রাত সাড়ে ৯টা কী ১০টা হবে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের মেইন গেটে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। পেছন থেকে কেউ একজন আলতো করে পিঠে হাত দিলেন। পেছন ফিরে দেখি স্কুলজীবনের বন্ধু। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেন্দ্রীয় একটি পদেও আছেন। উশকোখুশকো আর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে হতবাকই হলাম। দেড় বছর আগেও যার শানশওকতপূর্ণ চলাফেরা চোখে পড়ত, আজ তা নেই।
কেমন আছো? প্রশ্নটি শুনেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বন্ধুটি জানাল, আছি দৌড়ের ওপরে। আজ এ বাসায় তো কাল আরেকজনের বাসায়। দলের নাম ভাঙিয়ে যারা অপরাধ করেছে, মানুষ হত্যা ও ব্যাংক লুট করেছে, তারা তো নিরাপদে বিদেশে বসে আরামসে দিন কাটাচ্ছে। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠে ক্ষোভ ও বিষোদ্গারও উগড়ে উঠল। বললেন, নেতানেত্রীরা বিদেশ থেকে আমাদের আন্দোলনে নামার হুকুম দিয়ে মূলত আরো বিপদ বাড়াচ্ছে। দেশে থাকা নেতাকর্মীদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তাদের কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। বন্ধুটি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার প্রসঙ্গও তুলে ধরলেন।
ভারতে হাসিনার বনবাস
‘বনবাস’ শব্দটি আবার আলোচনায় এনেছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ এ আরাফাতের ফাঁস করা একটি অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা দেশে দৌড়ের ওপর থাকা নেতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি তোমাদের ছেড়ে ভারতে আসতে চাইনি। আমি তো মনে করেছিলাম, আমাকে গোপালগঞ্জে নেওয়া হচ্ছে। বিমান থেকে নেমে দেখি আমি ভারতে। আমি তোমাদের ছেড়ে এখানে বনবাসে আছি। যদিও তারা আমাকে আদরযত্ন করছে।’ ভারতে হাসিনার এ বনবাস নিয়েও কথা বললেন আমার নিষিদ্ধঘোষিত যুবলীগের ওই নেতা। তার ভাষায়Ñএটি হচ্ছে নেতাকর্মীদের প্রতি নেত্রীর (শেখ হাসিনা) এক ধরনের সহানুভূতি প্রকাশের কৌশল। তিনি আমাদের বোঝাতে চাইছেন, আমাদের ছাড়া তার জীবনটি বন-জঙ্গলে বসবাসের মতোই। অথচ নিজে পালানোর আগে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা তার ৬৫ থেকে ৭০ জন নিকটাত্মীয়সহ পরিবারের সবাইকে নিরাপদে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নেত্রী পালানোর দুদিন আগে ঢাকার মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস সাধারণ যাত্রীবেশে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হতে গেলে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের এক কর্মকর্তা আটকে দেন। তাপস তাৎক্ষণিক ফোন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। হাসিনা-তাপসের এ-সংক্রান্ত কথোপকথনের একটি অডিও কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যেখানে তাপস ভয়ার্ত কণ্ঠে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা যায়, ‘হাসু বু। আমি একটু সিঙ্গাপুর যেতে এয়ারপোর্টে এসেছি। একজন সাব-ইন্সপেক্টর আমাকে যেতে দিচ্ছেন না। তুমি একটু বলে দাও। আমি তোমাকে ফোনটি তার কাছে দিচ্ছি।’ তাপসের এ কথা শুনে অপরপ্রান্ত থেকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি (প্রধানমন্ত্রী) একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে কীভাবে বলি? বলো? তুমি অপেক্ষা করো। আমি অফিসারদের বলছি।’
‘বনবাস’ শব্দটি এবার হঠাৎ করে আলোচনায় আসেনি। দুনিয়া কাঁপানো জেন-জিদের গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাড়ে ১৫ বছরের চরম পর্যায়ের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতন হয়। ওই দিনিই তিনি পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ওই সময়েও ‘বনবাস’ শব্দটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই সময় ‘কমলার বনবাস’ হিসেবেই শেখ হাসিনার পলায়ন ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
নব্বইয়ের দশকের ‘কমলার বনবাস’ সিনেমাটির কথা নিশ্চয় দর্শকদের মনে থাকার কথা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিনেমা হলগুলোয় এটি মুক্তি পাওয়ার পর ব্যাপক সাড়া ফেলে ও দর্শকপ্রিয়তা পায়। হলগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় ছিল। এক কথায় যাকে বলা হয় ‘হাউসফুল’ অবস্থা।
দুনিয়ায় এত দেশ থাকতে শেখ হাসিনা আশ্রয়ের জন্য ভারতকে পছন্দের শীর্ষে রাখলেন তার অবশ্য কারণও আছে। তিনি ভারতের আশীর্বাদ ও পূর্ণ সহযোগিতা নিয়ে সাড়ে ১৫ বছর কোনো ভোট ছাড়াই বাংলাদেশের ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। ওই সময় তিনি ভারতের সব আবদারই পূরণ করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দম্ভের সঙ্গে বলেন, ‘আমি ভারতকে যা দিয়েছি। তারা সেটা আজীবন মনে রাখবে।’
অনুসন্ধান বলছে, সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে অন্তত ২০টি চুক্তি ও ৬৬টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দাবি, এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশতেই উপেক্ষিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থ। বিনা মাশুলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট দেওয়া হয়। আদানি চুক্তির মতো আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভারতের ইচ্ছাপূরণই হয়ে ওঠে শেখ হাসিনার একমাত্র দায়িত্ব।
লেন্দুপ দর্জি ও শেখ হাসিনার অভিন্ন উপাখ্যান
রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও লেন্দুপ দর্জি এক হরিহর আত্মা। মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের দুজনের একজনকে নারী, আরেকজনকে পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাদের মধ্যে কখনো দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা বৈঠক হয়েছে কি নাÑএমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দুজনের ভূমিকা ও আচরণের মধ্যে চরিত্রগত মিল খুঁজে পেয়েছেন দুনিয়ার খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অনেকেই। সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে লেন্দুপ দর্জির সঙ্গে তুলনা করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়াও।
ইতিহাস বলছে, আলোচিত চরিত্র লেন্দুপ দর্জি বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। ভারতীয় আধিপত্যবাদের সেবাদাস। তার দেশ সিকিম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল। এ দেশটিকে তিনি ভারতের হাতে তুলে দেন। সিকিমের ভূকৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যের উত্তরে চীন, পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে ভূটান ও দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং।
ভারত সিকিমকে নিজেদের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে রাজ্যের মর্যাদা দেয়। আর লেন্দুপ দর্জি হন এ রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। ২০০২ সালে ভূষিত হন ভারতের ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে। বেঁচে ছিলেন ১০২ বছর। দীর্ঘদিন লিভারের জটিল রোগে ভুগছিলেন। একাকী, নিঃসঙ্গ, নিন্দিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত জীবন কাটানোর পর ভারতের মাটিতে ২০০৭ সালের ২৮ জুলাই মারা যান সিকিমের কলঙ্ক এ দর্জি।
শেখ হাসিনাও সাড়ে ১৫ বছরে ভারতকে যা দেওয়ার তার পুরোটাই দিয়েছেন। দেওয়ার মতো আর কিছুই বাকি রাখেননি। সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার আগে লেন্দুপ দর্জির মতো শেখ হাসিনাকেও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। তফাত হচ্ছে লেন্দুপ দর্জি ভারতে গেছেন সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। আর শেখ হাসিনাকে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন।
সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে ইতিহাসের ঘৃণিত চরিত্র লেন্দুপ দর্জির সঙ্গে তুলনার বিষয়টি ওঠে আসে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার দিন থেকে। ওইদিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত জানাজায়ে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। সকাল থেকে শত শত মাইকে খালেদা জিয়ার কণ্ঠের একটি ভাষণ ১০ মিনিট পরপর বাজতে থাকে। এতে শেখ হাসিনা ও লেন্দুপ দর্জি নাম দুটি প্রতিধ্বনিত হয়।
প্রায় এক যুগ আগে খালেদা জিয়া একটি জনসভায় শেখ হাসিনাকে ভারতের দালাল লেন্দুপ দর্জি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘আপনি ভারতের দালালি করছেন। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্যকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আপনি ভারতের দালালি ছাড়ুন। লেন্দুপ দর্জির জীবন থেকে শিক্ষা নেন।’
শেখ হাসিনার খেদোক্তি ‘ভারতে বনবাস’-এ আছিÑএ উক্তি কি বেগম খালেদা জিয়ার অভিব্যক্তির বাস্তব প্রতিফলন। এমনটিই মনে করছেন বিভিন্ন দেশের শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শেখ হাসিনা ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ইন্ডিয়া বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, যা আমাদের সার্বভৌমত্বে বিজেপি সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে এবং ইতোমধ্যেই অবনতিশীল সম্পর্কটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়।’
সম্প্রতি তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আরো লিখেছেন, ‘ইন্ডিয়া ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের সহযোগী ছিল এবং শেখ হাসিনার প্রতি এখনো রাষ্ট্রীয় সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। এই অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হবে। শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের বিরোধের মূল বিষয় হলোÑফ্যাসিবাদী দুঃশাসন, হত্যাযজ্ঞ এবং জাতীয় সম্পদ লুটপাটের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। শীর্ষ অপরাধীদের বড় অংশই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে! তাদের অনেকেই প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছে আর ইন্ডিয়াও তা অবারিতভাবে হতে দিয়েছে এবং দিচ্ছে।’
লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

