আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হলো আস্থা, বিশ্বাস, নিয়মশৃঙ্খলা এবং সময়ানুবর্তিতা। বিশ্বায়নের এ যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তের ব্যবসায়ী অন্য প্রান্তের সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, এই লেনদেনের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব, আইনি কাঠামোর পার্থক্য এবং পারস্পরিক অপরিচয়ের কারণে কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যায়। এই ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছে। সেই কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো লেটার অব ক্রেডিট, যাকে সংক্ষেপে এলসি বলা হয়।
মূলত এলসি এমন একটি ব্যাংকিং প্রতিশ্রুতি, যার মাধ্যমে আমদানিকারকের ব্যাংক রপ্তানিকারকের ব্যাংককে এই নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে পণ্য সরবরাহ করা হলে নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ ব্যাংক এখানে একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে। এর ফলে রপ্তানিকারক নিশ্চিন্তে পণ্য পাঠাতে পারেন এবং আমদানিকারকও নিশ্চিত থাকেন যে, পণ্য সরবরাহের যথাযথ প্রমাণ ছাড়া অর্থ পরিশোধ করা হবে না। কালের বিবর্তনে এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে গতিশীল ও নিরাপদ করেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার প্রাণ হলো ব্যাংকের প্রতিশ্রুতি ও পেশাদারত্ব। যখন কোনো ব্যাংক একটি এলসি খোলে, তখন তা কার্যত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি আনুষ্ঠানিক ও বলিষ্ঠ অঙ্গীকার হিসেবে গণ্য করা হয়। রপ্তানিকারক সেই অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন এবং সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে এলসির শর্ত পূরণ হওয়ার পরও যদি ব্যাংক যথাসময়ে রপ্তানিকারকের পাওনা পরিশোধে অযথা বিলম্ব করে, তাহলে তা কেবল একটি আর্থিক লেনদেনের সমস্যা নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত আস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলে এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে যে, কিছু ব্যাংক সুইফটের (SWIFT) মাধ্যমে এলসি বিলের Acceptance দিয়ে Maturity date ঘোষণা করার পরও তা পরিশোধে অযথা দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করছে।
অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায়, পণ্য যথাযথভাবে জাহাজীকরণ হয়েছে, জাহাজ এলসিতে উল্লিখিত বন্দরে পৌঁছে গেছে, শিপিং এজেন্ট ও জাহাজের ক্যাপ্টেন স্বাক্ষরিত বিল অব লেডিংও (Bill of Lading) ইস্যু করা হয়েছে, কাস্টমস কমিশনারের কাছে ব্যাংক No Objection Certificate (NOC) পাঠিয়ে কাস্টমস ফরমালিটিজ মেইনটেইন করে পণ্য আমদানিকারকের অনুকূলে খালাস করতে চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত নিয়মকানুন মেনে কাস্টমস কমিশনার পণ্য খালাসের অনুমতি প্রদান করে এবং আমদানিকারক এলসিতে বর্ণিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী Good Condition-এ পণ্য গ্রহণ করার পর ব্যাংক সুইফট মেসেজের মাধ্যমে বিলের Acceptance ও Maturity date ঘোষণা করেছে। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয়, কিছু কিছু ব্যাংক এরপরও বিভিন্ন অজুহাতে রপ্তানিকারকের পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করে তা বিলম্বিত করছে।
কখনো তারল্যসংকট, কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, আবার কখনো অপ্রয়োজনীয় নথিপত্রের অজুহাতে বিল নিষ্পত্তি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। অনেক সময় বিদেশি ব্যাংক বা রপ্তানিকারককে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং শৃঙ্খলা এবং পেশাদারিত্বের পরিপন্থী। এসব আচরণে বিরক্ত হয়ে অনেক সময় নেগোশিয়েটিং ব্যাংক ফাইল ক্লোজ করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে এলসি লেনদেন পরিচালিত হয় International Chamber of Commerce কর্তৃক প্রণীত ‘Uniform Customs and Practice for Documentary Credits (UCP 600)’-এর অধীনে। এই নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলো উপস্থাপিত নথিপত্র যাচাই করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পেমেন্ট করা, অথবা যথাযথ কারণ দেখিয়ে বিলম্বের কথা জানানো।
এই নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ব্যাংক মূলত নথিপত্র নিয়ে কাজ করে, পণ্য নিয়ে নয়। অর্থাৎ নথিপত্র যদি এলসি শর্ত অনুযায়ী সঠিক থাকে, তাহলে ব্যাংকের দায়িত্ব দ্রুত অর্থ পরিশোধ করা। কিন্তু বাস্তবে যদি বিল গ্রহণ করার পরও ব্যাংক অযথা সময়ক্ষেপণ করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এলসি পেমেন্টে গড়িমসির ফলে বাংলাদেশের সেসব ব্যাংক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থার সংকটে নিপতিত হয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি কোনো দেশের কোনো ব্যাংক বা কিছু ব্যাংক বিভিন্ন অযৌক্তিক অজুহাত দেখিয়ে পেমেন্ট বিলম্ব করে, তাহলে বিদেশি সরবরাহকারী ও তাদের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সেই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি সন্দেহ তৈরি হয় এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়।
এই আস্থাহীনতার কারণে ভবিষ্যতে বিদেশি সরবরাহকারীরা সেই ব্যাংকের এলসি গ্রহণে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা অতিরিক্ত নিশ্চয়তা দাবি করতে পারেন, যেমন কনফার্মড এলসি। এতে লেনদেনের খরচ বেড়ে যায় এবং ব্যবসা পরিচালনা করা আরো জটিল হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক দেশের ব্যাংক অন্য দেশের ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা করে। কিন্তু যদি কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে পেমেন্ট বিলম্ব বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিদেশি করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকগুলো সেই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত বা বন্ধ করে দিতে পারে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করা আরো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় বিদেশি ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত গ্যারান্টি বা নিরাপত্তা ছাড়া লেনদেন করতে চায় না। এতে দেশের ব্যবসায়ীরা বাড়তি ঝামেলা ও খরচের সম্মুখীন হন।
এলসি পেমেন্টে বিলম্বের প্রভাব শুধু বিদেশি রপ্তানিকারকদের ওপরই পড়ে না; এর প্রভাব পড়ে দেশের আমদানিকারকদের ওপরও। বিদেশি সরবরাহকারীরা ঝুঁকি এড়াতে তখন অগ্রিম অর্থ দাবি করতে পারেন, অথবা পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারেন। এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
যখন আমদানি ব্যয় বাড়ে, তখন তার প্রভাব দেশের বাজারে পণ্যের দামের ওপর পড়ে। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল কিংবা প্রযুক্তি সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়ে।
বাংলাদেশ একটি বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির দেশ। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প, যার কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। একই সঙ্গে জ্বালানি, খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং প্রযুক্তি সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রেও এলসি লেনদেনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তবতায় যদি এলসি পেমেন্টে অনিয়ম বা বিলম্ব ঘটে, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিদেশি সরবরাহকারীরা তখন বাংলাদেশের বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এলসি লেনদেনের ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
যদি কোনো ব্যাংক বিল গ্রহণের পরও অযথা পেমেন্ট বিলম্ব করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নীতিমালা সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও জোর দিতে হবে।
শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি যথেষ্ট নয়, ব্যাংকগুলোকেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে হবে। এলসি ব্যবস্থাপনা, নথি যাচাই, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং তারল্য পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব ও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এলসি প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। আধুনিক ডিজিটাল ট্রেড ফাইন্যান্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলে নথি যাচাই ও পেমেন্ট প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। একটি ব্যাংকের সুনাম তৈরি হতে অনেক বছর সময় লাগে, কিন্তু কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্তের ফলে সেই সুনাম মুহূর্তেই ভয়াবহভাবে ক্ষুণ্ণ হয়ে যেতে পারে।
তাই ব্যাংকগুলোর উচিত এলসি পেমেন্টে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও সতর্কতা অবলম্বন করা। সময়মতো পেমেন্ট নিশ্চিত করা শুধু একটি ব্যাংকিং দায়িত্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের সম্মান রক্ষারও বিষয়।
এ কথা না বললেই নয় যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকের ভূমিকা কেবল একটি আর্থিক মধ্যস্থতাকারীর নয়; বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের। সেই বিশ্বাস বজায় রাখতে হলে প্রতিটি এলসি লেনদেনে সময়মতো এবং নিয়ম অনুযায়ী পেমেন্ট নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এলসি পেমেন্টে অযথা গড়িমসি বন্ধ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ব্যাংক খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিদেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। তাই শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড মেনে চলার বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা ক্রমেই অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ব, যা আমাদের জন্য হবে খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক।
লেখক : ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইরান যুদ্ধের এক মাস, কোথায় কতজন নিহত