ক্ষমতার রাজনীতিতে নির্বাচনে জোটবদ্ধ হওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে জোটবদ্ধ নির্বাচন বড় দলগুলোর জয় সুনিশ্চিত করে আর ছোট রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর বিজয় সুনিশ্চিত করতে সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে জোটবদ্ধ হওয়াকে বেছে নেয়।
বিগত নির্বাচনগুলোয় বিএনপি-জামায়াতের বিপরীতে আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর জোট থাকলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি-জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এখানে জোটের হিসাবে বাম-ডান মিলেমিশে একাকার হয়েছে। অবশেষে অভ্যুত্থানের অন্যতম স্টেক এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করায় উভয় জোটের নির্বাচনি দৌড় বেশ জোরেশোরেই ছিল। আর তাই বিএনপি ২১২টি সংসদীয় আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভোটের হিসাবে জামায়াতের সঙ্গে ব্যবধান কম।
বিগত জোটে ভোটের হিসাব
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধিক দল অংশগ্রহণ করলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের মধ্যে। নির্বাচনি ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি এককভাবে ২৫২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯৩টি আসন ও প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৪০ দশমিক ৯৭ ভাগ পায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অন্য তিন শরিক দল (জামায়াত, নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট) ৪৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩টি আসন ও প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৬.০৮ ভাগ পায়। বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সম্মিলিতভাবে ৩০০ আসনের মধ্যে ২১৬টি আসন এবং প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৪৭.০৫ ভাগ লাভ করে। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৬২টি আসন ও প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৪০.১৩ ভাগ পায়।
একইভাবে ওয়ান-ইলেভেনের পর নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৮৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০টি আসন। অন্যদিকে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র ৩০টি আসন। শুধু তাই নয়, প্রাপ্ত ভোটের হারের ক্ষেত্রে ছিল বিশাল ফারাক। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪৮ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট এবং বিএনপি পেয়েছিল ৩২ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট। সে নির্বাচনে দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভরাডুবি হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর। চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র দুটি আসনে জয়লাভ করেছিল দলটি। এ ছাড়া ভোট পেয়েছিল ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এবার কে কত পেল
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কোন দল কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভূমিধস বিজয় পাওয়া বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২৯৯ আসনের ভোটে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশগ্রহণ করে। এতে বলা হয়, নির্বাচনে বিএনপি আসন পেয়েছে ২০৯টি। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি। এনসিপি ছয়টি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন পেয়েছে একটি। গণঅধিকার পরিষদ পেয়েছে একটি। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি করে আসন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসনই পায়নি। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ দশমিক ৯ শতাংশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
শতকরা হিসাবের সমীকরণে ও আসল চিত্র
বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেলে বাকি থাকে ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা বাদবাকি ৪৮ দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এই শতকরা হিসাবের যে সমীকরণ মেলায়, তাতে কি আসল চিত্র প্রকাশ পায়? জোটের রাজনীতিতে ধানের শীষে যতগুলো ভোট পড়েছে, তার সবাই কি বিএনপির সমর্থক? আবার দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলিসহ অন্যান্য মার্কায় ভোট পেয়ে যারা জয়ী হয়েছেন, তারা কি শুধু তার দলের সমর্থন পেয়েছেন? তাহলে নির্বাচন কমিশনের করা শতকরা ভোটের হিসাব কতটুকু সঠিক?
কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকায় যে ভোটের হিসাব দেখছি, তা আলাদা আলাদা দলের প্রকৃত ভোটের হিসাব নয়, বরং হিসাব হওয়া উচিত ছিল জোট, জোটের বাইরের দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে।
লেখক : সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

