রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

বিএনপি কি অতীত থেকে শিক্ষা নেবে

বিএনপি কি অতীত থেকে শিক্ষা নেবে

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদটি আনুষ্ঠানিক। কিন্তু আনুষ্ঠানিক এই পদটিই অতীতে বারবার বাংলাদেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং দেশের ভবিষ্যতের প্রধান নির্ণায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেই ভূমিকা কখনো ছিল ধ্বংসাত্মক, কখনোবা ত্রাণকর্তার। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট ও অচলাবস্থায় ক্ষমতালোভী ষড়যন্ত্রকারীরা রাষ্ট্রপতিকে জিম্মি করে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘোর অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেছে। আবার কখনো কখনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে বঙ্গভবন হয়ে উঠেছে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল।

রাষ্ট্রপতি পদাধিকারবলে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বাস্তবে তার এই পদের ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু তীব্র রাজনৈতিক অনৈক্য, হানাহানি ও গভীর জাতীয় সংকটের সময় সশস্ত্র বাহিনী যদি তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করে এবং তিনি যদি মেরুদণ্ডসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা ও সাহসী কোনো ব্যক্তিত্ব না হন, তাহলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটার আশঙ্কা থাকে, যা অতীতে বারবার ঘটেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কারণে ওই সময় আলংকারিক এই পদটি হয়ে ওঠে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে অতিশয় ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে দুবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে। একবার রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসী পদক্ষেপের কারণে তা ব্যর্থ করা হয়েছে, কিন্তু আরেকবার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন। যদিও এটা তিনি করেন প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিতে, কিন্তু জাতীয় সংকটময় মুহূর্তে সংবিধান, আইন, নিয়ম—সবই অর্থহীন হয়ে যায়। সে কারণে এই পদে উপযুক্ত ব্যক্তিকে যদি নিয়োগ দেওয়া না হয়, তাহলে তার পক্ষে বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনৈতিক ও জাতীয় সংকটের সময় দেশকে ষড়যন্ত্রকারীদের কবল থেকে রক্ষা করা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। যেমনটা পারেননি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।

অতীতে বিএনপি সরকারের মোটাদাগে যে কয়টি ভুলের কারণে বাংলাদেশে মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে দুই বছরের জন্য পরোক্ষ সামরিক শাসন এবং পরবর্তী সময়ে দেড় যুগের জন্য হাসিনার নেতৃত্বে মাফিয়া শাসনব্যবস্থা ও ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম দুটি হলো মইন ইউ আহমেদকে সেনাপ্রধান ও ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ। মেরুদণ্ডহীন অযোগ্য লোকের কাছ থেকে হয়তো চূড়ান্ত আনুগত্য পাওয়া যায়, কিন্তু সংকটকালে এ ধরনের ব্যক্তি না নিজেকে রক্ষা করতে পারে, আর না দলের ও দেশের কোনো কাজে আসে। সর্বোপরি ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয় দেশ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তার উৎকৃষ্ট এক নজির।

১৯৯৬ সালের মে মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নাসিম বিদ্রোহ করেন। আবদুর রহমান বিশ্বাস তখন রাষ্ট্রপতি। তিনি দুজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাপ্রধান নাসিম রাষ্ট্রপতির সে আদেশ অমান্য করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সেনাপ্রধানের এ আচরণকে সরাসরি বিদ্রোহ, চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং শৃঙ্খলাবহির্ভূত হিসেবে আখ্যায়িত করে নাসিমকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু সেনাপ্রধান এ বরখাস্ত আদেশও অমান্য করে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন এবং ঢাকা অভিমুখে সেনা মার্চ করার নির্দেশ দেন। তবে এর বিরুদ্ধে তখন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস যে সাহসী ও দৃঢ়চেতা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সেদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নাসিমের অভ্যুত্থান প্রতিহত করার আহ্বান জানান অন্যান্য সেনাকর্তাকে এবং তারা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। ফলে সেদিন বাংলাদেশ রক্ষা পেয়েছিল রক্তারক্তি ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে।

জেনারেল নাসিমকে বিএনপি সরকার ১৯৯৪ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় গ্রহণ করে। সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন দেশে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন বিএনপির রেখে যাওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম অভ্যুত্থান চেষ্টা করেন।

অন্যদিকে বিএনপি ২০০৫ সালে বেশ কয়েকজন সিনিয়র সেনাকর্তাকে বঞ্চিত করে মইন ইউ আহমেদকে সেনাপ্রধান করে। কিন্তু সেনাপ্রধান মইন পরবর্তী সময়ে কেবল বিএনপির জন্য নয়, বরং গোটা দেশের জন্য দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিএনপি সরকারের সেই ভুল সিদ্ধান্তের চরম মূল্য কেবল দল হিসেবে বিএনপি দেয়নি, বরং দেশকেও দিতে হয়েছে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করে। এর ফলে ২০০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতা ছাড়ে, তখন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার কথা ছিল কেএম হাসানের। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে কেএম হাসান বিএনপির লোক এবং তাকে প্রধান উপদেষ্টা করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মানতে অস্বীকার করে। তিনি যাতে প্রধান উপদেষ্টা হতে না পারেন, সেজন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীসহ সারা দেশে সমাবেশের ডাক দেয়। শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে সমাবেশে আসার নির্দেশ দেন। ২৮ অক্টোবরই ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন এবং তারা ওই দিন ক্ষমতা ছাড়ে। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র বিভিন্ন বামপন্থি দলের নেতাকর্মীরা ওই দিন সকাল থেকে ঢাকার পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকায় লগি-বৈঠা নিয়ে যুদ্ধংদেহী অবস্থান নেয়। বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট এলাকায় সমাবেশ ডেকেছিল জামায়াত। আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে সেদিন এবং পরের কয়েক দিনে অনেক মানুষ নিহত হন। তাদের অধিকাংশ ছিল জামায়াত-শিবিরের। ২৮ অক্টোবর পল্টনে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি সন্ত্রাসীরা মুজাহিদুল ইসলাম নামে এক শিবিরকর্মীকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর পৈশাচিক নৃত্য করেছিল। সে ঘটনার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। ঢাকাসহ দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের এই ত্রাসের কারণে ওই দিন সন্ধ্যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান বিচারপতি কেএম হাসান। এরপর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার অধীনে নির্বাচন বর্জনের জন্য আওয়ামী লীগ তখন লাগাতার হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয় এবং দেশব্যাপী নজিরবিহীন নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বিএনপি নিয়োগকৃত সেনাপ্রধান জেনারেল মইন তার অধীনদের নিয়ে বঙ্গভবনে গিয়ে ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে ও দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করেন। এর মাধ্যমে দেশে ঘটে যায় সেনা অভ্যুত্থান। এরপর ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। ফখরুদ্দীনকে সামনে রেখে দুই বছরের জন্য দেশ পরিচালনা করেন জেনারেল মইন। এ সময় তিনি ও তার দোসররা ভারতের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ২০০৮ সালে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার ব্যবস্থা করেন। বিনিময়ে দুই বছরের অবৈধ শাসন, ষড়যন্ত্র ও সীমাহীন অপকর্মের জন্য নিজের সেফ এক্সিটের পথ নিশ্চিত করেন জেনারেল মইন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে সেফ এক্সিটের জন্য ভারতের কাছে তার আত্মসমর্পণের বিষয়ে উল্লেখ আছে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর লেখা ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস’ নামক বইতে। এরপর জেনারেল মইন সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সেনা গণহত্যার ঘটনা ঘটানো হয়। এরপর দীর্ঘ দেড় যুগ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাফিয়া শাসনব্যবস্থা, ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য। রচিত হয় আয়নাঘর, গুম, খুন, হত্যা, গণহত্যাসহ বিরোধীদের দমন-পীড়নের এক লোমহর্ষক দীর্ঘ কালো অধ্যায়।

এটা বিএনপির দুর্ভাগ্য, সেনাপ্রধানসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপি অতীতে প্রতিবারই ক্ষমতায় থাকতে যাদের নিয়োগ দিয়েছিল, তারা প্রায় সবাই পরবর্তী সময়ে বিএনপির দুর্দিনে বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদে কম যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের নিয়োগ দেওয়ার পেছনে মূল চিন্তা কাজ করে শতভাগ আনুগত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বিপদের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এসব অনুপযুক্ত লোকজন যে কোনো কাজে আসে না, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন তার প্রমাণ। অন্যদিকে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ধূর্ত সুযোগসন্ধানীরা পিঠে ছুরি বসাতেও যে দ্বিধা করে না—জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ আরো অনেকে তার নজির হয়ে আছেন।

অনেকেরই বিশ্বাস, সেদিন যদি বঙ্গভবনে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিনের পরিবর্তে আবদুর রহমান বিশ্বাসের মতো একজন মেরুদণ্ডসম্পন্ন, সাহসী ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্রপতি থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশের পরবর্তী ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।

বাংলাদেশের মতো দেশে রাষ্ট্রপতি পদটি আনুষ্ঠানিক হলেও এটি যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ, তা অতীতের বিভিন্ন ঘটনায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতা ঘিরে অতীতে যে নৈরাজ্য, হানাহানি, রক্তারক্তি এবং সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে, ভবিষ্যতে যে তা আর কখনো ঘটবে না, তা উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী রাজনীতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা সবসময় এখানে অশান্ত পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করে যাবে। তাই সার্বিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনা এবং তার পরবর্তী সময়ে দল ও দেশের করুণ পরিণতির কথা মাথায় না রাখে, তাহলে তা দল হিসেবে বিএনপি ও দেশের জন্য আবারও এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ও অধ্যায়ের কারণ হতে পারে ।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন