বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পালাবদল, আন্দোলন, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সংঘাত একটি পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা। এই ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি একদিকে যেমন কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে নানা সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের কারণে রাজনৈতিক সংকটের জন্মদাতা হিসেবেও সমালোচিত হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতীতের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করা সময়ের দাবি।
১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ক্ষমতায় এসে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জনে সক্ষম হয়। তবে ১৯৮১ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে দেশ আবার অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হয় এবং স্বৈরশাসনের সূচনা ঘটে। এর ফলে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এ সময়েও দলটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও সংবিধানে এই ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে বিলম্ব করে, যা বিরোধী দলগুলোকে আন্দোলনে যেতে বাধ্য করে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। এভাবে স্বৈরাচার-পরবর্তী গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় দেশকে আবার সংকটের দিকে নিয়ে যায়। ফলে, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন আয়োজন করে বিএনপি। তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে দিতে বাধ্য হয় বিএনপি সরকার। পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এ সংকট রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট করে দেয়। একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে। তবে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচন কেন্দ্র করে বিচারকদের বয়সসীমা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় বিএনপি। বিরোধী দলগুলো বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখলে আবার আন্দোলন শুরু হয়। এই উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই বিএনপি তার মেয়াদ শেষ করে। তাদের সাজানো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে। তবে যেই প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে আন্দোলনের সূচনা, তিনি দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করায় রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করে। এরই মধ্যে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের লগি-বৈঠার আন্দোলনে জামায়াত নেতাকর্মীদের নৃশংসভাবে হত্যা এবং হত্যা-পরবর্তী লাশের ওপর বামপন্থি রাজনৈতিক দলের গুন্ডাবাহিনীর সদস্যরা নৃত্য করতে থাকে। রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির রাজনৈতিক অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষমতা হস্তান্তর-পরবর্তী দেশে স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশের কাঠামোকে সুদৃঢ়ভাবে রেখে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। পরে এর প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো তীব্র আকার ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের ১/১১ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে সামরিক শাসন। চলে দুই বছর। এই অস্বাভাবিক শাসনব্যবস্থা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করে তোলে। রাজনীতি বিশ্লেষক ও সচেতন মহল, এটিকে পুরোপুরি বিএনপির সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারার ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচনা করে।
পরে রাজনৈতিক সংকট আরো গভীরে প্রোথিত হয়, যখন মেধা-যোগ্যতা উপেক্ষা এবং সুপারসিডের মাধ্যমে বিএনপির নিয়োগ করা সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়ন ও ‘কূটনীতিক ষড়যন্ত্রে’র মাধ্যমে সাজানো নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সাল থেকে জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে। এ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিরোধী দলের ওপর চাপ, মামলা-হামলা এবং নেতৃত্বের সংকট—সব মিলিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়। এ সময় খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাবন্দি বা নির্বাসিত জীবনযাপনে বাধ্য করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এই দীর্ঘ সময়ে ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগ জামায়াতের প্রতি বেশি খড়গহস্ত ছিল। আওয়ামী লীগ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ ও ‘সাজানো মামলা’র মাধ্যমে দলীয় বিচারকদের দিয়ে ফাঁসির রায় প্রদান এবং তা কার্যকর পর্যন্ত করে। এভাবে বিরোধী দলকে ও নেতৃত্বকে ধ্বংস করে একদলীয় শাসনের দিকে দেশকে নিয়ে যায়।
বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় এসে গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করা, জুলাই বিপ্লবের সনদ এবং চেতনা বাস্তবায়নে গড়িমসি করা কিংবা একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে এবং শঙ্কা জাগছে, তাহলে দেশ কি আবার একই ধরনের সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে? বিএনপি কি আবার অতীতের মতো ভুলপথে হাঁটছে? বিএনপি কি তার অতীত অভিজ্ঞতা অনুধাবন করবে না? তাদের ভুলপথে কে বা কারা পরিচালিত করছে? আবার কি বিএনপি দেশকে সংকটে ফেলবে?
অতএব, বিএনপির সামনে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তারা চাইলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অন্যথায়, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেশকে আবার অস্থিতিশীলতার ও সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আমরা বলতে পারি, অতীতের পুনরাবৃত্তি জাতির জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। বাংলাদেশের জনগণ এখন স্থিতিশীলতা, জবাবদিহি এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করে। নির্বাচনের আগে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি বিএনপি একটি দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে সেটি শুধু দলের জন্যই নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও মঙ্গলজনক হবে। এখন সময়—সংকট নয়, সমাধানের পথে হাঁটার।
জনগণের প্রত্যাশা একটাই—রাজনীতি হোক প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যম, ক্ষমতার নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা হোক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন, কৌশলী সুবিধাবাদের নয়। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি কোন পথটি বেছে নেয়।
লেখক : প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার, প্রেসিডেন্ট সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

