আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইনসাফের দাবিতে অর্থনীতির ইনকিলাব

মুহম্মদ গোলাম রাব্বি

ইনসাফের দাবিতে অর্থনীতির ইনকিলাব

অর্থনীতি শুধু সংখ্যা আর পরিসংখ্যান নয়। এর মূলে রয়েছে মানুষ, তার স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা। যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তখন অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস শুধু নীতিগত প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং এটি হয়ে ওঠে নৈতিক অপরিহার্যতা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত দেড় দশকে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর বৈষম্যের আখ্যান। জিনি সহগের ক্রমবর্ধমান মান, শীর্ষ দশমিকের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ক্রমাগত হ্রাস— এসব সূচক বলে দেয় যে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল কার জন্য কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। যেখানে একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে আকাশচুম্বী হারে, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির গতি থেমে আছে। ব্যাংক খাতের লুটপাট, ঋণখেলাপির সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট করপোরেট দুর্বৃত্তায়ন একটি বিকৃত অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে। এখানে প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হয় যোগ্যতায় নয়, সম্পর্কে।

বাজার অর্থনীতির নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক ধরনের ক্রোনি ক্যাপিটালিজম। যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুবিধা বিতরণ হয় নৈকট্য এবং আনুগত্যের ভিত্তিতে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার পরও যখন কারো বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন সৎ উদ্যোক্তারা হতাশ হন এবং অর্থনীতিতে নৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়।

ইনসাফের দাবিতে অর্থনৈতিক ইনকিলাব মানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি দাবি করে অর্থনৈতিক গভর্ন্যান্সের আমূল সংস্কার। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। ব্যাংক ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পুনঃতফসিলের নামে দুর্নীতির অবসান প্রয়োজন। সুইস ব্যাংকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং সম্পদের অবৈধ উৎস খতিয়ে দেখার জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন জরুরি।

প্রগতিশীল করব্যবস্থার প্রবর্তন আরেকটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। যেখানে আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে ন্যায্য কর আরোপিত হবে। সম্পদ কর প্রবর্তন, ভ্যাটব্যবস্থায় সংস্কার এবং কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপÑএসব উদ্যোগ রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং পুনর্বণ্টনমূলক নীতি বাস্তবায়নে সক্ষম করবে।

বর্তমানে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম, যা প্রমাণ করে যে সম্পদশালীরা তাদের প্রাপ্য অবদান রাখছেন না। একটি ন্যায্য করব্যবস্থা ছাড়া কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা অসম্ভব। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ ছাড়া ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি কল্পনাই করা যায় না। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আওতা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

এসএমই ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে হবে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। বড় করপোরেট গোষ্ঠীর একচেটিয়া ভাঙতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আয়ের বণ্টন হবে বিকেন্দ্রীভূত। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার ওপর। যখন বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে অর্থ থাকে, তখনই অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি হয়, বাজার সম্প্রসারিত হয় এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়।

অর্থনৈতিক ইনকিলাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের দিকে ঝুঁকে পড়া। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবুজ অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, কৃষিতে আধুনিক কিন্তু টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শহরায়ণ পরিকল্পনায় পরিবেশগত সচেতনতা এসব হবে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির ভিত্তি।

জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যারা পরিবেশদূষণে সবচেয়ে কম ভূমিকা রাখে, তারাই এর সবচেয়ে বড় শিকার। উপকূলীয় এলাকার জনগণ, কৃষক সমাজ এরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতিতে সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা যেন শুধু শহুরে উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং গ্রামীণ এলাকা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও যেন এর সুফল পায়, সেজন্য ব্যাপক অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রয়োজন।

কিন্তু এসব সংস্কার বাস্তবায়নের পথ মসৃণ নয়। অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের যেকোনো প্রচেষ্টাই মুখোমুখি হয় শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধের। যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী তারা যেকোনো পরিবর্তনকে হুমকি হিসেবে দেখবে। এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসমর্থন। গণআন্দোলনের শক্তিই পারে এই রূপান্তর সম্ভব করতে। ইনসাফের দাবি যখন রাজপথ থেকে উঠে আসে, তখন তা শুধু আবেগ নয়, হয়ে ওঠে পরিবর্তনের অপ্রতিরোধ্য শক্তি। কিন্তু এই আন্দোলনকে হতে হবে সুচিন্তিত, সুসংগঠিত এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। শুধু ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থার রূপান্তর চাই-এই বোধ থেকেই জন্ম নিতে হবে টেকসই আন্দোলনের।

ইনসাফের দাবিতে অর্থনৈতিক ইনকিলাব আসলে দাবি করে নতুন এক সামাজিক চুক্তির। যেখানে রাষ্ট্র, বাজার এবং সমাজের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারিত হবে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে। এটি স্বীকার করে যে অর্থনৈতিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার আরো গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। উন্নয়ন চাই, কিন্তু তা হতে হবে টেকসই। সম্পদ সৃষ্টি হোক, কিন্তু তার বণ্টন হতে হবে ন্যায্য। এই নীতিগুলোর ভিত্তিতে যদি আমরা অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করতে পারি, তবেই সম্ভব হবে প্রকৃত অর্থে ইনসাফভিত্তিক সমাজ নির্মাণ। বাংলাদেশও এই ঐতিহাসিক সুযোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন