ইসরাইল যেভাবে তুরস্ক ও হিজবুল্লাহকে কাছাকাছি আনছে

ইসরাইল যেভাবে তুরস্ক ও হিজবুল্লাহকে কাছাকাছি আনছে
ছবি: সংগৃহীত

সিরিয়ায় পরস্পরবিরোধী স্বার্থকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, ঠিক সে সময়েই তুরস্ক ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এলো। তবে দুপক্ষের এই সম্পৃক্ততার অর্থ এটা নয় যে, ইরান-সমর্থিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আঙ্কারা কাছে টেনে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক-ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ ওমার ওজকিজিলচিক বলেছেন, ইরানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এবং সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় পালন করা ভূমিকার কারণে হিজবুল্লাহকে নিয়ে তুরস্কের সংশয় রয়েছে।

ওজকিজিলচিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে বলেন, ‘আমাদের তুরস্ক ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার দুটি বড় বিরোধের বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে ইরানের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এবং দ্বিতীয়ত, সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর ভূমিকা। তবে সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর দেশটি থেকে হিজবুল্লাহ বিতাড়িত হওয়ার ফলে বিরোধের দ্বিতীয় বড় বিষয়টির সমাধান হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

হিজবুল্লাহ সমস্যা ও ইসরাইলি হুমকি

বাশার আল-আসাদের পতন ঘটিয়ে সিরিয়ার ক্ষমতা দখলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছে তুরস্ক। সে কারণেই তুরস্ক সিরিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে নিজেদের সেনা উপস্থিতিও বজায় রেখেছে। এ কারণে শারার সরকারের সঙ্গে আঙ্কারার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সিরিয়ার ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় আসাদের পক্ষে লড়াই করায় শারার সরকার হিজবুল্লাহর ওপর ক্ষুব্ধ। এ কারণে তুরস্কের সঙ্গেও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক ভালো ছিল না।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির ইদলিব অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও তার মিত্র মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে তুরস্কের সেনা অভিযানে এক ডজনের বেশি হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়। তবে আসাদের পতন আঞ্চলিক সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে এবং সিরিয়া দিয়ে নিজেদের সমরাস্ত্র ও অন্যান্য রসদ সরবরাহের প্রধান পথটি হারিয়েছে হিজবুল্লাহ। এছাড়া ২০২৪ সালে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে তাদের সামরিক সক্ষমতাও কমেছে অনেকটাই।

এই প্রেক্ষাপটে আঙ্কারা এটা নিশ্চিত করতে চায় যে, হিজবুল্লাহ যেন সিরিয়ায় আবার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নতুন সরকারের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। এসব বিষয় নিয়ে বৈরুতে নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সম্প্রতি হিজবুল্লাহর বৈঠক হয়েছে। সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করে হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম সম্প্রতি যে বিবৃতি দিয়েছেন, আঙ্কারা তাকে স্বাগত জানিয়েছে। ওজকিজিলচিক বলেন, ‘তুরস্ক সিরিয়ার সরকার ও হিজবুল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে না, বরং তারা এটা নিশ্চিত করতে চাইছে যে, হিজবুল্লাহ যেন সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বৈরী ভূমিকা পালন না করে।’ হিজবুল্লাহ ও সিরিয়াকে সংঘাত থেকে দূরে রাখার বিষয়টি তুরস্কের জন্য ইতিবাচক হবে। অন্যদিকে, ইসরাইল চায় এই দুপক্ষের মধ্যে যেন বিরোধ তৈরি হয় এবং সংঘাত বাধে।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে অভিহিত করে সিরিয়ায় দেশটির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। ইসরাইল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, তারা নিজেদের সীমান্তবর্তী সিরীয় ভূখণ্ডে তুরস্ককে কোনো ঘাঁটি করতে দেবে না। ইসরাইল আগস্ট মাসে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে একটি ঘাঁটিতে হামলা চালায়, যা তুর্কি সৈন্যরা ব্যবহার করছিল বলে তেলআবিবের দাবি। তবে আঙ্কারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর আগেও সিরিয়ায় তুর্কি অবস্থানে বিমান হামলা করেছে ইসরাইল।

এদিকে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সতর্ক করে বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরাইলি হামলা তুরস্কের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে। কারণ, তার দেশের নিরাপত্তা শুধু তুরস্কের সর্বদক্ষিণের প্রদেশ হাতায়’তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আলেপ্পো, দামেস্ক ও বৈরুত পর্যন্ত বিস্তৃত। এর আগে গত জুন মাসে এরদোয়ান সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোতে আমরা চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিস্থিতি মেনে নেব না এবং এসব দেশে হামলা হলে তা নিয়ে আমরা চোখ বন্ধ করে থাকব না।’

তবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াইরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করা তুরস্কের ইসরাইলবিরোধী মনোভাবের মূল লক্ষ্য নয়, বরং তুরস্ক মনে করে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অব্যাহত উপস্থিতি প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরাইলি আগ্রাসনের সম্ভাব্য অজুহাত হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই আঙ্কারার দৃষ্টিতে, লেবাননে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি সমস্যার একটি অংশ।

তুরস্ক লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর ভূমিকার বিরোধী এবং তারা এই গোষ্ঠীর সামরিক উপস্থিতিকেও সমর্থন করে না। একই সঙ্গে তারা চায় যে, ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ সিরিয়া থেকে সরে আসুক। ওজকিজিলচিক বলেন, ‘তুরস্কের দৃষ্টিকোণ লেবানন ও সিরিয়ায় থেকে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি একটি সমস্যা। তুরস্ক বরং লেবানন ও সিরিয়ার রাষ্ট্রকাঠামো ও কেন্দ্রীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে চায়।’

তুরস্কের এই অবস্থানটিই হয়তো ব্যাখ্যা করে কেন তারা একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং ওয়াশিংটন, দামেস্ক ও বৈরুতের সঙ্গে এমন একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ করা সম্ভব হবে। ওজকিজিলচিক বলেন, লেবাননের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নতুন করে সাজাতে এবং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সহজ করতে তুরস্ক সিরিয়া, লেবানন, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় মিত্রদেশ এবং লেবাননের রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।

তুরস্ক কি হিজবুল্লাহর কাছে অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করছে

আসাদের পতনের পর থেকে হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈরুত বিমানবন্দরের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর কাছে অর্থ পাঠানো হলে তা ইসরাইলি হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন সতর্কতার পর লেবানন ইরান থেকে আসা সব ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছিল। পরে বিমানবন্দরে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ (লাখ লাখ ডলার) পাচারের চেষ্টার সময় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জানা গেছে, তাদের মধ্যে অন্তত একজন ইস্তাম্বুল থেকে এসেছিলেন। এরপর কিছু প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ইরানের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় তুরস্ক হিজবুল্লাহর কাছে অর্থ ও অস্ত্র স্থানান্তরে সহায়তা করছে। এই দাবি অবশ্য নিশ্চিত করা যায়নি।

ওজকিজিলচিক বলেন, যেসব অর্থ বা সম্পদ স্থানান্তরের কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে হয়তো তুরস্কের ইসলামপন্থি রাজনৈতিক বলয়ের এমন কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, যারা ইরান, হিজবুল্লাহ এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’র অন্যান্য পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে এ ধরনের কার্যকলাপ আঙ্কারার সরকারি নীতির প্রতিফলন নয়। হিজবুল্লাহকে সহায়তা করা বা তাদের সহায়তাপ্রাপ্তিতে সহযোগিতা করা তুর্কি সরকারের নীতি নয়।’ ওজকিজিলচিকের মতে, ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরা যাতে এই গোষ্ঠীকে কোনো আর্থিক সহায়তা দিতে না পারে, তা রোধ করতে তুর্কি সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয়সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তুরস্ক ও ইসরাইল কি যুদ্ধে জড়াতে পারে

তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির উগ্রপন্থি মন্ত্রীরা সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে বিরোধের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় তুরস্ক তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে ইসরাইল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের সীমান্তের কাছে কোনো সামরিক অবকাঠামোকে তারা হুমকি মনে করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

ওজকিজিলচিক বলেন, সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘ভূরাজনীতির হিসাব অনুযায়ী সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা কম, তবে নেতানিয়াহু অপ্রত্যাশিত আচরণের জন্য পরিচিত। নির্বাচনী স্বার্থে তিনি যেকোনো সময় ‘হঠকারী কোনো পদক্ষেপ’ নিয়ে বসতে পারেন। আপাতদৃষ্টিতে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তুরস্কের যোগাযোগকে নতুন কোনো জোট গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে না দেখে বরং ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা আঞ্চলিক ভারসাম্য সামলানোর একটি কৌশল হিসেবেই মনে হচ্ছে।

আঙ্কারা হিজবুল্লাহকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যেমন দেখে না, তেমনি সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটিকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার আগ্রহও তাদের নেই। তবে লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহ যেহেতু এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, তাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা তুরস্কের স্বার্থের জন্য অনুকূল। হিজবুল্লাহ সিরিয়ার বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর পাশাপাশি লেবানন ও সিরিয়া থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এজন্যই হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ রাখাকে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে তুরস্ক।

দ্য নিউ আরব অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন