মরহুম ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সাম্প্রতিক বইটির (Bangladesh Jamaat-e-Islami : Its History and Politics) প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, পূর্বনির্ধারিত ব্যস্ততার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারিনি। এ জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কারণ, বইটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু একজন আগ্রহী পাঠকের নয়; এর নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও আমি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলাম।
পুরো পাণ্ডুলিপিটি সম্পাদনার সুযোগ আমার হয়েছিল। বইটির অনেক অংশ প্রথমে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ ও বর্ণনাধর্মী আঙ্গিকে লেখা ছিল। একজন সম্পাদক হিসেবে আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল লেখকের নিজস্ব কণ্ঠ ও অভিজ্ঞতা অক্ষুণ্ণ রেখে সেসব অংশকে আরো সুসংবদ্ধ, বিশ্লেষণধর্মী ও একাডেমিক রূপ দিতে সহায়তা করা। বইটির ধারণাগত কাঠামো শক্তিশালী করা, বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং সামগ্রিক যুক্তিপ্রবাহকে স্পষ্ট করাই ছিল আমার কাজ। বইটিতে আমার লেখা একটি ভূমিকা বা Preface-ও রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই, লেখকের প্রতিটি বক্তব্য, ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত ছিলাম না। একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে লেখা বইয়ে সম্পাদক এবং লেখকের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে সম্পাদক হিসেবে আমি সচেতনভাবে তার মূল যুক্তি বা সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করিনি। লেখকের একাডেমিক স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্য এবং নিজস্ব অবস্থান প্রকাশের অধিকারকে আমি সম্মান করেছি। কেননা সম্পাদকের কাজ লেখকের কণ্ঠকে নিজের কণ্ঠ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং সেই কণ্ঠকে আরো স্পষ্ট, সংহত ও পাঠযোগ্য করে তোলা।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও পরে জানতে পারলাম, সেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তি, বক্তা ও আলোচকদের সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ প্যানেল ছিল। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে কিছুটা বিস্মিত করেছে : আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। বইটির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু জামায়াতের ইতিহাস, রাজনীতি, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে রচিত, তাই দলটির একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি আলোচনায় উপস্থিত থাকলে অনুষ্ঠানটি আরো ভারসাম্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারত।
কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনা হবে, অথচ সেই সংগঠনের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে না—এতে বিতর্কটি অনিবার্যভাবে একপেশে হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। জামায়াতের প্রতিনিধি লেখকের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করতে পারতেন, কোনো বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাইতে পারতেন কিংবা বইয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে পারতেন। তাতে লেখক, পাঠক এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন—সব পক্ষই উপকৃত হতো।
বইটি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনও আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বইটির কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় (প্রধানত ১৯৭১-সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন এবং জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া নিয়ে কথিত তালবাহানা) এমনভাবে সামনে এনেছে, যাতে জামায়াতের সমালোচনাই বইটির প্রধান, এমনকি একমাত্র, বার্তা বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু বইটির বিষয়বস্তু ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এতে জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, কৌশল, সামাজিক ভূমিকা, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির অবস্থান এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ রয়েছে। লেখকের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর কয়েকটি ইতোমধ্যে দলটির মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অথচ সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এসব ইতিবাচক পরিবর্তন, সংস্কার-প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎমুখী ভাবনা তুলনামূলক কম গুরুত্ব পেয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় অগ্রাধিকার থাকতে পারে। কোনো বই থেকে সংবাদযোগ্য বা বিতর্কিত বক্তব্য নির্বাচন করাও সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি বই থেকে শুধু কয়েকটি বিতর্কিত বক্তব্য বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরলে বইটির সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প আড়ালে চলে যেতে পারে। তখন পাঠকের সামনে বই নয়, বইটির একটি নির্বাচিত ও আংশিক প্রতিচ্ছবি হাজির হয়।
আমার পাঠে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এই বইটি জামায়াতকে হেয়, নিন্দা বা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে লেখেননি। বরং এটি দলটির সঙ্গে একধরনের Critical but constructive engagement—সমালোচনামূলক, কিন্তু গঠনমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ।
লেখক কিছু কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছেন। কয়েকটি বিষয়ে তিনি স্পষ্ট দ্বিমত প্রকাশ করেছেন এবং দলটির অতীতের কিছু সিদ্ধান্ত ও বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ভেবেছেন—পরিবর্তিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় জামায়াত কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি, ভাষা ও কৌশল পুনর্বিন্যাস করতে পারে; কীভাবে দলটি অতীতের ভার বহন করেও ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারে; এবং কীভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে আরো গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
এই জায়গাতেই বইটির প্রকৃত গুরুত্ব।
একটি বইকে তার সবচেয়ে বিতর্কিত দুই-চারটি বক্তব্যের ভিত্তিতে বিচার করলে বইটির সামগ্রিক যুক্তি ও উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। বিশেষ করে ইতিহাস, রাজনীতি ও মতাদর্শ নিয়ে লেখা বইয়ের ক্ষেত্রে Selective Reading বা বাছাই করা পাঠ প্রায়ই মূল বক্তব্যকে আড়াল করে দেয়। একটি বাক্যকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তা লেখকের সামগ্রিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারে। রাজনৈতিক মেরূকরণের পরিবেশে এ ধরনের খণ্ডিত পাঠ সহজেই নতুন ভুল বোঝাবুঝি, উত্তেজনা ও বিভাজন তৈরি করে।
জামায়াতেরও বইটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত; অবজ্ঞা কিংবা আত্মরক্ষামূলক মনোভাব নিয়ে নয়; আত্মসমালোচনা, আত্মপর্যালোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের মানসিকতা নিয়ে। লেখকের সব বক্তব্য মেনে নিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তার বিশ্লেষণে ভুল থাকতে পারে, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে দলটির গভীর মতপার্থক্যও থাকতে পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত তথ্য, যুক্তি, দলিল ও পাল্টা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকাশ করাই হবে একটি পরিণত রাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়।
সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা। আমরা প্রায়ই সমালোচককে প্রতিপক্ষ এবং ভিন্নমতকে ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ গঠনমূলক সমালোচনা একটি রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মশুদ্ধি ও বিকাশের অন্যতম প্রধান উপাদান। যারা কোনো সংগঠনের উন্নতি চান, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো তোলেন। কারণ নির্বিচার প্রশংসা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজের দুর্বলতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে না।
একটি রাজনৈতিক দলের পরিপক্বতার পরিচয় শুধু প্রশংসা গ্রহণের সক্ষমতায় নয়; বরং সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে শান্তভাবে শোনা, প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণ এবং যুক্তিনিষ্ঠভাবে ভিন্নমত প্রকাশের সামর্থ্যের মধ্যেও নিহিত। কোনো সংগঠন যদি শুধু অনুগত কণ্ঠ শুনতে চায়, তবে একসময় সেটি নিজের তৈরি প্রতিধ্বনি-কক্ষের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে। সেখানে আত্মতুষ্টি বাড়ে, কিন্তু আত্মসংশোধনের পথ সংকুচিত হয়।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইটি সেই প্রয়োজনীয় আত্মপর্যালোচনা ও সংলাপের একটি উপলক্ষ হতে পারে। বইটিকে কেন্দ্র করে জামায়াতের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা হোক। লেখকের বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে প্রবন্ধ লেখা হোক। ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক নেতা ও তরুণ কর্মীরা যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্কে অংশ নিন। প্রয়োজন হলে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির বিভিন্ন বক্তব্যের জবাব প্রকাশ করুক। কিন্তু আলোচনা যেন হয় বইটির প্রকৃত বক্তব্যের ভিত্তিতে—খণ্ডিত উদ্ধৃতি, নির্বাচিত সংবাদ-শিরোনাম কিংবা রাজনৈতিক অনুমানের ভিত্তিতে নয়।
আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে শালীন অথচ তীক্ষ্ণ মতবিনিময়ের বড় অভাব। রাজনৈতিক প্রশ্নে আমরা খুব দ্রুত পক্ষ-বিপক্ষের শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাই। ফলে কোনো বইকে জ্ঞান ও আত্মজিজ্ঞাসার উৎস হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
সংবাদমাধ্যমের নির্বাচিত শিরোনাম নয়; বইটি পড়েই বইটির বিচার হোক। লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তা স্পষ্টভাবে বলা হোক, তবে সেই দ্বিমত প্রতিষ্ঠিত হোক তথ্য, যুক্তি ও পাল্টা বিশ্লেষণের ওপর। মতপার্থক্য যেন সংলাপ বন্ধ না করে; বরং সেখান থেকেই শুরু হোক আরো গভীর, শালীন ও ফলপ্রসূ বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা।
কারণ একটি বইয়ের সার্থকতা শুধু একমত পাঠক তৈরিতে নয়; নতুন প্রশ্ন, আত্মজিজ্ঞাসা এবং অর্থবহ সংলাপ সৃষ্টি করার মধ্যেও নিহিত।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নানইয়াং টেকনোলোজিক্যাল ইউনিভার্সিটি সিঙ্গাপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


