ইরান যুদ্ধ : কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

আলফাজ আনাম

ইরান যুদ্ধ : কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

ইরান যুদ্ধের উত্তাপ এখন বাংলাদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছে। এক দফায় জ্বালানি তেলের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ানো অনিবার্য ছিল। বিশ্বের আরো অনেক দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠবে। এছাড়া জ্বালানির দাম সামনে আরো বাড়বে না—এ কথাও হলফ করে বলা যায় না।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন ইরানে আগ্রাসন চালায়, এরপর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৭১ থেকে ৮১ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করত, সেই তেলের দাম মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ১০৩ ডলারে এবং এপ্রিলের শুরুতে ১২৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠক শুরুর আগে বাজারে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, হয়তো কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হবে। এই আশায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল। ১২ এপ্রিল ২১ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার পর যখন কোনো ঐকমত্য ছাড়াই দুই পক্ষ ইসলামাবাদ ত্যাগ করে, তখন বাজারে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক লাফে ৮ শতাংশের বেশি বেড়ে যায় এবং আবার ১০৩ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আলোচনার ব্যর্থতার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে।

ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবরোধ চলছে। ইসলামাবাদে আবার অস্থায়ী আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে, কিন্তু এই বৈঠক কোনো ফল বয়ে আনবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বরং যেকোনো সময় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হতে পারে এবং ভেঙে যেতে পারে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ অনেকটা থমকে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন খাতে অতিমুনাফা ও মজুতদারির প্রবণতা। সংকটকে পুঁজি করে এমন অনৈতিকতা বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়।

৪ মার্চ যখন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখনই বাংলাদেশে আমদানির প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগে। কারণ বাংলাদেশের জ্বালানির প্রায় ৬৩ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে। ৮ মার্চ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তেল রেশনিং বা সীমিত আকারে বিক্রির নির্দেশ দেয়। মূলত এখান থেকেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়তে থাকে।

পেট্রোল পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খলা মূলত মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তীব্র আকার ধারণ করে। এর প্রধান কারণ ছিল সরকার প্রতিটি পাম্পে দৈনিক চাহিদার তুলনায় ১০ শতাংশ কম তেল সরবরাহ শুরু করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে ঢাকার পাম্পগুলোয় এক থেকে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে ১৩৫, ডিজেলের দাম ১০০ থেকে ১১৫ এবং কেরোসিনের দাম ১১২ থেকে ১৩০ টাকা করা হয়।

শুধু তেলের দাম নয়, রান্নাঘরের গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ২১২ টাকা। ১৮ দিনের মধ্যে দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৫৯৯ টাকা। এর আগে, ২ এপ্রিল ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়।

ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা—সব ক্ষেত্রেই একটি ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা উৎপাদন খরচজনিত মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই যুদ্ধ তাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা মোকাবিলায় সরকারের ব্যবস্থাপনাগত কিছু ত্রুটি ছিল।

জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণে মূল্যস্ফীতির প্রভাব অন্যান্য খাতেও পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে পরিবহন খাতের মালিকরা যাত্রীভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। পরিবহন খরচ জ্বালানির নতুন দামের সঙ্গে শুধু সমন্বয় হবে না, তার চেয়ে বেশি ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। পরিবহন মালিকরা এই সুযোগটি গ্রহণ করবেন।

উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে গিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি আমদানির বিল মেটাতে সরকার ইতোমধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার জরুরি ঋণ চেয়েছে। আইএমএফের ঋণের কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার ছাড় পাওয়ার কথা থাকলেও তা সহসা পাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে।

তেলে-পাম্প

এছাড়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ঋণের শর্ত হিসেবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য তাগাদা দিয়ে আসছে। জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণে ভর্তুকি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আরো বেশি দামে তেল কিনতে হতে পারে, ফলে ভর্তুকির পরিমাণ আরো বাড়তে থাকবে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের কৃষিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে দেশের কৃষি উৎপাদনে যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো মনে করেন, এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ছে সারের ওপর।

বিএনপি সরকারের সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে অতীতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০০১ সালে সারসংকটকে কেন্দ্র করে কৃষক মারা গেছেন, যা বিএনপি সরকারের জন্য ছিল বড় একটি রাজনৈতিক ক্ষত। এ ব্যাপারে এখন থেকে সরকারের সতর্ক হওয়া উচিত।

ইউরিয়া বা নাইট্রোজেনজাতীয় সার তৈরির প্রধান উপাদান হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। যুদ্ধের কারণে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে সারের উৎপাদন খরচ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সারের দাম বাড়লে কৃষকরা জমিতে কম সার ব্যবহার করেন, ফলে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ার কারণে পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে একটি ‘কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ’ বা উচ্চমূল্যের খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আধুনিক কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরি জ্বালানি ও রাসায়নিক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই প্রভাব হবে অত্যন্ত গভীর ।

আধুনিক চাষাবাদে ট্রাক্টর, হারভেস্টার এবং সেচপাম্প চালানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে ডিজেল প্রয়োজন। বাংলাদেশে বর্তমানে বোরো বা আমন মৌসুমে সেচ পাম্পগুলো মূলত ডিজেল বা বিদ্যুৎচালিত। তেলের দাম বাড়ায় বিঘাপ্রতি চাষের খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

খাদ্য উৎপাদনের প্রভাব খাদ্য আমদানিতেও পড়তে পারে। অনেক দেশ তাদের নিজেদের মজুত ঠিক রাখতে গম, চিনি বা চাল রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। আমদানিনির্ভর অনেক খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, খাদ্য উৎপাদন মানে শুধু শস্য নয়—মাছ ও মাংসও এর অন্তর্ভুক্ত। পোলট্রি ও মাছের খাবারের একটি বড় অংশ হলো ভুট্টা ও সয়াবিন। এগুলোর আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ডিম, মুরগি ও মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ার ফলে পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে একটি ‘কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ’ বা উচ্চমূল্যের খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি যে চাপের মুখে পড়েছে, তাতে সরকারের জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচিগুলো খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ও কৃষিপণ্যের দাম যেভাবে বাড়বে, তাতে কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে সরকারের জনপ্রিয়তা কতটা বাড়বে—তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

বরং সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে জ্বালানি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর। কৃষকরা যাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হওয়া দরকার। একই সঙ্গে সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখা সম্ভব হলে অন্তত মানুষের খাবারের সংকট মোকাবিলা করা যাবে। খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানির দাম বাড়ানো বা কৃষির ওপর প্রভাব ফেলবে না; এটি রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় প্রায় ৮০ লাখের মতো প্রবাসী রয়েছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলে যদি প্রবাসীদের ফেরত আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তা শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের সামাজিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলবে। এসব বিষয় নিয়ে সংসদে তেমন কোনো আলোচনা নেই। ভারতের পার্লামেন্টে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আমাদের জন্য এই যুদ্ধ আরো বেশি সংবেদনশীল হওয়া সত্ত্বেও সংসদে তা নিয়ে আলোচনা দেখছি না। অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

alfaz@dailyamardesh.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...