আকবর দ্য গ্রেট। মোগল সাম্রাজ্যের মহান সম্রাট। অতুলনীয় বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতায় গড়ে তুলেছিলেন এই বিশাল সাম্রাজ্য। পিতা সম্রাট হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর শিশু বয়সেই আরোহণ করেছিলেন সিংহাসনে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর ৪ মাস। না ছিল অক্ষরজ্ঞান, না ছিল রাজ্য শাসনের সামান্যতম ধারণা। কিন্তু তার অভিভাবক ছিলেন সেনাপ্রধান বৈরাম খাঁ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত, দক্ষ ও প্রতিভাবান এক সামরিক কমান্ডার। তিনি মূলত আকবরকে এক মহান সম্রাট হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
বৈরাম খাঁর সাহচর্যে থেকে আকবর বুঝেছিলেন, হারানো রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং বিশাল মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন বৈরাম খাঁর মতো দক্ষ ও প্রতিভাবান একদল পরামর্শক। মূলত বৈরাম খাঁই সাম্রাজ্যের অভিভাবক হয়ে আকবরকে রাজ্য শাসনে অভিজ্ঞ করে তুলেছিলেন। তাই সম্রাট আকবর তার অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জন করে তার চারপাশে এমন একদল পরামর্শক জড়ো করেছিলেন, যারা ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। এদের বলা হতো নবরত্ন। প্রকৃতপক্ষেই তারা রত্নই ছিলেন। ইতিহাসে তারা স্বীয় প্রতিভা ও দক্ষতা দিয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন প্রশাসনের দক্ষ, কেউ ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, কেউ সংগীতজ্ঞ আবার কেউ ছিলেন সভাকবি ।
নবরত্ন হিসেবে পরিচিত সম্রাট আকবরের সেই ৯ জন পরামর্শক হলেন বীরবল : তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপতি ও কৌতুকবিদ। আবুল ফজল : প্রধান সভাকবি এবং আইন-ই-আকবর ও আকবরনামার রচয়িতা। ফৈজি : প্রখ্যাত কবি ও রাজকুমারদের গৃহশিক্ষক। তানসেন : সুরসম্রাট ও বিশ্ববিখ্যাত সংগীতজ্ঞ । টোডরমল : আকবরের দক্ষ অর্থমন্ত্রী ও রাজস্ব সংস্কারক। রাজা মানসিংহ : মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ফকির আজিম উদ্দিন : ধর্মীয় ও সুফিবিষয়ক উপদেষ্টা। আব্দুর রহিম খান-ই-খালান : সেনাপতি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও হিন্দি দোহার রচয়িতা । মোল্লা দো-পিয়াজা : চতুর ও হাস্যরসাত্মক সভাসদ।
এই উপদেষ্টাদের বা পরামর্শকদের বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায় সম্রাট আকবর একজন মহান শাসক হিসেবে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাধারণত মানব ইতিহাসজুড়ে নিপীড়নমূলক শাসনের কাহিনি বেশি থাকালেও সম্রাট আকবরের মতো এমন অনেক শাসকের নজির ইতিহাসে আছেন, যার দক্ষ ও প্রতিভাবান পরামর্শকদের সহায়তায় মহান শাসক হিসেবে ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছেন। এটি সবাই জানে যে, সম্রাট আকবর নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু তার ছিল তীব্র জ্ঞানপিপাসা। সে কারণেই তিনি তার চারপাশে জড়ো করেছিলেন জ্ঞানীগুণী পরামর্শকরা। তারা তাকে বই পড়ে শোনাতেন এবং তাদের কাছ থেকে তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন। তাই এ ধরনের সুপরামর্শকদের কারণে একদিকে যেমন তিনি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে করতে সক্ষম হয়েছিলেন; তেমনি টানা ৫০ বছর শাসন করেছিলেন নির্বিঘ্নে। আর এ কারণেই ইতিহাসবিদরা তাকে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
সম্রাট আকবরকে নিয়ে এভাবে শুরু করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, একজন শাসকের জন্য পরামর্শকরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানোর জন্য। কারণ একজন শাসক কেমন তা জানা যায়, তার চারপাশের পরামর্শকদের দেখে। এ ব্যাপারে চীনা একটি প্রবাদবাক্য আছে। তাতে বলা হয়েছে, পাখি নিজের পালক দেখে দল বাঁধে আর মানুষ চেনা যায় তার সঙ্গীদের দেখে। তাই চীনের বিখ্যাত দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কনফুসিয়াস বলেছেন, যদি জানতে চাও কোন দেশের শাসনব্যবস্থা কেমন, তবে তার মন্ত্রীদের দিকে তাকাও।
মূলত একজন শাসক ঠিক তেমন লোকদের নিজের পাশে রাখেন, যাদের চিন্তাভাবনা তার নিজের সঙ্গে মেলে। এটাই আমরা সাধারণত চারপাশে দেখে থাকি। কারণ একই বৈশিষ্ট্যের মানুষ সবসময় এক জায়গায় সমবেত হয়। যাকে আমরা বলি সমমনা। যেমন ধরুন কেউ কোনো মজলিশে গেল। সেখানে প্রথম সে তার সমমনা কেউ আছে কি না খুঁজবে। তা না পেলে সে একাই এক জায়গায় বসে পড়বে। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। তাই একজন শাসক যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে তিনি তার চারপাশে এ ধরনের লোকই খুঁজবেন। আর শাসকের জন্য তোষামোদকারীরা সবসময় বিপজ্জনক। তাই যেমন চীনা একজন দার্শনিক বলেছেন, হাজার তোষামোদকারীর হ্যাঁ-বাচক কথার চেয়ে একজন সৎ পরামর্শকের স্পষ্ট ও সত্য কথা অনেক বেশি মূল্যবান।
অন্যদিকে ইতালি ও রেনেসাঁ যুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো মেকিয়াভেলি তার বিখ্যাত প্রিন্স গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একজন শাসকের বুদ্ধিমত্তা অনুমান করার প্রথম পদ্ধতি হলো তার চারপাশে কেমন মানুষ রয়েছে, তা লক্ষ করা।’
এই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যায়, আগেকার দিনে রাজতন্ত্র এবং একালের গণতন্ত্র কিংবা যেকোনো সরকারপদ্ধতিতে একজন শাসক কেমন সেটি বোঝার একমাত্র উপায় হচ্ছে, শাসকের পরামর্শকরা কেমন সেটি দেখে। এছাড়া একজন সৎ ও দক্ষ পরামর্শদাতা শাসকের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। ইতিহাসে এ ধরনের অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অনেক নজির আছে। যেমন : ইসলামের ইতিহাসে সত্যবাদিতা, নির্ভীক মনোভাব, দূরদর্শিতা ও নিঃস্বার্থ উপদেষ্টাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কথায়ই ধরা যাক। তার তার খেলাফত পরিচালনায় প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। উমর (রা.) সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জোরালো মতামত দিতেন, যা খলিফাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করত। আবার একইভাবে হজরত উমর (রা.)-এর মূল পরামর্শক ছিলেন হজরত আলী (রা.)। তিনি আইন ও নীতিগত পরামর্শ দিতেন। জটিল রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক সমস্যায় আলী (রা.)-এর পরামর্শ ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ।
ইসলাম ইতিহাসের ওইসব মহান দৃষ্টান্ত ছাড়াও বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন প্রাচীনকালের আলেকজান্ডারের কথা উল্লেখ করা যায়। তার শিক্ষক ও উপদেষ্টা ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল। রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে অ্যারিস্টটলের শিক্ষাই আলেকজান্ডারকে একজন বিশ্বজয়ী শাসক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অন্যদিকে বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কথা উল্লেখ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চিলের প্রধান সামরিক পরামর্শক ছিলেন অ্যালেন ব্রুক। তিনি চার্চিলের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর সরাসরি বিরোধিতা করতেন। এই নির্ভীক ও যৌক্তিক বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল।
যাই হোক, পরিশেষে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর ঘটনা উল্লেখ করে আমার এই লেখা শেষ করতে চাই। এ ঘটনাটি ‘নাহজুলবালাগা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। এটিও তো অনেকের জানা আছে, হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিয়েছিল। তখন একজন সাহাবি তার কাছে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘হে আমিরুল মোমিনিন! হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)-এর সময় তো শাসনব্যবস্থা শান্ত এবং শৃঙ্খল ছিল; কিন্তু আপনার সময় কেন এতটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে?
জবাবে হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন, তখন আমি ও উসমান এবং অন্যান্য বিজ্ঞ সাহাবা ছিলাম তাদের পরামর্শক আর এখন তোমরা হচ্ছো আমার পরামর্শক। তিনি এ কথা বলে মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন, ভালো শাসন শুধু শাসকদের ওপর নির্ভর করে না; তার চারপাশের মানুষ এবং প্রজাকুল কেমন তার ওপরও নির্ভর করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


