বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। আমার দেশ পরিবারের পক্ষ থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতি এই শুভদিনে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তাদের উৎসব পালন বরাবরের মতো আনন্দময় এবং নির্বিঘ্ন হোকÑসেটাই আমাদের সবার একান্ত প্রত্যাশা। বাংলাদেশ সরকারও দুর্গাপূজা উপলক্ষে লম্বা ছুটি ঘোষণা করেছে। সারা দেশে ৩৪ হাজার পূজামণ্ডপ নির্মাণ করা হয়েছে। এ সবই বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক সমাজ জীবনের বহিঃপ্রকাশ। এ দেশে আমরা সব নাগরিকের ধর্মীয় এবং নাগরিক অধিকারকে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি নিয়েই বড় হয়েছি।
সেই পাকিস্তান আমলের স্কুলজীবনেও পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় পূজায় হিন্দু বন্ধুদের পাঠানো লুচি আর মিষ্টি নিয়মিত খেয়েছি। স্মরণে আছে, গেন্ডারিয়া স্কুলের সর্বজনশ্রদ্ধেয় হেড স্যার সুধীর চন্দ্র রায়ের বিশাল বাড়িতে যথেষ্ট জাঁকজমকের সাথে পূজা হতো। বাঙালি মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা একেবারেই নেই এমন দাবি না করলেও জোর গলায় বলতে পারি, আমাদের তুলনীয় অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী এই উপমহাদেশে অন্তত আর নেই। এবার মূল আলোচনায় যাচ্ছি।
পাঠক উপরোক্ত অবস্থার বিপরীতে পার্শ্ববর্তী কথিত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বর্তমান পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখুন। ভোট দেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকারের দিকেই প্রথমে দৃষ্টি দেওয়া যাক। মুসলমানদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতের বিজেপিপন্থি নির্বাচন কমিশন এক নতুন আইন করেছে। এই বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ করে প্রায় তেরো কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার স্থগিত করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য যে, ভোটাধিকার স্থগিত হওয়া ১৩ কোটি নাগরিকের অধিকাংশই মুসলমান।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মুসলমানদের ভোটাধিকার যতটা সম্ভব কেড়ে নেওয়াই ভারতের বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটির ক্ষমতাসীন, কট্টর হিন্দু সাম্প্রদায়িক বিজেপি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইসলাম ধর্মের একজনকেও মনোনয়ন দেয়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কোনো মুসলমান সদস্য নেই। আচ্ছা, কেন্দ্রীয় সরকারের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান। এই যে কয়েক মাস আগের নির্বাচনে সেখানে বিজেপি ভূমিধস বিজয় লাভ করেছে, সেই প্রাদেশিক নির্বাচনেও সরকারি দল কোনো মুসলমানকে প্রার্থী করেনি। প্রকৃতপক্ষে ভারতের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতা একমাত্র দক্ষিণ ভারত ব্যতীত দেশটির অন্য সব অঞ্চলের অনুরূপ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।
গত দশ বছরে ভারতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কৌশলে মুসলমানদের সব রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের চিত্র কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ থেকে একেবারেই ভিন্ন। গত সপ্তাহে আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দলের এক এমপির বক্তব্যে বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি বেশ আনন্দিত হয়েছি। লক্ষ্মীপুরের প্রবীণ রাজনীতিবিদ বরকতউল্লা ভুলু দাবি করেছেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানরা নয়, বরং সংখ্যালঘু হিন্দুরা এবার তার দল বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। বিস্মিত হয়েছি কারণ, একসময় বলা হতো হিন্দুরা নাকি একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। সরকারি দলের এমপি সাহেব আমাদেরকে অন্যরকম তথ্য দিলেন।
ঐতিহাসিকভাবে সংখ্যালঘুদের পছন্দের দলের এই পরিবর্তন অনেকটাই বিস্ময়কর নয় কি? তবে, আনন্দিত হলাম কারণ, হিন্দুরা এবার বিএনপিকে জয়যুক্ত করে থাকলে আশা করা যায় ভবিষ্যতে কোনোদিন, অন্য কোনো চেহারায়, পলাতক ফ্যাসিস্টরা ফিরলে আমাদের রাজনীতি পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র পরিগ্রহণ করবে। সংখ্যালঘুদের ভোট নিশ্চয়ই আগের মতো আর কারো দলীয় সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না। মুসলমান এবং হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে মিলেমিশে প্রার্থীর চরিত্র এবং দলীয় কর্মসূচি তুলনা করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে ভোট দেবেন। প্রকৃত গণতন্ত্রে তো এমনটাই হওয়া উচিত। দেশের জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে? সেই সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম। আবার ভারতে ফিরি।
ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার হরণের সঙ্গে ধর্ম পালনের অধিকারও ছিনিয়ে নিয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখছি, মুসলমানদের ঈদুল ফিতর পালনের জন্য ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ছুটি থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের সাধারণ ছুটির তালিকায় মুসলমানদের কোনো পরবের দিন অন্তর্ভুক্ত নেই। যতদূর জানি, ঐচ্ছিক ছুটি নিয়ে দিল্লির মুসলমানদের ঈদ উৎসব উদযাপন করতে হয়। ভারতে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো অজুহাতে মসজিদ এবং মাদরাসা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কোনো মুসলমান মসজিদ রক্ষার চেষ্টা করলে তাকে জঙ্গি হিন্দুরা পিটিয়ে মেরে ফেলছে। প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার ওপর ভারত সরকার অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রকাশ্যে মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, এবার কথিত অনুপ্রবেশকারীদের কাছ থেকে চূড়ান্ত হিসাব নেওয়া হবে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশি তকমা দিয়ে গরু-ছাগলের মতো অস্থায়ী ক্যাম্পে বন্দি করা হচ্ছে এবং তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে এনে অনবরত এপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। মুসলমানদের সব ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকারে শুধু আঘাত করেই হিন্দুত্ববাদীরা থামছে না, জায়নিস্ট ইসরাইলের মতো করে তাদের ওপর গণহত্যা চালানোর পরিবেশ তৈরি করছে। সেখানে সাম্প্রতিক একটি হত্যার কথা বলি। রাজস্থানে সাইকুন খান নামের এক ব্যক্তির হিন্দুত্ববাদীদের হত্যার নির্মমতার কথা পড়লে যেকোনো পাঠক শিউরে উঠবেন।
সাইকুন খান তার বন্ধু নুর মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে বরোদার এক বাজারে মোটরসাইকেলের টায়ার কিনতে গিয়েছিলেন। সাইকুনকে অপেক্ষমাণ রেখে নুর মোহাম্মদ গিয়েছিলেন ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে। হঠাৎ হইচই শুনে ছুটে এসে নুর মোহাম্মদ দেখতে পেলেন এক হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সাইকুনের বুকের ওপর চেপে বসে পাথর দিয়ে বারবার আঘাত করে মাথা থেঁতলে দিচ্ছে। হত্যার জায়গাটা থানার প্রধান ফটকের ঠিক সামনে হলেও কোনো পুলিশ কিংবা উপস্থিত জনতা সাইকুনকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। পুলিশ যখন হত্যাকারী হর্ষ মূর্তিকারকে থানার ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিল, সেই হিন্দু জঙ্গি চিৎকার করে হিন্দিতে বলছিল, ‘আজ এক মুল্লাহকো মারা হ্যায়, আভি আউর কো মারুঙ্গা’, অর্থাৎ, আজ এক মোল্লাকে মেরেছি, এরপর আরো মারব।
সাইকুনের হত্যার খবর শুনে কিছু মুসলমান সাহস করে থানার সামনে প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ওপরই পুলিশ উল্টো লাঠিচার্জ করেছে। এখানেই মুসলমান হত্যায় পুলিশের সম্পৃক্ততা শেষ হয়নি। ওই জায়গার পুলিশের এসপি, প্রিয়াংকা রঘুবংশী নিহতের ভাইকে টাকার লোভ দেখিয়ে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করার জন্য চাপপ্রয়োগ করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে দিনদুপুরে সবার সামনে সংঘটিত এই হত্যাকে সাম্প্রদায়িক কারণে ঘটেছে মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন।
প্রশাসন এখন হত্যাকারীকে মস্তিষ্কবিকৃত দেখিয়ে অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিচার না পেয়ে সাইকুন খানের পরিবার ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে ভারতের রাজধানী দিল্লির জন্তর মন্তরে প্রতিবাদ করতে গেলে সেখানেও তারা পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। (Ref: The Wire, Sep. 26, 2026, Maktoob, 05 Oct 2026) হতভাগ্য সাইকুন খানের নির্মম হত্যা ভারতে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশেষ করে উত্তর ভারতে মুসলমানদের প্রতি এমন নৃশংসতা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসুন এবার নিজেদের প্রশ্ন করি, ভারতে মুসলমানদের প্রতি এমন জুলুম দেখেও আমরা কি যথাযথভাবে প্রতিবাদ করছি? ইসলামপন্থিদের ভূমিকার কথাই শুরুতে উল্লেখ করা দরকার কারণ, তারা যেহেতু ইসলামের নামে রাজনীতি করেন, নানা বিষয়ে ফতোয়া দিয়ে থাকেন, কাজেই উম্মাহ অত্যাচারিত হলে তাদেরই সর্বপ্রথম আওয়াজ তোলা দায়িত্ব। আমাদের দেশে অসংখ্য নামধারী ইসলামি দল থাকলেও কটি দল, কতবার ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে গিয়ে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়েছেন? নির্বাচন এলেই অধিকাংশ ইসলামি দলের নেতারা সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গিয়ে দেনদরবার শুরু করেন। তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই।
একে অপরকে কাফের ফতোয়া দিতেও তাদের সময় লাগে না। আলেমদের মধ্যে যারা নিয়মিত ওয়াজ করেন, তাদের মধ্যেও কতজন ভারতে এবং প্যালেস্টাইনে মুসলমানদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন চলছে, সে সম্পর্কে কথা বলেন? কিংবা বললেও, একটি ওয়াজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্যের মধ্যে উম্মাহ সংক্রান্ত এই জাতীয় আলোচনায় কতখানি সময় ব্যয় করেন? এমনও হতে পারে যে, এসব আলোচনা শুনতে দর্শকদের মধ্যে তেমন উৎসাহ থাকে না।
এসব প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে ‘মারহাবা’ ধ্বনি হয়তো কম পাওয়া যায়, ইউটিউবে ভিউও হয়তো তেমন জোটে না। আমার সাপ্তাহিক মন্তব্য প্রতিবেদনেও আমি লক্ষ করেছি, দেশের রাজনীতি বাদ দিয়ে যে সপ্তাহে প্যালেস্টাইন কিংবা ভারতের মুসলমানদের অসহনীয় বেঁচে থাকা নিয়ে লিখি, সেদিন পাঠকরা কম পড়ে থাকেন এবং ইউটিউবে ভিউও বেশ কমে যায়। তবু আমি নিয়মিত এ বিষয়ে লিখে যাই। আমি মনে করি, সঠিক ও নিয়মিত বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মন পরিবর্তনের চেষ্টাই তো ইসলামি বক্তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। উম্মাহর খেদমত না করলে ইসলামের খেদমত কতটা হতে পারে এ বিষয়ে আলেম সমাজকে চিন্তাভাবনা করতে আহ্বান জানাই।
এবার আসুন রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড খানিকটা বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। আওয়ামী এবং ভারতপন্থি বামদের নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ নেই। ওরা সম্ভব হলে বাংলাদেশের ইসলামি সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আচার সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে এ দেশে ভারতের চেয়েও ভয়ংকর হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতো। আমাদের তরুণরা রক্ত দিয়ে হাসিনাকে উৎখাত না করলে এই দশকের মধ্যেই হয়তো বাংলাদেশে মুসলমানদের ধর্ম পালন ভারতের মতোই বিপজ্জনক হয়ে পড়ত। ইসলামি দলগুলোর ব্যর্থতার কথা আগেই বলেছি।
বাকি রইল বর্তমান ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী বিএনপি, বিরোধী জামায়াতে ইসলামী এবং তরুণদের এনসিপি। এই যে ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল, সেই নির্বাচনে তিন দলের ম্যানিফেস্টোতে কিংবা প্রচারকালে কোনো শীর্ষ নেতার বক্তৃতায় ভারতে মুসলমানদের ওপর অব্যাহত নির্যাতন সম্পর্কে কি কোনো উল্লেখ ছিল? তথাকথিত সেক্যুলার সুশীলরা নিশ্চয়ই তেড়ে এসে আমাকে বলবেন, আরেক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় আমাদের নির্বাচনের ইস্যু কেন হবে? আচ্ছা, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবং কেন্দ্রে কদিন পরপর যে নির্বাচন হয় সেখানে কি পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং এই দেশ দুটিতে হিন্দুদের সার্বিক পরিস্থিতি নির্বাচনের ইস্যু হিসেবে আলোচিত হয় না? কদিন আগের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যুই তো ছিল সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমান এবং বাংলাদেশকে সবক শেখানো।
আমাদের সীমান্তবর্তী রাজ্যটির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার নির্বাচনি প্রচারে অনেকটা সময় বাংলাদেশ নিয়ে আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় ব্যয় করেই এমন ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছেন। কিন্তু, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কিছুতেই তাদের সুশীলত্ব হারাতে রাজি নয়। তাছাড়া, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে এক আজব হীনম্মন্যতা খুঁটি গেড়ে বসে গেছে যে, ভারত অতিমাত্রায় অসন্তুষ্ট হতে পারে এ-জাতীয় বক্তব্য কোনো দল দিলে দিল্লির ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ সেই দলকে নির্বাচনে জিততে দেবে না। এই প্রচারণায় সত্যতা থাকলে, পাশার দান পাল্টে দিয়ে খালেদা জিয়ার পক্ষে ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করা সম্ভব ছিল না।
আমি রাজনীতিবিদ নই, সামান্য জ্ঞানে ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি মাত্র। আমার বিবেচনায় এ বছরের নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগের অবর্তমানে দলটির সমর্থকদের ভোট টানার কৌশল হিসেবেই প্রচারে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থেকেছে। দলটির সেই নির্বাচনি কৌশল যে সার্থক হয়েছে, সেটা বরকতউল্লা ভুলু কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করেছেন।
হিন্দু নেতারাও এই দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সন্তোষের সঙ্গে বলে এসেছেন যে তাদের বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল হয়নি। কিন্তু, জামায়াত এবং এনসিপি মহান জুলাই বিপ্লবের অসামান্য সাফল্যের পরও ভারতীয় আগ্রাসন এবং সে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে কেন অন্যতম প্রধান নির্বাচনি ইস্যু করেনি, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু যে সাহস দেখাতে পেরেছিলেন, সেটা জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপি দেখাতে পারেনি। আমাদের তথাকথিত মূলধারার মিডিয়ার ভূমিকাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আমার দেশ ব্যতীত কয়টি প্রধান পত্রিকার প্রথম পাতায় ভারতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশিত হয়, সেটা পাঠকরা লক্ষ করতে পারেন।
যাহোক, রাজনীতি বাদ রেখে মানবিকতা নিয়ে আলোচনা করে আমার আজকের লেখা শেষ করব। ভারতের হিন্দুত্ববাদী তাত্ত্বিক এবং রাজনীতিবিদরা সে দেশের এক বিপুল সংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ভয়ংকর ইসলামবিদ্বেষী দানব প্রজাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। এই শ্রেণি তাদের হতদরিদ্র জীবনের সব ব্যর্থতা এবং না পাওয়ার বেদনা প্রতিবেশী অসহায় মুসলমানের বিরুদ্ধে এক বিকৃত জিঘাংসা চরিতার্থ করে ভুলতে চায়। তাই কেবল মুসলমান হওয়ার অপরাধে আদিম মানবের মতো পাথর দিয়ে থেঁতলিয়ে একজন নিরপরাধ, অপরিচিত মানুষ হত্যাকে ওরা তথাকথিত সনাতন ধর্মের বিধান বলে বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে কোনো মানবতাবোধ কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের চেতনা কাজ করে না।
ফলে ভারতে প্রকৃত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আমাদের আবু সাঈদের মতো কোনো তরুণ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়ানোর সাহস রাখে না। কিংবা আনাসের মতো কোনো কিশোর ফ্যাসিবাদ উৎখাতের শপথ নিয়ে ঘর ছাড়ে না। তারা একমাত্র মুসলমানের বিরুদ্ধে জুলুমের সুযোগ পেলে রক্তলোলুপ হায়েনার মতো একত্রিত হয়। বাংলাদেশের মতো সামরিক দিক দিয়ে তুলনামূলক দুর্বল এক দেশের জনগণের পক্ষে ভারতের অসহায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সাহায্য করার তেমন কোনো সুযোগ নেই।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ধর্ম-বর্ণ, রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা অন্তত মানুষ হিসেবে ভারতের মুসলমানদের ওপর জুলুমের সাধ্যমতো প্রতিবাদ জানান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ভুয়া ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করুন। এতটুকু মানবতাও না দেখাতে পারলে, সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা, যিনি মানুষকে ‘আশরাফুল মখলুকাত’ ঘোষণা করেছেন, তাঁর কাছে শেষবিচারে দায়ী থাকবেন বলে আমি ভয় পাচ্ছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


