আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভারত ভাগ নাটক : শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

ভারত ভাগ নাটক : শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের প্রায় এক মাস আগে ভারতীয় রাজনীতি ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করে। এই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল—ভারত স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে বিভাজনের আইনি চূড়ান্তকরণ; ত্বরান্বিতভাবে ব্রিটিশদের প্রত্যাহারের ফলে নেওয়া তাড়াহুড়ো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত; সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে গোপনীয়তা ও অনিশ্চয়তা; অভিজাত রাজনৈতিক সমঝোতা ও সাধারণ মানুষের সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।

১৯৪৭ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন আর বিতর্কের বিষয় ছিল না; তা কার্যকর করার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দ্রুত বাড়তে থাকায় এবং ব্রিটিশ শাসন অবসানের সময়সূচি নাটকীয়ভাবে সংক্ষিপ্ত হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার, ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং মুসলিম লীগ সবাই সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

১৯৪৭ সালের জুলাইয়ের শুরুতে ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন স্পষ্ট করে জানান, ব্রিটেন ১৯৪৭ সালের আগস্টের মধ্যেই ভারত ত্যাগ করবে, যা আগে ঘোষিত ১৯৪৮ সালের জুনের সময়সীমার চেয়ে ১১ আগে। এই ত্বরান্বিত সিদ্ধান্তের গভীর প্রভাব পড়েছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে—১. বিভাজন-সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রস্তুতি অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা হয়; ২. সীমান্ত নির্ধারণের কাজ গোপনে পরিচালিত হয়; ৩. সেনাবাহিনী, সিভিল সার্ভিস ও রেলওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তড়িঘড়ি করে ভাগ করা হয়।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি নাগাদ স্পষ্ট হয়ে যায়, স্থিতিশীলতার চেয়ে গতিকেই (speed) অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যে সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে ব্যাপক সহিংসতা ও উদ্বাস্তু সমস্যার জন্য দায়ী বলে বিবেচিত হয়।

১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে, যখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ভারত স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭’ পাস করে। এই আইনের মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে, দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন ভারত ও পাকিস্তান গঠিত হয়, বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাগের জন্য আইনি বৈধতা প্রদান করা হয় এবং দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই আইন কার্যকর হওয়ার পর বিভাজন আর প্রত্যাবর্তনযোগ্য ছিল না। রাজনৈতিক সংগ্রাম তখন আর দরকষাকষির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভৌগোলিক বিভাজন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো পরিণতি সামলানোই প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাস জুড়ে র‍্যাডক্লিফ সীমান্ত কমিশন নীরবে পাঞ্জাব আর বাংলার সীমান্ত নির্ধারণে কাজ করে। ভারতীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফকে কয়েক কোটিরও বেশি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণকারী সীমান্ত আঁকার জন্য মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল—কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও শিখ প্রতিনিধিরা পরস্পরবিরোধী দাবি পেশ করে; স্বাধীনতার আগে কোনো রাজনৈতিক নেতাকেই চূড়ান্ত সীমান্তরেখা দেখানো হয়নি। মাউন্টব্যাটেন তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে র‍্যাডক্লিফ রায় প্রকাশ স্বাধীনতার পর পর্যন্ত স্থগিত রাখেন। এই গোপনীয়তা বিশেষ করে পাঞ্জাবে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যা আতঙ্ক ও আগাম সহিংসতাকে উসকে দেয়।

ভারতবর্ষের ভূরাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির মাঠে এমন একটা আত্মদহনের হতাশাজনক অবস্থার বীজ বপন করা হয়েছিল, যার প্রভাবে এখনো এখানে-সেখানে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন দেখা থেকে নিষ্কৃতি মিলছে না। ভারতভাগের সময় রাজনৈতিক উৎকোচ, বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক স্বার্থের রশি টানাটানির উপাখ্যান Alex Von Tunzelmann-এর ‘INDIAN SUMMER: The Secret History of the End of an Empire’ (পিকাডর, নিউইয়র্ক, ২০০৭), যেখানে ভারত ভাগ নাটকের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্যপটের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব গোপনীয় ও ক্লাসিফাইড তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষা-পর্যালোচনা করা হয়েছে। তুনজেলম্যানের পড়াশোনা অক্সফোর্ডে, বাস করেন লন্ডনে। ‘ইন্ডিয়ান সামার’ তার প্রথম বই। বইটিতে তার দীর্ঘদিনের নির্মোহ গবেষণার ভিত্তিতে ভারতে ব্রিটিশ শাসন অবসানে নাটকের নেপথ্য উন্মোচনের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। বইটির ‘Rainbow in the Sky’ অধ্যায়ের ২৪১-৪২ ও ২৫৭ পৃষ্ঠায় চট্টগ্রামকে তদানীন্তন পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্তকরণ নিয়ে যে দরকষাকষি হয়েছিল, তার তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক বিবরণ রয়েছে।

এটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে ভারত ভাগের সময় সমৃদ্ধ পাঞ্জাব এবং সম্পদশালী বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করাই ছিল ব্রিটিশ রাজের প্রধান কূটকৌশল। ব্রিটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি-দর্শনের আলোকে ধর্মাবলম্বীর প্রাধান্যের বিচার-বিবেচনায় বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। গণভোট নিয়ে সাব্যস্ত হয় সিলেট কোন অংশে যাবে।

একসময়কার রাজধানী ও শিল্পনগরী কলকাতাকে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ও দাবির প্রেক্ষাপটে পূর্ববঙ্গ বড্ড বেমানান পরিস্থিতিতে পড়ে; কেননা কৃষিপ্রধান পূর্ববঙ্গের কাঁচামাল ও সহায়-সম্পদ দিয়ে যে কলকাতা নগরীর পত্তন, সেই কলকাতাকে কংগ্রেস ভারতভুক্তকরণে অটল থাকায় পাকিস্তান, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ ব্যর্থ রাষ্ট্র বা পঙ্গুত্ব বরণ করে টিকবে না (‘at least one half of Pakistan was set up to fail’)—এ আশঙ্কা প্রবল হয়। ১৯৪৭ সালের ২৬ এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন (১৯০০-১৯৭৯) মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর (১৮৭৬-১৯৪৮) কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জিন্নাহ চটজলদি জবাব দেন, কলকাতা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান প্রাপ্তির পক্ষপাতী তিনি নন, বরং তিনি মনে করেন দুই বাংলা একত্রে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হলে ভালো হবে। (নিকোলাস ও অন্যরা সম্পাদিত দ্য ট্রান্সফার অব পাওয়ার ১৯৪২-৪৭, ১০ম খণ্ড, পৃ. ৪৫২)। শরৎ চন্দ্র বসু (১৮৮৯-১৯৫০) এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩) যুক্ত বাংলার প্রস্তাব তুললে কংগ্রেসের চোখ রাঙানিতে তা উবে যায়। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) স্মরণ করেন—‘শরৎ বাবু কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কারণ সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল (১৮৭৫-১৯৫০) তাকে বলেছিলেন, শরৎ বাবু পাগলামি ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।’ মিস্টার প্যাটেল শরৎ বাবুকে খুব কঠিন কথা বলে বিদায় দিয়েছিলেন। কলকাতা ফিরে এসে শরৎ বসু খবরের কাগজে বিবৃতির মাধ্যমে এ কথা বলেছিলেন এবং জিন্নাহ যে রাজি হয়েছিলেন, এ কথা স্বীকার করেছিলেন।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, অষ্টম মুদ্রণ, জানুয়ারি ২০২২, পৃ. ৭৪)। সোহরাওয়ার্দী সাহেব এমন প্রস্তাবও দেন যে, কলকাতা ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ছয় মাস ‘ফ্রি সিটি’ হিসেবে থাকুক। প্যাটেল মুখের ওপর বলে দিলেন ‘Not even for six hours.’ (হডসন, এইচভি, দ্য গ্রেট ডিভাইড: ব্রিটেন-ইন্ডিয়া-পাকিস্তান, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৫, পৃ. ২৭৬-৭৭)।

ঠিক এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চট্টগ্রাম দেওয়ার পরিকল্পনাতেও কংগ্রেস বাদ সাধল—চট্টগ্রামও ভারতের চাই; যুক্তি—পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যার সিংহভাগ অ-মুসলিম। অ-মুসলমানপ্রধান অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানে থাকতে পারে না। ভারত চট্টগ্রামও পাবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মাউন্টব্যাটেন দেখলেন, বঙ্গভঙ্গের সময়ও আসামসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ববঙ্গের সঙ্গে ছিল, আজ দার্জিলিং হাতছাড়া পাকিস্তানের, উত্তরবঙ্গের সঙ্গে করিডোর রেখে ভুটান ও নেপালে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হচ্ছে। গভর্নর ফ্রেডারিক বারোজ ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ‘সে ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ স্রেফ পল্লি বস্তিতে (rural slum) পরিণত হবে।’ সবার কাছে প্রতীয়মান হলো পূর্ব পাকিস্তান যাতে টিকতে না পারে, সেজন্য এই ব্যবস্থা।

ভারত ভাগের ঠিক দুদিন আগে সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল মাউন্টব্যাটেনকে লেখা পত্রে জোর দাবি তুললেন—চট্টগ্রাম ভারতের চাই, পাকিস্তানকে এটা দেওয়া হবে চরম অন্যায় (‘manifestly unjust’)। (মাউন্টব্যাটেন পেপারস, এমবি ১/ডি ৮৫)। মাউন্টব্যাটেন প্যাটেলের এ পত্রে ক্ষেপে গেলেন প্যাটেলের ওপর এবং লিখলেন তার ব্যক্তিগত প্রতিবেদনে—‘The one man I had regarded as a real statesman with both feet firmly on the ground, and a man of honour whose word was his bond, had turned out to be as hysterical as the rest.’ (ভাইসরয়ের পার্সোনাল রিপোর্ট নং ১৭, ১৬ আগস্ট ১৯৪৭, দ্য ট্রান্সফার অব পাওয়ার, প্রাগুক্ত, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৭৬১)। প্যাটেলের এই পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে মাউন্টব্যাটেনের মনে হলো কলকাতা-বঞ্চিত পূর্ববঙ্গে যাতে নিজেই নিজের দুর্ভোগের শিকার হয় (‘To fail on its demerits’) এবং পূর্ববঙ্গ যাতে নিজেই নিজেকে গড়ে তুলতে অক্ষম হয়, এমন একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র নির্মাণের (‘A nation deliberately designed to be incapable’) ফন্দি আঁটা হয়েছে।

শেষ মুহূর্তে চট্টগ্রামকে নিয়ে কংগ্রেসের এহেন আপত্তির প্রেক্ষাপটে মাউন্টব্যাটেন প্রমাদ গুনলেন। কীভাবে ফিরোজপুর ভারতকে দেওয়ার প্রতিদান হিসেবে পাকিস্তানকে চট্টগ্রাম প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়, তার পথ খুঁজতে গিয়ে তিনি র‍্যাডক্লিফের বাঁটোয়ারা ম্যাপ (রোয়েদাদ) জারি পেছানোর পথ পেয়ে গেলেন। তিনি যত তাড়াতাড়ি নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায়, তত মঙ্গল মনে করলেন। ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১৭ আগস্ট র‍্যাডক্লিফের বাঁটোয়ারা ম্যাপ জারির দিন সাব্যস্ত হলো। ‘আগে আমি করাচি ও দিল্লির ক্ষমতা হস্তান্তর কাজ নির্বিঘ্নে শেষ করি, তারপর ১৭ তারিখ এটি জারি করলে দাঙ্গা ও হাঙ্গামা থেকে আগাম রেহাই মিলবে।’ হলোও তাই। ১৭ তারিখ ম্যাপ দেখে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হতভম্ব, যুগপৎ খুশি আবার অখুশিও। দ্বিখণ্ডিত পাঞ্জাব ও বাংলা চরম দাঙ্গার মধ্যে পড়ে গেল। দেখা গেল, প্রথম তিন দিন (১৪-১৬ আগস্ট) সীমান্তবর্তী জেলা হিন্দুপ্রধান খুলনায় ভারতীয় পতাকা উড়লেও খুলনা পাকিস্তানের এবং মুসলমানপ্রধান মালদহে পাকিস্তানি পতাকা উড়লেও মালদহ ভারতের ভাগে পড়েছে। ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত, হিন্দুপ্রধান খুলনা ভারতের হবে সম্ভবত এ হিসেবে তারা মোংলা বন্দরসহ (যদিও তখন চালনা বা মোংলায় বন্দর চালু হয়নি) খুলনাকে পাওয়ার দাবিতে আগেভাগে সোচ্চার হয়নি।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা মহাত্মা করম চাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮) ভারত ভাগ ও হস্তান্তরের মধ্যে থাকলেন না। বরং ভারত ভাগের অব্যবহিত পরে যে ভয়াবহ দাঙ্গা বাধে, সেখানে তিনি সংখ্যালঘুদের পক্ষ নিতে কলকাতায় অবস্থান নিলেন।

১৯৪৭ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই আলাদা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস: জওহরলাল নেহরু ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনে মনোযোগ দেন; প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; অনিচ্ছাসত্ত্বেও কংগ্রেস চূড়ান্তভাবে বিভাজন মেনে নেয়। অন্যদিকে মুসলিম লীগ: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল হওয়ার প্রস্তুতি নেন; করাচিকে পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে নির্ধারণ করা হয়; দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান শুরু করতে হবে—এই বাস্তবতা নিয়ে লীগ নেতারা দুশ্চিন্তায় পড়েন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও সংবিধানগত ক্ষমতা হস্তান্তর নির্বিঘ্ন করতে উভয় পক্ষ কৌশলগতভাবে সহযোগিতা করছিল, যদিও আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে সহিংসতা চলছিল।

১৯৪৭ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মাউন্টব্যাটেন ঘোষণা করেন, পাকিস্তান স্বাধীন হবে ১৪ আগস্ট এবং ভারত স্বাধীন হবে ১৫ আগস্ট। এই ঘোষণার মাধ্যমে চূড়ান্ত সময়সূচি নিশ্চিত হয় এবং প্রশাসনিক তৎপরতা আরো বেড়ে যায়—সশস্ত্র বাহিনীর বিভাজন ত্বরান্বিত হয়; কোষাগারের অর্থ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। পতাকা উত্তোলন, শপথ গ্রহণ ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নেওয়া হয় প্রায়ই চলমান রক্তপাতের মধ্যেই।

যদিও রাজনৈতিক নেতারা সংবিধানগত রূপান্তর ও রাষ্ট্রগঠনে মনোযোগী ছিলেন, তবু পর্যাপ্ত সময় ও কার্যকর কর্তৃত্বের অভাব নিশ্চিত করেছিল—ভারত বিভাজন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক ঘটনায় পরিণত হবে।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন