সমীকরণ বদলে দিয়েছে ইরান

সরদার ফরিদ আহমদ

সমীকরণ বদলে দিয়েছে ইরান

দীর্ঘ দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের একটি বিশ্বাস ছিল আমেরিকা তাদের রক্ষা করবে। আমেরিকা তাদের হয়ে লড়বে। আমেরিকা ইরানকে ঠেকিয়ে রাখবে। এই বিশ্বাসই গালফ অঞ্চলের রাজনীতিকে গড়ে তুলেছে। সামরিক জোটকে গড়ে তুলেছে। তেলের কূটনীতিকে গড়ে তুলেছে। শত শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনাকাটাকে বৈধতা দিয়েছে। এখন সেই নিশ্চয়তা কাঁপছে।

ইরানকে ঘিরে চলমান সংকট একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মিত্ররা এখন বিপুল আর্থিক, সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছে। কিন্তু বিনিময়ে পূর্ণ নিরাপত্তা পাচ্ছে না। এই উপলব্ধি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে রিয়াদ, আবুধাবি, দোহা ও মানামার রাজপ্রাসাদ, সামরিক সদর দপ্তর ও ব্যবসায়িক মহলে। পরিস্থিতি আমেরিকার আঞ্চলিক জোটব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কারণ ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণ করেছে। তারা দেখিয়েছে, আমেরিকাও ইরানের পাল্টা আঘাত থেকে শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। এই বার্তাটি গালফ অঞ্চলের শাসকদের মনে গভীরভাবে গেঁথে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভয় এখন আর কল্পনাভিত্তিক নয়। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক স্থাপনাগুলোর অন্তত ২২৮টি অবকাঠামো ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিগুলো এতে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান আমেরিকার আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা উন্মোচন করেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। দ্রুত বদলাচ্ছে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। আরবের রাজতন্ত্রগুলোও সেই শক্তির ছায়াতেই নিরাপত্তা খুঁজেছে। কিন্তু ইরানের সাম্প্রতিক হামলা সেই বিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মার্কিন ঘাঁটিগুলো এত দিন ছিল ভয় ও প্রভাবের প্রতীক। এখন সেগুলোই দুর্বলতার প্রতীক হয়ে উঠছে। হামলার পরপরই ক্ষয়ক্ষতির খবর গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতা সামনে এসেছে। বহু ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দূতাবাস আক্রান্ত হয়েছে। হতাহতের খবরও এসেছে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবলয় আর আগের মতো অটুট নেই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আরব শাসকদের সামনে। তারা কেন নিজেদের দেশে এত মার্কিন ঘাঁটি বসাতে দিয়েছিলেন? এই ঘাঁটিগুলো কার স্বার্থ রক্ষা করেছে? সাধারণ মানুষের, নাকি শুধু ক্ষমতাসীন রাজপরিবারের? বাস্তবতা হলো, এসব ঘাঁটির প্রধান কাজ ছিল আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। তেল, বাণিজ্যপথ ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। কিন্তু সেই নিরাপত্তা কাঠামো এখন ভঙ্গুর। ইরানের হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরের কোনো ঘাঁটিই নিরাপদ নয়। অর্থাৎ যেসব ঘাঁটিকে নিরাপত্তার ঢাল ভাবা হয়েছিল, সেগুলোই এখন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ কারণেই নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। আরব দেশগুলোও বুঝতে শুরু করেছে, বাইরের শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা স্থায়ী নিরাপত্তা দেয় না। বরং তা দেশকে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে ঠেলে দেয়। উপসাগরে এখন শুধু যুদ্ধের ধোঁয়া নয়, শক্তির নতুন সমীকরণও দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাবের যুগে স্পষ্ট ফাটল ধরেছে। এটি একটি কৌশলগত ধাক্কা।

বছরের পর বছর গালফ রাজতন্ত্রগুলো শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে আমেরিকান অস্ত্র কিনতে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। যুদ্ধবিমান। রাডার। আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক। গোয়েন্দা সহযোগিতা। সামরিক প্রশিক্ষণ। প্রতিশ্রুতি ছিল একটাই—আমেরিকান নিরাপত্তা কিনুন, নিরাপদ থাকুন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন তুলেছে। যদি ইরান আমেরিকার সামরিক ঘাঁটির চারপাশের প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারে, তাহলে তেল স্থাপনা? বিমানবন্দর? সমুদ্রবন্দর? লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র? আর্থিক কেন্দ্র? রাজপ্রাসাদ?

গালফ অঞ্চলের অর্থনীতি আধুনিক। কিন্তু ভঙ্গুর। তাদের সমৃদ্ধি নির্ভর করে স্থিতিশীলতার ওপর। তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ভর করে শান্ত পরিবেশের ওপর। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোও অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। অল্প কিছু স্থাপনায় হামলাই ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। ইরান এটি খুব ভালো করেই বোঝে। তেহরানের কৌশল কখনোই আমেরিকার সঙ্গে সমান সামরিক শক্তির লড়াই নয়। ইরানের কৌশল ভিন্ন। এটি ‘যন্ত্রণার মাধ্যমে প্রতিরোধ’ নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইরান চায়, তাদের শত্রুরা বিশ্বাস করুক—তেহরানে আঘাত মানেই পুরো অঞ্চলে অসহনীয় মূল্য দিতে হবে। এই কৌশল এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে।

শুধু আর্থিক চাপের কথাই ধরা যাক। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। সামরিক ব্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি যোগ করলে মোট যুদ্ধব্যয় ৬ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। আমেরিকা তার খরচের বিশাল ফর্দ ধরে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে। এর পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ওই দেশগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যয় হবে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি হামলার আশঙ্কার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের কাছে আমেরিকা দ্রুতগতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি বাড়িয়েছে। এক প্রতিবেদনে কাতার, কুয়েত, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ঘিরে প্রায় ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের জরুরি অস্ত্র বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই খরচ আমেরিকার মিত্র আরব দেশগুলোর মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ।

সামরিক পুনর্গঠনের খরচ দ্রুত বাড়ছে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আধুনিক প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দামই মিলিয়ন ডলার। ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়মিত আপডেট করতে হয়। নজরদারি নেটওয়ার্ক বাড়াতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আরো সুরক্ষিত করতে হয়। এই ব্যয়ের বড় সুবিধাভোগী কে? মূলত আমেরিকার অস্ত্রশিল্প।

এতে এই অঞ্চলের ভেতরে একটি অস্বস্তিকর ধারণা তৈরি হচ্ছে। আমেরিকা মিত্রদের আরো বেশি খরচ করতে বলছে। ইরানের ভয় দেখাচ্ছে। আরো অস্ত্র বিক্রি করছে। কিন্তু অনিরাপত্তা কমছে না। বরং বাড়ছে। এই চক্র হতাশা তৈরি করছে। গালফ অঞ্চলের শাসকরা বোঝেন, নির্ভরতার একটি মূল্য আছে। কিন্তু এখন তারা আরো গভীর প্রশ্ন তুলছেন—এই নির্ভরতা কি সত্যিই নিরাপত্তা দিচ্ছে? এই প্রশ্ন রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যেও ইরান কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছে। তেহরানের নেতৃত্ব জানে, তারা সরাসরি আমেরিকাকে সামরিকভাবে হারাতে পারবে না। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে, সংঘাতের মূল্য এতটাই বাড়িয়ে তোলা সম্ভব, যাতে শত্রুরা সতর্ক হতে বাধ্য হয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান আংশিকভাবে সফল হয়েছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষকরা সম্প্রতি বলেছেন, ইরান সীমিত প্রতিশোধের পুরোনো কৌশল ছেড়ে আরো বিস্তৃত উত্তেজনার পথে গেছে, যাতে প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায় এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরোধক্ষমতা প্রথমে মানসিক বিষয়, পরে সামরিক। যদি গালফ অঞ্চলের শাসকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইরান আমেরিকার ঘাঁটি, তেল রুট ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম, তাহলে কৌশলগত হিসাব বদলাতে শুরু করবে। সম্ভবত সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথগুলোর একটি। সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আতঙ্ক তৈরি করে। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বীমা খরচ বাড়ে। তেলের দাম লাফিয়ে ওঠে। বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সাম্প্রতিক উত্তেজনা হরমুজ ঘিরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এখানেই ইরানের কৌশলগত শক্তি। ইরানের স্থায়ী বিজয় দরকার নেই। শুধু অস্থিরতা তৈরি করার ক্ষমতাই যথেষ্ট। সেটাই আঞ্চলিক রাজনীতির হিসাব বদলে দিতে পারে। বদলে দিচ্ছেও। গালফ রাজতন্ত্রগুলো এটি জানে। তাদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক আস্থার ওপর। পর্যটন। অর্থনীতি। বিমান পরিবহন। জ্বালানি রপ্তানি। রিয়েল এস্টেট। বিদেশি বিনিয়োগ। এসব খাত স্থিতিশীলতা ছাড়া টিকতে পারে না। যুদ্ধ স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে।

সমীকরণ-বদলে-দিয়েছে-ইরান

দুবাইকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। দশকের পর দশক ধরে দুবাই ছিল নিরাপত্তার প্রতীক। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ছিল। পর্যটকের ভিড় ছিল। এশিয়া ও আফ্রিকার শ্রমবাজার নির্ভর করত এই শহরের ওপর। আকাশচুম্বী ভবনগুলো স্থায়িত্বের বার্তা দিত। আজ সেই স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে। আমেরিকা ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি-বহিরাগত জোট কি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে? যুদ্ধ সেই ভ্রান্ত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। সংঘাত থেকে দূরে থাকার যে ধারণা ছিল, তা আর নেই।

দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের বিশ্বাস। নিরাপদ শহর—এই ধারণাই অর্থনীতি গড়ে তুলেছিল। বিনিয়োগ এসেছে। পর্যটন বেড়েছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানির সদর দপ্তর স্থাপিত হয়েছে। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলেই অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগে। আত্মবিশ্বাসের শহরে এখন অদৃশ্য ভয়। ড্রোন হামলার সতর্কতা, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্রিয় হওয়া, বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন—এসব খবর মানুষের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে। গুজবও আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। বাজার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে দ্রুত। পর্যটন বুকিং কমছে। বীমা খরচ বাড়ছে। পরিবহন অনিশ্চিত হচ্ছে। দুবাই যুদ্ধক্ষেত্র নয়। কিন্তু যুদ্ধের ছায়া স্পষ্ট। এই ছায়াই যথেষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কা দেওয়ার জন্য।

বাসিন্দারা বিকল্প পরিকল্পনা ভাবছেন। পরিবারগুলো স্থানান্তরের কথা ভাবছে। অনেকেই দুবাই ছেড়েছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। স্কুলগুলো জরুরি মহড়া করছে। বিমানবন্দর বাড়তি সতর্কতায় চলছে। হোটেলগুলো বাতিল বুকিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি ধ্বংস নয়। কিন্তু উদ্বেগ। আর উদ্বেগই সবচেয়ে বড় সংকেত।

দুবাইয়ের অর্থনীতির দৃশ্যমান স্তম্ভ পর্যটন। বিলাসবহুল শপিং। মরুভূমি সাফারি। সমুদ্রতীরের রিসোর্ট। আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ট্রানজিট পর্যটন। সবকিছু নির্ভর করে নিরাপত্তার ধারণার ওপর। যুদ্ধ সেই ধারণাকে দ্রুত বদলে দেয়। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতা বাড়ছে। পর্যটন বীমার খরচ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজকরা বিকল্প ভাবছে। করপোরেট ভ্রমণ কমছে। পর্যটকরা নিরাপদ গন্তব্য খুঁজছে।

প্রথম ধাক্কা লাগে হোটেলশিল্পে। বুকিং কমে। শেষ মুহূর্তে বাতিল বাড়ে। এয়ারলাইন রুট পরিবর্তন করে। ট্রানজিট যাত্রীরা কম সময় থাকেন। বিলাসবহুল পর্যটন সবচেয়ে সংবেদনশীল। ধনী পর্যটকরা ঝুঁকি এড়িয়ে চলেন। একটি ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতাই সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। খুচরা বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মলে ভিড় কমে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড সম্প্রসারণ থামায়। প্রদর্শনী ও ইভেন্ট স্থগিত হয়। এটি ধস নয়। কিন্তু ক্ষয়। আর ক্ষয় দীর্ঘ মেয়াদে বিপজ্জনক।

দুবাই বৈশ্বিক ট্রানজিট হাব। আকাশপথের অনিশ্চয়তা পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে বিমান সংস্থাগুলো রুট পরিবর্তন করে। জ্বালানি খরচ বাড়ে। বীমা ব্যয় বাড়ে। এতে ট্রানজিট যাত্রী কমে। কার্গো বিলম্ব হয়। সরবরাহ শৃঙ্খল ধীর হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ে। দুবাইয়ের লজিস্টিক মডেল নির্ভর করে স্থিতিশীলতার ওপর। যুদ্ধ সেই স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দিয়েছে।

দুবাইয়ের জনসংখ্যার বড় অংশ বিদেশি। তারা গিয়েছে সুযোগের খোঁজে। নিরাপত্তা দুর্বল হলে তারা দ্রুত সরে যায়। কর্মীরা প্রশ্ন করছেন—এখানে থাকা নিরাপদ কি? পরিবার থাকবে কি? সঞ্চয় সরানো দরকার কি? এমন প্রশ্নই অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। কারণ দুবাইয়ের উন্নয়ন নির্ভর করে বৈশ্বিক দক্ষ জনশক্তির ওপর। দুবাই এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে যায়নি। কিন্তু শহরটি স্বাভাবিকও নয়। আকাশে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয়। ইরান দুবাইয়ের ওপর ব্যাপক ক্ষ্যাপা। কারণও আছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি দুবাইয়ে। দেশটির শাসক ইসরাইলের মিত্র। ঘনিষ্ঠতর। দুবাইকে ইরান সহজে ছেড়ে দেবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। ফলে মানুষের মধ্যে সরব উদ্বেগ। যুদ্ধ সরাসরি শহরটিকে না ভাঙলেও তার নিরাপত্তার ধারণাকে তছনছ করে দিয়েছে।

উত্তেজনার গুজবও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বীমা ব্যয় বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় পড়েন। সরকারগুলো প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ায়। পুনর্গঠন ব্যয় বাড়তে থাকে। সামাজিক খাতে চাপ তৈরি হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি এক বিপজ্জনক সংকট।

গালফ রাষ্ট্রগুলো তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনার জন্য স্থিতিশীলতা দরকার। কোনো বিনিয়োগকারী এমন অঞ্চলে বিলিয়ন ডলার ঢালতে চাইবে না, যেখানে যেকোনো সময় ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ শুরু হতে পারে। তাই ইরানের কৌশলগত বার্তা খুব পরিষ্কার। ইরান চাপে থাকলে গালফ অঞ্চলের কেউই পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে না। এই বার্তা প্রভাব ফেলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ক্রমেই বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। অঞ্চলটি এমন এক অনিশ্চিত ভারসাম্যের দিকে যাচ্ছে, যেখানে কোনো পক্ষই পুরোপুরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পুরোনো প্রভাব আর আগের জায়গায় নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাই তার বড় প্রমাণ। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ নিরাপত্তার নামে নতুন সামরিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ঘোষণার পরই দেখা গেল, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবই পাশে দাঁড়াচ্ছে না।

সৌদি আরব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করা যাবে না। আকাশসীমাও নয়। এটি শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়। এটি রাজনৈতিক সতর্কসংকেত। রিয়াদ বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আর ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। এখানেই বদলে গেছে বাস্তবতা। একসময় ওয়াশিংটনের নির্দেশই ছিল শেষ কথা। এখন আরব মিত্ররাই হিসাব কষছে নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে। তারা জানে, যুদ্ধ লাগলে আগুন আগে জ্বলবে তাদের ঘরেই।

ট্রাম্পের আচরণও প্রশ্ন তুলেছে। মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সামরিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। পরে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আমেরিকা এখনো মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোনো মানসিকতায় দেখছে। কিন্তু বাস্তবতা পাল্টে গেছে। হরমুজ প্রণালি শুধু সামরিক এলাকা নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। সেখানে যুদ্ধ মানে তেলবাজারে অস্থিরতা। বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধাক্কা। তাই সৌদি আরব, কাতার কিংবা ওমান এখন সরাসরি সংঘাতের বদলে ভারসাম্যের পথ বেছে নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন নতুন বার্তা দিচ্ছে—বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নয়।

কিছু বিশ্লেষক তো বলছেন, গালফ রাষ্ট্রগুলো এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিঃশর্ত একাত্মতার ব্যাপারে আরো সতর্ক হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা কূটনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। গালফের কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সময়ে চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ছে। তারা অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করছে। ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাচ্ছে। আবার একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। এটি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা।

গালফের শাসকরা বাস্তববাদী হওয়ার চেষ্টা করছেন। টিকে থাকাই তাদের প্রথম লক্ষ্য। তারা মনে করেন, যদি আমেরিকান সুরক্ষা ক্রমেই ব্যয়বহুল ও কম নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে, তাহলে তারা বিকল্প খুঁজবেন। এর মানে এই নয় যে তারা সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকাকে ছেড়ে দেবে। সামরিক সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত গভীর। আমেরিকার প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর গালফ এখনো ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু আস্থা আর নিঃশর্ত নেই—এটাই মূল বিষয়।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন