্দ্ব

বিজেপি তাদের চিরচেনা কৌশলে পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোটব্যাংকের রাজনীতি এবং মেরূকরণের অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু এই অভিযোগগুলো জনগণের মনে তেমন দাগ কাটতে পারেনি। দলটির এখন ভয় হচ্ছে, বেশি পুলিশি পদক্ষেপ নিলে সরকারকে স্বৈরাচারী মনে হবে। এতে জনগণের রাগ আরো বাড়তে পারে।

কঠোর হাতে আন্দোলন দমনের চেষ্টা উল্টো প্রভাব ফেলেছে। মুম্বাইয়ে গান্ধী জয়ন্তীর আন্দোলন বেশ শান্তভাবে সামলানো হয়েছিল, তাই পরিস্থিতি বাড়েনি। কিন্তু দিল্লিতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে এবং ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের আটকানোর চেষ্টা করে। পুলিশ প্রহার করছে এবং আন্দোলনকারীদের টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আন্দোলনের দিকেই চলে গেছে।

সরকার ঘনঘন প্রেস ব্রিফিং করছে। কিন্তু অনবরত জবাব দিতে গিয়ে তারা বিষয়টি গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে রেখে দিচ্ছে। তাছাড়া দলের শীর্ষ নেতারাও গোপনে স্বীকার করছেন, জনগণের এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল ভার্নিয়ার্স একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তার মতে, সরকারের প্রতিক্রিয়া কেমন হচ্ছে, তার ওপরই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। কঠোর দমনপীড়নের মাধ্যমে সরকার মূলত আন্দোলনকারীদের অভিযোগগুলোকেই সত্যি বলে প্রমাণ করে দিচ্ছে।

আটক এবং আইনি জটিলতা সরকারের ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে। ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের অবৈধভাবে আটক করা বন্ধ করতে হবে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি রামাসুব্রামানিয়ানের বেঞ্চ জানান, জনগণের চলাচলে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। আদালত আগের নির্দেশনা অমান্য করার কারণে অবমাননার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

১২ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর জবাবে দলগুলো বারখাম্বা রোডে প্রতিবাদ সরিয়ে নেয়। এক জায়গায় বাধা দিয়ে আন্দোলন থামানো গেল না। এটি প্রমাণ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী রূপ বদলাতে এই আন্দোলন কতটা পারদর্শী।

নেতৃত্বে কংগ্রেস

বিজেপির এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে কংগ্রেস। রাহুল গান্ধী ছোট দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে সহযোগিতার পথ বেছে নেন। তিনি সিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের এই লড়াইকে একটি যৌথ লড়াই হিসেবে অভিহিত করেন। বিভিন্ন খবরে জানা যায়, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে রাহুল গান্ধীর বাড়িতে একটি বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, বারখাম্বা রোডের সমাবেশের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময় জ্যেষ্ঠ বিরোধী নেতাদের সঙ্গে ছাত্রনেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের পদক্ষেপগুলো বিরোধীদের হাতে নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিয়েছে। গত জুলাইয়ের প্রতিবাদের পর রাহুল গান্ধী ছাত্রদের ওপর পুলিশের সহিংসতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। পেলেট গানের আঘাত পাওয়া ভুক্তভোগীদের তিনি গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসেন। নিজে ধর্নায় বসে প্রশ্ন তোলেন, পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ কে দিয়েছে? এর ফলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত পৌঁছায়। সাম্প্রতিক লাঠিচার্জের ঘটনার পর একই কৌশল গ্রহণ করেন তিনি।

এই কৌশলের কারণে আন্দোলন দিন দিন বড় হচ্ছে। বারখাম্বা রোডের সমাবেশে আসা ছাত্ররা জানান, বড় কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কারণে তারা নিরাপদে প্রতিবাদ জানাতে পারছেন। তবে আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য কিন্তু একটাই—জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ।

রাহুল গান্ধী আড়ালে থেকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে একত্র করার কাজ করছেন। আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় কংগ্রেস।

ভার্নিয়ার্সের মতে, রাহুল গান্ধী নিজেকে বিরোধী জোটের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্য নেতারাও তার সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জিও জোটে রাহুলের নেতৃত্ব মেনে নিতে সম্মতি প্রকাশ করেছেন।

আগামীর পথ

কয়েক বছরের ব্যর্থ চেষ্টার পর বিরোধী দলগুলো এখন বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরের ঘটনাগুলো তাদের কর্মী-সমর্থকদের চাঙা করে তুলেছে।

তবে শুধু ভোটার তালিকার বিষয়টি নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। চৌধুরী মনে করিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের এই সমর্থনকে বাস্তবে ভোটে রূপান্তর করতে হবে। তাই যেসব ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তা পুনর্বহাল করা অত্যন্ত জরুরি। ভার্নিয়ার্স জোর দিয়ে বলেন, ভোটার তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে বাদ পড়া মানুষদের ফিরিয়ে আনতে পারলে বিরোধী দলগুলো বড় ধরনের জনসমর্থন পাবে।

সমাজবাদী পার্টি নেতা রাজীব রাই মনে করেন, এই আন্দোলনকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণ অনেক ভোটার এসআইআরের মতো জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ঠিকমতো বোঝেন না। বিরোধীদের কাজ হবে এই বিষয়গুলোকে সরাসরি বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং স্থবির উন্নয়নের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া।

বর্তমানে এই আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই, এমনকি প্রাথমিক দাবির বাইরে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনাবৃত্তও নেই। এর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের সঙ্গে কতটা মিশে যেতে পারছে, তার ওপর। বিরোধী দলগুলোর সামনে এখন সুযোগ এসেছে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার।

আউটলুক ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর জুলফিকার হায়দার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...