পেট্রোডলার ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি থেকে। চুক্তি অনুযায়ী এসব দেশকে ওয়াশিংটন নিরাপত্তা দেবে এবং এর বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন ডলারে তাদের তেল বিক্রি করবে। এই চুক্তি ডলারভিত্তিক তেল বিক্রি এবং মার্কিন ট্রেজারির পুনর্বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠা করেছিল। জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত পেট্রোডলার ব্যবস্থা ১৯৭০-এর দশক থেকে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে সফলভাবে কাজ করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক শক্তিকেও সমর্থন জুগিয়েছে। এই ব্যবস্থাটি মার্কিন সরকার এবং দেশটির ভোক্তাদের জন্য ঋণের হারও কম রেখেছে।
কিন্তু ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকা পেট্রোডলার চুক্তি ভেঙে দিতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের জন্য চীনের মুদ্রা ইউয়ানভিত্তিক শুল্কারোপ করায় এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি লেনদেনের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থানকে ক্রমেই দুর্বল করবে।
একটি নিরাপদ বিনিময় মুদ্রা হিসেবে বর্তমানে ডলারের অবস্থান শক্তিশালী হলেও এর ক্ষমতার প্রভাব কমার প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তেল বিক্রিতে ইউয়ানের ব্যবহার আরো বাড়লে পেট্রোডলারের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হবে, শক্তিশালী হয়ে উঠবে পেট্রোইউয়ান।
জার্মান ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ডয়চে ব্যাংকের গত সপ্তাহের মূল্যায়নেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, চলমান সংঘাত পেট্রোডলারের আধিপত্যের অবসান এবং পেট্রো-ইউয়ান ব্যবস্থার সূচনা করতে পারে। জার্মান ব্যাংকটির কৌশলবিদ মল্লিকা সচদেভা একটি নোটে ব্যাখ্যা করেছেন, চলমান সংঘাত ‘নিরাপত্তার বিনিময়ে তেল’ বা পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে পরীক্ষা করছে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালিতে আটকে দিয়েছে। তবে চীনা ইউয়ানে দাম পরিশোধ করা অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলো সীমিত প্রবেশাধিকার দিয়েছে তেহরান।
আমেরিকান বিজনেস নিউজ চ্যানেল সিএনবিসির মতে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এই প্রণালি দিয়ে অন্তত ১ কোটি ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যার পুরোটাই চীনে পাঠানো হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান চীনে দৈনিক প্রায় ১ দশমিক ২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী রপ্তানির হার থেকে দৈনিক ২ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কম।
বর্তমান সংঘাত শুরুর আগের মাসগুলোয় চীন ব্যাপকভাবে তেল মজুত করছিল। বেইজিং গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম দুই মাসে অপরিশোধিত তেল আমদানি ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। বর্তমানে চীনের কাছে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত আছে, যা দিয়ে দেশটি তিন থেকে চার মাসের তেলের চাহিদা মেটাতে পারে।
ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের জন্য একটি কৌশলগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই নৌপথ দিয়ে কোন দেশের জাহাজ চলাচল করবে, তা নির্ধারণ করবে ইরান। জার্মান ডয়চে ব্যাংকের কৌশলবিদ মল্লিকা সচদেভা মনে করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা পেট্রোডলারের ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিতে পারে।
বর্তমান যুদ্ধ এমন বাড়তি সমস্যার জন্ম দিতে পারে, যা উপসাগরীয় অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনব্যবস্থাকে সুরক্ষা প্রদানকারী সামুদ্রিক কার্যক্রমের ওপর মার্কিন নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ডলার-মূল্যে বৈদেশিক সম্পদ বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে। কারণ এ অঞ্চলের সংঘাত থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি তাদের পণ্যের মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
ট্রাম্প নিজেই এই পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি ১ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের প্রয়োজন নেই। আমরা এই প্রণালি ব্যবহার করি না। এটি প্রয়োজন ইউরোপের। কোরিয়া, জাপান, চীনসহ অনেক দেশের এটার প্রয়োজন আছে। তিনি জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি থেকে তেল সংগ্রহ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে তাদের কোনো সাহায্য করবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে উপসাগরীয় তেলের ওপর কম নির্ভরশীল। কারণ তারা এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ এবং এখন কেনার চেয়ে জ্বালানি পণ্য বিক্রি করে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে তার তেল আমদানির ৮৪ দশমিক ২৬ শতাংশ করেছে পশ্চিম গোলার্ধ থেকে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করেছে মাত্র ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল এশিয়ার দেশগুলোর চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে তা সমগ্র এশিয়ার জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে, পতনের হুমকি সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ডলার। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ডলার সূচক চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তেলের উচ্চমূল্য আমদানিকারকদের ডলার সংগ্রহ করতে বাধ্য করছে। কারণ অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য তাদের ডলার প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে ডলারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে, যা এখন ইউরোপে দেখা যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়লেও ইউরোপে বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা ডলারের শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ইউরোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে, মার্কিন মুদ্রাটি সাময়িক সুবিধা লাভ করলেও বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি ডলারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বৈশ্বিক তেল রপ্তানিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অংশ ১৯৮০ সালের ৫৫ থেকে কমে ৩৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং সেমিকন্ডাক্টর বাণিজ্য এখন পেট্রোডলার প্রবাহের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের চেয়ে কম্পিউটার চিপ এখন মার্কিন ডলারে বেশি লেনদেন হওয়া আগামীতে পেট্রোডলারের অবস্থানকে আরো হুমকিতে ফেলবে। ২০২০ এবং ২০২১ সালে যখন করোনা মহামারির কারণে তেলের চাহিদা কম ছিল, তখন অপরিশোধিত তেলের চেয়ে মার্কিন ডলারে বিশ্বব্যাপী বেশি রপ্তানি করা হয়েছিল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, যা পেট্রোডলারের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন আনে।
সামগ্রিক চিত্রটিতে ডলারের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ার সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ কমে ৫৬ দশমিক ৭৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৯৫ সালে আইএমএফ তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর থেকে সর্বনিম্ন। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আগ্রাসী কৌশলের মাধ্যমে তাদের সম্পদে বৈচিত্র্য আনছে। ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালে তাদের স্বর্ণের মজুত দ্বিগুণ করেছে। এর ফলে রিজার্ভের ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে স্বর্ণের পরিমাণ বেড়ে ৭ দশমিক ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, তাদের রিজার্ভে ডলার সম্পদের অংশ ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও একই পথ অনুসরণ করছে এবং ডলারের ওপর তাদের নির্ভরতা কমাচ্ছে।
যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পেট্রোডলার ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলার তার মর্যাদা বজায় রেখেছে, কারণ এটি বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫০ শতাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, ইউয়ান বর্তমান অবস্থান মোট রিজার্ভের ২ শতাংশেরও কম। তবে পেট্রোডলারের ভবিষ্যতের গতিপথ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জার্মান কৌশলবিদ মল্লিকা সচদেভা ইরান যুদ্ধকে পেট্রো-ইউয়ানের সূচনাকাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই রূপান্তর সফল হবে কি না, তা নির্ধারণ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার উপসাগরীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূল নয় বলেই মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহের তথ্যানুযায়ী, মার্কিন ডলারের বিপরীতে চীনের মুদ্রা ইউয়ান ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। চীনের শক্তিশালী রপ্তানি বাণিজ্য, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এবং করপোরেট চাহিদা বাড়ার কারণে ইউয়ানের এই উত্থান ঘটেছে, যা বিশ্বব্যাপী চীনা মুদ্রাটির আধিপত্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন তাদের বাণিজ্য নিষ্পত্তিতে চীনা ইউয়ান ব্যবহার করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মডার্ন ডিপ্লোমেসি অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

