এক পণ্ডিত মশায় বাংলা ব্যাকরণের ক্লাস নিচ্ছিলেন! ছাত্রদের কারক আর বিভক্তি বোঝানোর নিমিত্তে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন, কপাল ভিজিয়া গেল নয়নের জলে। বেয়ারা এক ছাত্র ওঠে প্রশ্ন করলেন, স্যার, নয়নের জল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে কীভাবে কপালে উঠে পড়ল? পণ্ডিত মশায় কটমট করে ওই বেয়াড়া ছাত্রটির পানে তাকিয়ে নিচের লাইনে লিখলেন, পা দুটি বাঁধা ছিল গাছেরও ডালে!
এই গুরু মশায় ভুল করে কপোলের (গাল) জায়গায় কপাল লিখে ফেলেছিলেন। নিজের ভুলটিকে সহজভাবে স্বীকার না করে নিজের কথাটিকে সঠিক প্রমাণের জন্য পা দুটি গাছের ডালে বেঁধে দিলেন!
এটাই আমাদের জাতীয় চরিত্র হয়ে পড়েছে। তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শফিউল আলম প্রধানের ছেলে রাশেদ প্রধান তার বাগ্মিতার জন্য অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। ওনার বাবা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করে গেছেন! সেই রাশেদ প্রধান তার এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে খালেদা জিয়ার ‘কুলাঙ্গার’ সন্তান বলে গালি দিয়েছেন! তার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী রাশেদ প্রধানের বাসার সামনে গিয়ে হুমকি-ধমকিসহ তার ব্যক্তিগত সহকারীকে আক্রমণ করেছেন। আপনি যদি জামায়াত- এনসিপি জোটের একনিষ্ঠ সমর্থক হন, তবে রাশেদ প্রধানকে এখানে ‘সরি’ বলার পরামর্শ দেওয়া যাবে না। আর আপনি যদি বিএনপির একনিষ্ঠ সমর্থক হন, তবে এই মুহূর্তে এটাকে ‘মব’ বলে ডাকতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত রাশেদ প্রধানকে দেখা গেল তিনি জাতিকে ‘কুলাঙ্গার’ শব্দটির অর্থ শেখাচ্ছেন।
এসব শিখতে শিখতে জাতি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! পণ্ডিত বা সুশীল সমাজ সরকার বাহাদুরের পা দুটি গাছের ডালে বাঁধবেন, তবু পলিসি মেকারদের ভুল স্বীকার করবেন না। তারা রাজনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি, বিনোদন—সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে শামুকের মতো নিঃশব্দে কেমন করে যেন সরকারের পাশে ঘিরে যান! এই দেশটিতে যারাই সরকারে গেছেন—তাদের আশপাশেই এই পণ্ডিতরা ভিড় করেছেন। এই চাটার দল প্রত্যেকটি সরকারকে ভুলপথে পরিচালিত করেছে এবং যথারীতি সরকারকে জনরোষের খাদে ফেলে নিজেরা পগারপার হয়েছে ।
শেখ হাসিনা যত দিন গদিতে ছিলেন, তত দিন সব কৃতিত্ব তাকে দেওয়া হতো! কোনো নায়ক- নায়িকার সংসার টিকে গেলেও এর জন্য সব কৃতিত্ব দেওয়া হতো শেখের বেটি শেখ হাসিনাকে। চামচা এক উজির তো বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে পুরুষ তো একজনই আছেন। আর তিনি হলেন শেখ হাসিনা!’ জানি না আত্মস্বীকৃত এই অ-পুরুষগুলো তাদের পশ্চাদ্দেশ নিয়ে কীভাবে নিজ স্ত্রীর সামনে যেত?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এদের হাত থেকে নিরাপদে আছেন—আলামত দেখে তা মনে হচ্ছে না! প্রধানমন্ত্রীকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওপর থেকে উৎসাহ না পাওয়ায় এটা বোধহয় থেমে গেছে! কিন্তু অনেক বসন্তের কোকিলদের কুহু কুহু ডাকে পুরোনোরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
এই ভূখণ্ডে ৮০ বছরের মধ্যে পতাকার পরিবর্তন দুবার হলেও সরকারের পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার! ব্রিটিশরা যে বুরোক্রেটিক সিস্টেম তৈরি করে রেখে গিয়েছিল—হুবহু তাদের নিয়েই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সরকার যাত্রা শুরু করে! একইভাবে ১৯৭১ সালে আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলেও বলতে গেলে পুরো পাকিস্তানের প্রশাসন নিয়েই শেখ মুজিব সরকার যাত্রা শুরু করে!
এখন সরকার পরিবর্তন হলেও সিভিল ও মিলিটারি বুরোক্রেসির আসল খাসলত অপরিবর্তিত থেকে যায়! তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এরাই মূল প্রতিবন্ধক! এরা জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার মওকা পেয়ে গেছে। কাজেই জনগণের পক্ষে এমন কোনো সংস্কারে এরা উৎসাহী হবে না, যা তাদের শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক কমফোর্টকে সীমিত করে ফেলবে। এদের গ্রিপ বা কবজা থেকে বের হওয়া কঠিন।
দীর্ঘদিন ইউরোপে থাকা এক ডিজিটাল সারেং বউ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আ হা রে! কত দিন যে বলি না—বা নু রে, এক গ্লাস পানি দে!’ জনগণকে বানু (চাকর/চাকরানি) বানিয়ে রাখার এই কিসিমের কমফোর্ট আমাদের আমলা-কামলারা ছাড়তে চায় না বলেই আমাদের দেশে প্রকৃত সংস্কার হয় না!
রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থাকাবস্থায় যেসব নীতিকথা বলে, সরকার আসলে তা বলতে পারে না! যারা ভাবছেন—জামায়াত ক্ষমতায় এলে রাতারাতি দেশটিকে পাল্টে ফেলবে, তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি। আনোয়ার ইব্রাহিম ও এরদোয়ান ইসলামি দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও আগের সিভিল ও মিলিটারি বুরোক্রেটিক কাঠামোর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে টিকে রয়েছে। কিন্তু মিসরের কয়েক হাজার বছরের মধ্যে প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসি এই কাঠামোর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ/অ্যাডজাস্ট করতে পারেনি বলে এক বছরের বেশি টিকতে পারেননি।
আমাদের দেশের সিভিল ও মিলিটারি বুরোক্রেটদের অতিরিক্ত আরেকটি গিরগিটি চরিত্র রয়েছে! যখন যে সরকার আসে, অতিদ্রুত এরা রঙ পরিবর্তন করে ফেলতে পারে! এদের সঙ্গে যোগ হয় বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও বিনোদন জগতের কিছু সুবিধাবাদী মানুষ! জনগণের ভোটে সরকার গঠিত হলেও পরে তাদের কবজায় পুরো সরকারটি চলে যায়।
তাই আমার কাছে মনে হয়, জুলাই-উত্তর জনগণের এই প্রত্যাশা এবং সিস্টেমের এনটেংগেলে পড়ে গেছে বিএনপি!
এক-এগারো নামক বাঘের হিংস্র নির্যাতন এবং তারপর সতেরো বছর নির্বাসনে কাটানোর পর আজ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন তারেক রহমান । তার মতো ‘জীবন থেকে নেওয়া’ এ রকম অভিজ্ঞতা খুব বেশি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের হয়নি! তবে চারপাশে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এই পণ্ডিতদের পাণ্ডিত্যের বদৌলতে কিংবা অতিমাত্রার বিএনপিপ্রেমিকদের কর্মকাণ্ডের কারণে আবার যদি নতুন এক-এগারো কিংবা ৫ আগস্ট আসে, তবে তার মূল ধকলটি রহমানকে কিংবা তার পরিবারকেই বহন করতে হবে!
তখন সারা দেশ ইয়া-নাফসি (২) করে, কাছের আত্মীয়রাও ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মেলায়! মীরজাফর ও ঘষেটি বেগম সিরাজুদ্দৌলার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন! মীরজাফরকে সেনাপতি পদে বসিয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলার নানা! সেই মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় শুধু সিরাজুদ্দৌলা এবং তার পরিবারই নিশ্চিহ্ন হয়নি, পুরো জাতি দুই শ বছরের জন্য পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়!
আমাদের জীবদ্দশায় এক নতুন মীরজাফরকে দেখলাম। রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণের পর মেজর জেনারেল পর্যন্ত প্রমোশন পেয়েছেন! এই বিরল উত্থানটি সম্ভব হয়েছিল যে আত্মীয়তার বদৌলতে—সেই আত্মীয়তার বুকেই ছুরিটি বসিয়েছেন! এক-এগারোর মূল ক্রীড়নকদের মধ্যে এই জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অন্যতম! সব মীরজাফরের পরিণতি একই হয়! তিনি হয়তো ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে এই দুনিয়াতেই তার কৃত নিমকহারামির কিছু ফল পেতে হবে! তিনি রিমান্ডে জানিয়েছেন, দুজন পত্রিকার সম্পাদক বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন!
তারা সেই দুই চ্যাম্পিয়ন সম্পাদক, যারা দাবি করেছিলেন যে এক-এগারো তাদেরই ব্রেইন চাইল্ড! তাদের সেই ব্রেইন চাইল্ডই পরে ফ্যাসিবাদী বাকশালের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে নিজেরা সেইফ এক্সিট পায়। অর্থাৎ এক-এগারোর সরকার এদের ব্রেইন চাইল্ড হলে ফ্যাসিবাদী বাকশাল এদের গ্র্যান্ড ব্রেইন চাইল্ড! আঁতুড়ঘরের পরিচর্যা থেকে পূর্ণ বিকশিত হওয়া পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের পুরো দায়িত্বটিই এই দুটি পত্রিকা পালন করে। বিশেষ করে, ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য জঙ্গি নাটকের পুরো স্ক্রিপ্টটি তাদেরই লেখা।
আবার ছাত্র-জনতার অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটাকেও হাইজ্যাক করে নেয় তাদেরই এক বরপুত্র! সত্যি আজব ক্যারিশমা নিয়ে এরা জন্মেছে। ইন্টেরিম সরকারের পর গণতান্ত্রিক সরকারেও তারা নিজেদের উপস্থিতি এবং প্রভাব বজায় রেখেছে! এদের কখনো মাথার ওপরে, কখনো হৃদয়ের মণিকোঠায়, আবার কখনো বাহুডোরে বেঁধে রেখে যারা সংস্কারের স্বপ্ন দেখছেন—তারা সবাই বোকার স্বর্গে বাস করছেন!
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করা হবে! তাহলে পুরো বিষয়টি এভাবে জনগণের সামনে হাজির করা হলো কেন?
সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের শুরু থেকেই প্রেস নোটস লিখে যিনি জনপ্রিয় সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন এবং ১৬ বছর যিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে টকশোতে জাতীয়তাবাদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন, সেই সায়ন্থ ভাই হতাশার সুরে বলেছেন, বিএনপির পক্ষে কথা বলার জন্য এখন কোনো পয়েন্ট পাচ্ছি না!
এক-এগারোর পর শেখ হাসিনা উচ্ছ্বাস ভরে বলেছিলেন, এক-এগারো আমাদের আন্দোলনের ফসল। তখন তার এই কথার প্রতিবাদ করে তারই দলের এক নেতা ও ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছিলেন, এক-এগারো আমাদের আন্দোলনের ফসল নহে—এটা আমাদের আন্দোলনের পরিণতি। এই কথা বলার পরই আওয়ামী লীগ থেকে তিনি নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। সেই মাহমুদুর রহমান মান্না পরবর্তী সময়টুকু বিএনপির সঙ্গেই রাজনীতি করেছেন, বিএনপির পক্ষেই বয়ান সৃষ্টি করেছেন। সেই মান্না ভাই সম্প্রতি এক টকশোতে বলেছেন, ধরেন আমি গত পনেরো বছর খুব শক্তভাবে বিএনপির পক্ষে কথা বলেছি। পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে, তাহলে এটার জবাব আমি কী দেব?। এখন কেউ যদি আমাকে এর পক্ষে কথা বলতে বলে, তবে আমি কী কথা বলব?
বিএনপির মাইন্ড বুঝতে জনগণের আসলেই সমস্যা হচ্ছে। জন্মের পর থেকেই যাদের বিএনপির ফেইস হিসেবে দেখে আসছি, সেই ড. মাহবুব উল্লাহ প্রমুখ বলছেন—এই বিএনপিকে চিনতে পারছি না!
কাজেই ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য রহমানকে দ্রুত কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে! এখনো সময় বা সুযোগ পেরিয়ে যায়নি! জনগণকে এই ধারণা দিতে হবে যে এই দেশে গুম আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। একজন সাধারণ আই-কিউ সম্পন্ন মানুষ একটু চিন্তা করলেও সহজেই তা বুঝতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প আইন কতদিনের মধ্যে সংসদে তোলা হবে, তারও একটা স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে! জনগুরুত্বপূর্ণ প্রত্যেকটা অধ্যাদেশ, যেগুলো নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক শুরু হয়েছে—সেগুলো সম্পর্কেও একই পলিসি অনুসরণ করতে হবে! একটি দলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূলধন—পাবলিক ট্রাস্ট। এটি একবার হারালে ফিরে পাওয়া কঠিন!
অন্ধকারেও কিছু আশার আলো
আলো-স্টার-সিপিডি-টিআইবি চক্র তাদের মূল এজেন্ডা হিসেবে তারেক রহমানকে ভিলেন বানানোর যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। রহমান রহমান তার ব্যক্তিগত আচরণ ও জীবনাচার দিয়ে শত্রু-মিত্র সবারই প্রশংসা কুড়িয়েছেন! সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কও গণতান্ত্রিক চর্চার নিরিখে সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে!
তবে তারেক রহমান এবং তার প্রকৃত সুহৃদ উপদেষ্টাদের কিছু কথা মাথায় রাখতে হবে। মনে করুন, আপনার ড্রাইভারের আদব-কায়দা-ব্যবহার অত্যন্ত চমৎকার, দেখতে-শুনতেও ভালো, সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়ে, রবীন্দ্রনাথ সংগীতও অপূর্ব কণ্ঠে গায়। কিন্তু ড্রাইভিংটি ভালো করে পারে না, নানা জায়গায় ধাক্কা খাওয়ায়। এ রকম ড্রাইভারকে আপনি রাখবেন না।
তেমনি একটি সরকারের কাছেও জনগণের কিছু সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা থাকে—দেশ নামক গাড়িটিকে সঠিকভাবে চালাক! মূল কাজটি ঠিকভাবে পারলে বাকি গুণগুলো হাজারগুণে গ্লোরিফাই হয়ে সুবাস ছড়াবে। জিও-পলিটিক্যাল কারণে নূরুল কবীররা কিছুদিন নাকে রুমাল দিয়ে সহ্য করবেন, তবে বেশিদিন সহ্য করবেন না!
আমি একজন আশাবাদী আদমি—এই দাবি থেকে এখনো সরিনি! ক্ষুব্ধ এক গ্রাহক যখন তেলের লম্বা লাইন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করছেন—তা দেখে রাগ না করে খুশি হলাম। খুশির কারণ এই—বাংলা মুল্লুকে একজন সাধারণ মানুষ তাদের প্রধানমন্ত্রীকে খোলা মনে গালি দিতে পারছে এবং এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত তার মুণ্ডুটি ঠিক জায়গায় রয়েছে। তার সেই গালাগালের ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়েছে! এই ভিডিও আমি নিজে শেয়ার করে মন্তব্য করেছি যে এই ভিডিও প্রমাণ করে—এ দেশের মানুষ যে কাউকে গালি দিতেও ভয় পায় না!
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এক নব্য বিএনপির উসকানি বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে! গণ অধিকার পরিষদ থেকে ডিগবাজি দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া এই নেতা এই গালিবাজ লোকটিকে পুলিশের হাতে সমর্পণের পরামর্শ দিয়েছেন। বছর-কয়েক আগে আজকের এই বীর পুরুষ পুলিশের ধাওয়া খেয়ে কবুতরের মতো কাঁপতে কাঁপতে লাইভে এসে তার জীবন বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিলেন! এখন পর্যন্ত তার এই পরামর্শ পালনের জন্য নতুন কোনো হেলমেট বাহিনী এগিয়ে আসেনি! অনেক উসকানি এবং অনুরোধের পর নিজের পুলিশ বাহিনী নিয়ে সংযম পালনের জন্য আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই জায়গায় একটা ধন্যবাদ পেতে পারেন!
লেখার জবাব লেখা দিয়ে, কথার জবাব কথা দিয়ে দিতে হবে—এই সুন্দর পরামর্শগুলো কি তাহলে শুধু আওয়ামী লীগের জন্যই প্রযোজ্য ছিল? জানি না, নব্য বিএনপিপ্রেমিকদের কাছে এসবের কোনো জবাব আছে কি না!
কাজেই শুধু আইন করে গুম বন্ধ করা যাবে না কিংবা শুধু আইন নামক মুগুর দিয়ে বাকস্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে না। দয়া করে ভুলে যাবেন না যে ‘খেলারাম খেলে’ যা খ্যাত সৈয়দ শামসুল হক ২০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেও তসলিমা নাসরিনের বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করতে পারেননি! শেখ হাসিনার সরকারি এবং বেসরকারি বাহিনী যখন গুম করত, তখনো কিন্তু আইন ছিল যে কাউকে গ্রেপ্তার করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে হাজির করতে হবে। এই আইনটিকে ফাঁকি দিয়েই তো গুম এবং এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংগুলো করা হয়েছিল। আপনারা কি ভাবছেন এবার আমরা আইন করলে ভবিষ্যতে হাসিনা বা তার পোষ্যরা ক্ষমতায় এলে আর গুম করবে না? কারণ আইনকে পাস করানোর কৌশলও তারা বের করে ফেলবে! কাজেই আইনের চেয়েও আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক কমিটমেন্ট এবং জনসচেতনতা।
বর্তমানে আমাদের সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে এই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মারাত্মক অভাব দেখা যাচ্ছে। মনে করুন, গুমের বিরুদ্ধে কঠিন আইন করা হলো। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে গেল যে একজন আরেকজনকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সেই গুমের রানিকে ডেকে আনল।
তখন এই আইন কতটুকু কাজে আসবে?
ব্রাদার, এই অধমকে গালি দেওয়ার আগে ওপরের কথাগুলো নিয়ে কয়েক মিনিট ভাবুন!
লেখক : কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

