আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শিক্ষা বোর্ড ও বছরভেদে পরীক্ষার ফলে তারতম্য কতটা যৌক্তিক

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক

শিক্ষা বোর্ড ও বছরভেদে পরীক্ষার ফলে তারতম্য কতটা যৌক্তিক
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন খালেদা জিয়ার সরকারে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। মূলত, তার উদ্যোগেই পাবলিক পরীক্ষাগুলো থেকে নকলের অভিশাপ একসময় দূর হয়েছিল। পরে স্বৈরাচারী সরকার হীন রাজনৈতিক স্বার্থে গৃহীত বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষত নিরসনের চেষ্টা শুরু হয়। আমাদের পরীক্ষার হলগুলো নকলের অভিশাপ থেকে আবার মুক্ত হয়। পরীক্ষার ফলে সঠিকভাবে মেধা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

আশার কথা, এবার সরকার পাবলিক পরীক্ষাগুলো আরো সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরীক্ষা পরিচালনায় যথাযথ মান ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এ ধরনের পরিবর্তনগুলো বাস্তব পরিস্থিতি আমলে না নিয়ে হঠাৎ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে কোনো কোনো পরীক্ষার্থীর প্রতি অন্যায় করা হয়। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসির গ্রেড বিবেচনা করা হয়। চাকরির ক্ষেত্রেও এই দুটি পরীক্ষার গ্রেড গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কাজেই পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করলেই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয় না। সারা দেশে ১১টি শিক্ষা বোর্ড আছে। প্রশ্নপত্রের মান ও খাতা দেখায় অনুসৃত নীতির ভিন্নতার কারণে এই শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে ব্যাপক তারতম্য যাতে না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।

বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশের ১১টি বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের গড় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড বাদে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে ভালো করেছিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ড আর সবচেয়ে খারাপ করেছিল কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ আর মাদরাসা বোর্ডে ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।

এই ফল বিশ্লেষণে বেশ স্পষ্টভাবে দেখা যায়, অঞ্চলভেদে ফলাফলে বেশ তারতম্য হয়েছে। এই তারতম্য প্রতিবছরই হয়ে থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন, তাদের উচিত এর কারণগুলো বের করে আনার চেষ্টা করা। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জনগোষ্ঠী সারা দেশে প্রায় একই ধরনের। আমাদের সংস্কৃতি এক, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এক, সিলেবাস এক, পাঠ্যপুস্তক এক, খাতা দেখার পদ্ধতি এক। তবে ফলাফলে এত তারতম্য কেন? ঢাকা বোর্ডের পাসের হার কুমিল্লা বোর্ডের পাসের হারের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি হওয়ার যুক্তি কী? ঢাকা বোর্ডের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কি তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়? কুমিল্লা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা কি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার? অভিযোগ আছে, কুমিল্লা ও যশোর বোর্ডের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়। এটি তো কোনো কোনো এলাকার পরীক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের বড় অবিচার।

কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা পদ্ধতি ভিন্ন, তাই তাদের ফল অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের ফলের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ পাসের হার হওয়ার ব্যাপারটির ব্যাখ্যা কী? একই অঞ্চলের একজন মাদরাসার পরীক্ষার্থী কি একজন স্কুল-কলেজের পরীক্ষার্থীর থেকে বেশি সুযোগ পাচ্ছে? নাকি মাদরাসায় পড়াশোনার পরিবেশ স্কুল-কলেজের পরিবেশের চেয়ে উন্নততর? ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডের পাসের হার মাদরাসা বোর্ডের পাসের হারের চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ কম। এই ব্যবধানটি বিশাল, কোনোভাবেই হেলা করার মতো নয়। কাছাকাছি সিলেবাস অনুসরণ করা সত্ত্বেও কলেজের পরীক্ষার্থীদের তুলনামূলক খারাপ ফল করার কারণ কী?

অন্যদিকে যদি বছরভেদে পাসের হারে ব্যাপক হেরফের হয়, তবে নিঃসন্দেহে কোনো কোনো ব্যাচের পরীক্ষার্থীরা অন্য ব্যাচের সমান মেধার পরীক্ষার্থীদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। একই দেশে মেধার মূল্যায়নে এ ধরনের বৈষম্য মোটেও কাম্য নয়। ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় ৪১ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় বিপুল পরিমাণে কমেছে। এই যে এক বছরেই এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী পাস করতে পারল না বা ফল তুলনামূলক খারাপ করল, এতে তাদের কর্মজীবনের পথটাই অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হলো। রাষ্ট্রকে তো এদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

কর্তৃপক্ষ গত বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশে শিখন প্রক্রিয়ার ঘাটতি হিসেবে। তাদের মতে, বিগত বছরগুলোয় প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর পুঞ্জীভূত হয়ে আজকের এই বিপর্যয়কর অবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাইনি। ফল ভালো দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রটি আড়াল করেছি। কর্তাব্যক্তিদের ভাষ্যে মনে হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশ করে দিতে পেরেই তারা খুশি। ক্ষত সারানোর লক্ষণ নেই। নতুন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সুচিন্তিত পদক্ষেপ আশা করি। পরীক্ষা পরিচালনা পদ্ধতির কড়াকড়ির কারণে কোনো বিশেষ ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের প্রতি যাতে অবিচার করা না হয়, সে দিকটিও মাথায় রাখা উচিত।

ইংরেজি মাধ্যমের পরীক্ষা পদ্ধতির গ্রেডিং সিস্টেম অনুসরণ করে প্রচলিত জিপিএ পদ্ধতিতেই এ সমস্যা দূর করা সম্ভব। বর্তমানে লেটার গ্রেডের বাউন্ডারি নির্দিষ্ট করা আছে। এটি নির্দিষ্ট না রেখে প্রশ্নের মান অনুসারে একটু সমন্বয় করতে হবে। বিভিন্ন বছরের এবং বিভিন্ন বোর্ডের ফলের ডিস্ট্রিবিউশনের ধরন কাছাকাছি করার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু। অর্থাৎ পাসের হার, জিপিএ ৫-এর হার, ফেলের হারের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিয়ে আসা প্রয়োজন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তত্ত্বাবধানে শিক্ষকদের একটি বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরপরই প্রতিবছর প্রতিটি বোর্ডের প্রতিটি প্রশ্নের জন্য গ্রেড বাউন্ডারি নির্ধারণ করতে পারেন। যেমন : ধরুন এ+ পাওয়ার জন্য সাধারণত ৮০ শতাংশ নম্বর পাওয়া প্রয়োজন। কোনো বছর কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন বেশি কঠিন হয়ে গেলে, এ+ পাওয়ার জন্য নম্বর একটু কমিয়ে আনা উচিত, যাতে এ+ প্রাপ্ত পরীক্ষার্থীর শতকরা হার কাছাকাছি থাকে। ফেলের হারও গ্রেড বাউন্ডারি সমন্বয় করে যৌক্তিক মাত্রায় সীমিত রাখতে হবে। গ্রেডশিটে মূল প্রাপ্ত নম্বর এবং সমন্বয়কৃত লেটার গ্রেড দুটিই লিপিবদ্ধ থাকবে। লেটার গ্রেডিং পদ্ধতির উদ্দেশ্যই ফলের গুণগত মান সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা। যদি ফল সমন্বয়ের ব্যবস্থা না থাকে, তবে লেটার গ্রেড পদ্ধতি রেখে লাভ কী? আগের নিয়মে প্রাপ্ত নম্বর সরাসরি ঘোষণা করে দিলেই হয়।

গত বছর যেই মানের একজন ছাত্র জিপিএ ৫ পেল, পরীক্ষা ও খাতা দেখায় কড়াকড়ির কারণে এ বছর সেই মানের একজন ছাত্র যদি জিপিএ ৫ না পায়, তবে নিঃসন্দেহে এবারের পরীক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হবে। একই কথা ভিন্ন ভিন্ন বোর্ডের পাসের হারে বৈষম্যের বেলায়ও প্রযোজ্য। এই বৈষম্যটি এমন, যার রেশ সে বাকি জীবনে কাটিয়ে উঠতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, চাকরি, পদোন্নতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের এই বঞ্চনা বয়ে বেড়াতে হবে। কাজেই পাবলিক পরীক্ষার ফল শুধু খাতা দেখে প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে বিশ্লেষণ করে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। পরীক্ষা পরিচালনা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও খাতার মূল্যায়নে বোর্ড এবং বছরভেদে বৈষম্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এই ফল দিয়ে মেধার মান বিচারে বিভিন্ন বোর্ড ও বিভিন্ন বছরের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে যৌক্তিক তুলনার সুযোগ আছে কি নাÑতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন