৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা সৌদি-সমর্থিত ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায়। তারা পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে নেয়। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ওই একই সপ্তাহে আলজেরিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তারা আমিরাতের বিমানের জন্য নিজেদের আকাশসীমাও বন্ধ করে দেয়।
এ ঘটনা দুটি ঘটেছিল অনেক দূরের দুটি ভিন্ন দেশে। কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, তিনটি বড় ঘটনার সুতোয় তারা একসঙ্গে বাঁধা। প্রথমত, আমেরিকা ইরানকে হারাতে পারেনি, আবার তার আরব বন্ধুদের রক্ষাও করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব আর আমিরাতের দ্বন্দ্ব এখন মারাত্মক আকার নিয়েছে। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্য আর আফ্রিকার কৃত্রিম সীমানাগুলো দ্রুত মুছে যাচ্ছে।
ইয়েমেনের এই উত্তেজনা নজর কেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। হুথিরা মোখা বন্দর, লোহিত সাগরের উপকূলের বেশিরভাগ অংশ আর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। ফলে তারা এখন বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
বিশ্ববাণিজ্যের জন্য লোহিত সাগরের এই প্রবেশপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর ভরসা করেই এশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। আর এই জলপথ থেকে উপার্জিত ট্যাক্সের টাকায় মিসরের অর্থনীতি কোনোমতে টিকে আছে।
সৌদি আরব যখন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব এড়ানোর চেষ্টা শুরু করল, তখন এই পথটার গুরুত্ব আরো বেড়ে গেল। রিয়াদ তার পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের বন্দরের দিকে তেল পাঠানো শুরু করেছিল। কিন্তু হুথিদের এই হামলা আর ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন আক্রমণের কারণে হঠাৎ সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সৌদি আরব আর বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক নজিরবিহীন বিপদের মুখে পড়েছে।
হুথিদের এই হামলায় ইরান অক্ষ মজবুত হলেও ইয়েমেন যুদ্ধের একটা নিজস্ব হিসাব-নিকাশ আছে। গত জুলাই মাসে সৌদি আরব সানা বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালিয়ে নতুন করে লড়াই উসকে দিয়েছিল। পরের কয়েক মাস ধরে সংঘাত শুধু বেড়েছেই। তবে এই লড়াইয়ের পেছনে সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বও কাজ করেছে।
গত ডিসেম্বরে সৌদি বাহিনী ইয়েমেন থেকে আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীকে তাড়িয়ে দেয়। রিয়াদ মূলত দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে মদত দেওয়া আমিরাতের একটা বড় চালের অংশ।
সোমালিল্যান্ডকে ইসরাইল স্বীকৃতি দেওয়ার পর সৌদি আরব বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। এর পেছনে আমিরাতের হাত থাকতে পারে বলে তাদের সন্দেহ ছিল। সোমালিয়ার হাত থেকে বেরিয়ে আসা এই সোমালিল্যান্ডের ওপর ইসরাইলের নজর ছিল। বাব আল-মান্দেবের ওপারে ইসরাইল ঘাঁটি গাড়লে তা রিয়াদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আমিরাত যদি ইসরাইলকে ব্যবহার করে সৌদিকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে, তবে সেটি হবে আরো বিপজ্জনক।
তখন রিয়াদ চেষ্টা করল তুরস্ক, মিসর আর কাতারকে নিয়ে একটা জোট গড়তে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটা তৃতীয় শক্তি তৈরি করা। একদিকে থাকবে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ, অন্যদিকে আমিরাত-ইসরাইলের আব্রাহাম চুক্তি আর তাদের মধ্যে থাকবে এই নতুন জোট।
ইয়েমেন থেকে আমিরাতকে বের করে দেওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু আমিরাতের মিত্ররা হেরে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার পুরো দায়িত্ব গিয়ে পড়ল সৌদির ওপর। রিয়াদ প্রচুর সাহায্য পাঠাল, নতুন করে বাহিনী সাজাল আর আকাশপথে সুরক্ষার আশ্বাস দিল। তবে এসব সাহায্যের বেশিরভাগই বেশিদিন টেকেনি।
কয়েক দশকের ব্যর্থতার পরও সৌদি কৌশলের কোনো উন্নতি হয়নি। প্রচুর টাকা ঢালা, মাঝে মাঝে বিমান হামলা চালানো, অবরোধ করা আর ভুয়া প্রচার চালানো দিয়ে তো আর যুদ্ধের মাঠের আসল শক্তি তৈরি করা যায় না। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল ভুতুড়ে সৈন্য। তাদের অস্তিত্ব ছিল শুধু কাগজ-কলমে। মাস শেষে তারা শুধু বেতন তুলত।
সৌদিদের সব গোপন বার্তা হুথিরা আগেই জেনে যেত। আর আকাশপথে যে বিমান সুরক্ষার কথা বলা হয়েছিল, তা বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়নি। আরব সোশ্যাল মিডিয়ায় তখন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, আমিরাত গোপনে তার পুরোনো লোকদের কাজে লাগিয়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল রিয়াদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া। একই সঙ্গে নতুন সৌদি জোটের ব্যাপারে ইসরাইলের যে দুশ্চিন্তা ছিল, সেটাকেও সমর্থন জানাচ্ছিল তারা।
হুথিদের এই এগিয়ে যাওয়াকে শুধু ইরানের চাল বা সৌদির ওপর হামলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই অঞ্চলের ক্ষমতার লড়াই যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, হুথিদের এই পদক্ষেপ তারই একটা জবাব। সোমালিল্যান্ডকে ইসরাইলের স্বীকৃতি আর সেখানে গোপনে সৈন্য মোতায়েনের গুঞ্জন নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এর মানে হলো, ইসরাইলি, আমিরাতি আর মার্কিন বাহিনী ঠিক প্রণালির ওপারেই চলে আসতে পারে। সেখান থেকে ইয়েমেনে পাল্টা হামলা চালানো খুব সহজ হবে।
এই ভয়ের কারণেই সোমালিয়ার আল-শাবাব গোষ্ঠীর সঙ্গে হুথিদের যোগাযোগ আরো বেড়ে যেতে পারে। তাহলে যুদ্ধটা হর্ন অব আফ্রিকা বা আফ্রিকা শিং অঞ্চলের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই সপ্তাহে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যখন কায়রোতে গেলেন, তখন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি নিশ্চয়ই আফ্রিকার এই পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছিলেন। মিসর গত ডিসেম্বরে রিয়াদকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান আর তুরস্কের সঙ্গে সৌদির মক্কা চুক্তিতে তারা শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়নি।
বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে সুয়েজ খালের আয় কমে যাবে। আর তার সঙ্গে যদি ইরানের যুদ্ধ যুক্ত হয়, তাহলে মিসরের দুর্বল অর্থনীতি একবারে ভেঙে পড়বে।
ইয়েমেন যুদ্ধ আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ায় কায়রোর ওপর চাপ আরো বাড়ছে। এমনিতেই ইথিওপিয়ার রেনেসাঁ বাঁধ নিয়ে তাদের সঙ্গে একটা বড় বিবাদ চলছে। মিসর হয়তো হুথিদের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে নামবে না। কিন্তু এখন তাদের বাজি ধরার খেসারত দিতে হবে অনেক বেশি। সৌদি আরব আর আমিরাতের দ্বন্দ্বে বিভক্ত এই অঞ্চলে মিসর এখন আর আগের মতো দুই পক্ষ থেকেই টাকা পাওয়ার আশা করতে পারবে না। যেকোনো একপক্ষকে বেছে নেওয়া মানে অন্যপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করা।
আমেরিকা যে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামছে না, এতে সৌদি আরব বেশ বিরক্ত। তারা পাকিস্তান আর তুরস্কের কাছ থেকে সাহায্য আশা করেছিল। কিন্তু এই দুটি দেশ শুধু মুখে সহানুভূতি দেখিয়েছে। ইয়েমেনের কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যে পা দেয়নি।
পাকিস্তান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের প্রতিশ্রুতি শুধু নতুন কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে খাটে। কিন্তু সৌদির হাতে যখন বিকল্প কমে আসছে, তখন পাকিস্তানের পক্ষে এই অবস্থানে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। পাকিস্তান যদি ইয়েমেনে সেনা পাঠায়, তবে তা হবে এ অঞ্চলে নিরাপত্তার লড়াইয়ের এক নতুন অধ্যায়। যুদ্ধটা তখন মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে যাবে।
এই পুরো সমীকরণটা আমাদের আবার আলজেরিয়ার গল্পে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট আবদেলমাদজিদ তেবুন আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। কারণ সাহেল অঞ্চলে আমিরাতের কিছু কর্মকাণ্ড আর পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর দাবিকে তারা সমর্থন দিয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডের অধীনে মরক্কোকে আমিরাত যে সমর্থন দিচ্ছিল, সেখান থেকেই আলজেরিয়ার যত ক্ষোভ। আমিরাতের টাকায় মরক্কো সাহেল অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে, যেটি আলজেরিয়ার পছন্দ হয়নি।
আলজেরিয়ার অভিযোগ, আমিরাত নাকি শাদ, মালি আর নাইজারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। সুদান আর লিবিয়ায় যুদ্ধবাজ নেতাদের টাকা দেওয়ার জন্যও তারা আমিরাতকে দায়ী করে। রিয়াদের মতোই আলজেরিয়াও আমিরাতের এই চক্রান্তকে আমিরাত-ইসরাইল অক্ষের চাল হিসেবেই দেখে।
এই সবকিছু আমাদের দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রটা অত ছোট নয়, যতটা আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা ভাবেন। উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো এখন চিরাচরিত সীমানা পেরিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নেমে পড়েছে।
সম্প্রতি ইরিত্রিয়া আমিরাতের বিরুদ্ধে ‘বন্দর সাম্রাজ্যবাদের’ অভিযোগ এনেছে। তাদের সঙ্গে নাকি ইসরাইলও আছে। হুথিদের মতোই ইরিত্রিয়াও সোমালিল্যান্ডে আমিরাতের প্রভাব বিস্তার আর ইসরাইলিদের আনাগোনা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছে। ওদিকে সুদানের গৃহযুদ্ধে মদত দেওয়ার কারণেও বিশ্বজুড়ে আমিরাতের সমালোচনা বাড়ছে।
ইয়েমেনের ইতিহাস বড় অদ্ভুত। সেখানে চোখের পলকে সব বদলে যায়। তাই হুথিদের এই সাফল্য হয়তো সাময়িক হতে পারে। তবে এখান থেকে বড় শিক্ষাটা স্পষ্ট। এই অঞ্চলের রাজনীতি শুধু ইরান আর আমেরিকার মধ্যকার লড়াই নয়। সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব এখন তিনমুখী এক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে, যা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে।
ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর
জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

