ন্যাটোতেও ভাঙন ধরাচ্ছে ইরান যুদ্ধ

ড. শেরকাবি রুদানি

ন্যাটোতেও ভাঙন ধরাচ্ছে ইরান যুদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ ন্যাটোর মধ্যে একটি কাঠামোগত মতবিরোধ বা ফাটলকে উন্মোচিত করছে, যা এই সামরিক জোটের বর্তমান বাহ্যিক যেকোনো হুমকির চেয়েও বেশি গুরুতর প্রমাণিত হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদেশগুলোকে ইরান যুদ্ধে যোগ দিতে বললেও তারা এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করে এই সংঘাতে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে। এরপরই ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইউরোপ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে না, আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রও আর ইউরোপের পাশে দাঁড়াবে না। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই সংঘাত পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের সামরিক জোট ন্যাটোর মধ্যে স্পষ্ট একটি বিভক্তি তৈরি করেছে। সদস্যদেশগুলোর পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকার আগামী দিনে ন্যাটোর ঐক্য ও সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

ন্যাটোর কোথায় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী—তা নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে থাকায় এই সামরিক জোট একটি নীরব কিন্তু বিপজ্জনক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। সেই ঝুঁকিটি হচ্ছে—ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। তবে এবারই প্রথম যে ন্যাটোকে এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে, তা নয়। এর আগে স্নায়ুযুদ্ধের পর ইউরোপের বলকান অঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে ন্যাটো নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর হামলার পর ন্যাটো একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা শক্তিতে পরিণত হয় এবং এর মূল ভৌগোলিক পরিধির বাইরেও বিশেষ করে, আফগানিস্তানে শক্তি প্রদর্শন করে। অতিসম্প্রতি রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল এবং ইউক্রেনে আগ্রাসন ন্যাটোকে তার মূল লক্ষ্যে অর্থাৎ ইউরোপের পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষায় ভূমিকা পালনে ফিরিয়ে এনেছে।

কিন্তু ইরান যুদ্ধ এক ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে ন্যাটোর সামনে। ইরানের বর্তমান যুদ্ধ ইউক্রেনের মতো নয়, যা সরাসরি ইউরোপীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে, বরং মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ন্যাটোর কৌশলগত মূল কেন্দ্রের প্রান্তে অবস্থিত। আর এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র, যেখানে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা—সবই বর্তমানে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ইউরোপীয় মিত্র দেশের জন্য এই যুদ্ধ অগ্রাধিকার নয়, বরং তাদের অগ্রাধিকার অন্যত্র। যতদিন ইউক্রেনের যুদ্ধ চলবে, ততদিন এসব দেশের মনোযোগ দৃঢ়ভাবে ইউরোপের এই অঞ্চলের দিকেই থাকবে। কারণ, ইউক্রেনের পর রাশিয়ার নজর এই অঞ্চলের অন্য দেশের ওপরও পড়তে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইউরোপ গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে তাদের সম্পদ, রাজনৈতিক মনোযোগ এবং কৌশলগত লক্ষ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গির এই ভিন্নতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কয়েকটি ইউরোপীয় সরকার ইরানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে যোগ দিতে বা হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানো একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে। গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্নটি হচ্ছে—ন্যাটোর মূল উদ্দেশ্য কী?

কয়েক দশক ধরে উত্তরটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মধ্যে হুমকির একটি সাধারণ স্তরবিন্যাস ছিল, যা ইউরোপ মহাদেশের প্রতিরক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এমনকি যখন ন্যাটো তার ভূমিকা সম্প্রসারিত করেছিল, তখনো সেই অন্তর্নিহিত ঐকমত্যটি অটুট ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থে ন্যাটোর মূল লক্ষ্যের বাইরে সংস্থার সামরিক শক্তিকে ব্যবহার শুরু করায় আজ এতে বিভক্তি এবং একইসঙ্গে এতে ক্ষয় হতে শুরু করেছে।

ওয়াশিংটন ক্রমবর্ধমানভাবে ন্যাটোকে একটি বৈশ্বিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করছে, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত একাধিক রণাঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে চায়। এর বিপরীতে, অনেক ইউরোপীয় দেশ এখনো এই জোটকে প্রাথমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডগত প্রতিরক্ষা সংস্থা হিসেবেই দেখে। দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির এই ব্যবধানটি এখন আর সামান্য নয়, বরং তা ক্রমেই বড় আকার নিচ্ছে।

এর ফলে ন্যাটোর অভ্যন্তরে একটি ক্রমবর্ধমান কৌশলগত দ্বৈতবাদ তৈরি হচ্ছে। একটি দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা এবং নমনীয়তার ওপর জোর দেয়। অন্যটি ভৌগোলিক মনোযোগ এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দেয়। যদি এর সমাধান না করা হয়, তবে এই বিভেদ ন্যাটোকে একটি সুসংহত জোট থেকে পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারের একটি ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে পারে।

এর পরিণতি তাত্ত্বিক নয়। ন্যাটোর শক্তি কখনোই শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করেনি, বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে একটি সাধারণ বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করেছে। যখন সেই সাধারণ উপলব্ধি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সমন্বয় আরো কঠিন এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বর্তমান সংকটটিই হয়তো সেই মুহূর্ত যখন এই পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হবে।

এছাড়া, ইউরোপীয় সতর্কতা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত। ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধগুলো একটি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে, যা অস্পষ্ট উদ্দেশ্য এবং অনিশ্চিত পরিণতির সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার উদ্বেগকে আরো জোরদার করেছে। ইউরোপের অনেক সরকারের আশঙ্কা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা সেই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করবে।

সে কারণেই ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ানোর ঝুঁকি নিয়েছে। এই মতভেদ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ন্যাটোতে একটি অভিন্ন কৌশলগত সংস্কৃতি বজায় রাখা ততই কঠিন হবে। এর পেছনে একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত হিসাবনিকাশও কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় একটি বড় রণাঙ্গন খুললে তা অনিবার্যভাবে ইউরোপের ওপর ন্যাটোর মনোযোগকে দুর্বল করবে। আর রাশিয়া ঠিক এটাই চাইছে। কারণ ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িত থাকা পশ্চিমাদের মনোযোগ বিভক্ত হলে মস্কোর খুশি হওয়ারই কথা। ন্যাটো যত বেশি একাধিক সংকটে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে, রাশিয়ার নিকটবর্তী পরিধিতে তার কৌশলগত পদক্ষেপের সুযোগ ততই বাড়বে।

অন্যদিকে, চীন ভিন্নভাবে লাভবান হবে। মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরে যাওয়ায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি মনোযোগ অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, তার সামগ্রিক কৌশল তত কম সুসংহত হবে।

এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমনটা পোলিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন কূটনীতিক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি একবার যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ইউরেশিয়াজুড়ে স্থিতিশীলতা পশ্চিমা শক্তিগুলোর কৌশলগত সংহতি বজায় রাখার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। যখন সেই সংহতি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন প্রতিযোগীদের জন্য নিজেদের অনুকূলে ভারসাম্য পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।

হরমুজ প্রণালি এই উভয় সংকটকে তুলে ধরে। বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ এবং সামুদ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য এই প্রণালির নিরাপত্তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এটাকে রক্ষা করা কোনো নিরপেক্ষ কাজ নয়। ওয়াশিংটন যাকে প্রতিরক্ষামূলক অভিযান হিসেবে তুলে ধরছে, তেহরান সেটাকে যুদ্ধের সরাসরি সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সংঘাত থেকে কীভাবে বেরিয়ে যাওয়া যাবে, সে ব্যাপারে ট্রাম্পের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা পথনির্দেশিকা ছাড়া ইউরোপীয় সরকারগুলো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে না চাওয়া অযৌক্তিক কিছু নয়। বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিহিত, তা হলো সংহতি এবং জোটের মধ্যে পার্থক্য। ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ করতে চায়। এখানেই আসল চ্যালেঞ্জটি নিহিত।

ন্যাটো এখন পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারের প্রেক্ষাপটে পথ চলছে। এই অগ্রাধিকারগুলো হলো—ইউরোপে রাশিয়ার হুমকি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং এশিয়ায় কৌশলগত প্রতিযোগিতা। ন্যাটো যদি তার অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংস্থাকে এর জন্য মূল্য দিতে হবে। ন্যাটোকে বৈশ্বিক সংঘাত থেকে সরে আসতে হবে বিষয়টি এমন নয়, বরং সংস্থাকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে নিজের ভূমিকা ও লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সম্প্রসারণ নয়, কৌশলগত শৃঙ্খলাই এখন বিশ্বাসযোগ্যতার চাবিকাঠি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু ন্যাটোর সামরিক অবস্থানকেই পরীক্ষা করছে না, এটি পরীক্ষা করছে সংস্থার পরিচয়কেও। ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো কীসের জন্য লড়াই করতে ইচ্ছুক, সংস্থাটি যদি তা নির্ধারণ ও সমন্বয় করতে না পারে, তবে আসল ফাটল ও আঘাতটি বাইরে থেকে নয়, বরং ভেতর থেকেই আসবে।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন