যে ঘরে মায়ের সঙ্গে থাকার কথা, সে ঘরেই যেন অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে প্রবাসী মায়ের সন্তানদের। মায়ের অনুপস্থিতিতে তাদের শৈশব কাটছে দূর দেশে থাকা মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষা আর একাকিত্বের মধ্য দিয়ে। শিশুর মানসিক বিকাশে মায়ের স্নেহ-সান্নিধ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু উন্নত জীবনযাপন ও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার স্বপ্ন নিয়ে অনেক মা পাড়ি জমান বিদেশে। ফলে মায়ের অনুপস্থিতি অনেক শিশুর মনে একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। অসুস্থতা কিংবা স্কুলের অভিভাবক সভায় মাকে পাশে না পেয়ে তারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। অনেক শিশু তাদের অনুভূতি প্রকাশে সংকোচ বোধ করে, আবার অনেকেই বিরক্তি বা অস্থিরতার মাধ্যমে তা প্রকাশ করে। ফলে অনেক শিশুর শৈশব কাটে একাকিত্ব ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে।
তবে শিশুর এই মানসিক সংকট শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রেমিট্যান্সের আড়ালে থাকা এক ভিন্ন বাস্তবতা। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জনের জন্য যখন কোনো পরিবারের একজন সদস্যকে দূরে থাকতে হয়, তখন তৈরি হওয়া একাকিত্ব, যত্নের ঘাটতি ও আবেগীয় চাহিদার বিষয়গুলো টাকার অঙ্কে মাপতে যাই বা টাকা দিয়ে সেই অভাব পূরণ করতে চেষ্টা করি, তখন তাকে একাকিত্বের অর্থনীতি বলা হয়।
প্রবাসী মায়েদের পাঠানো অর্থ যেমন পরিবারের আর্থিক সমস্যা দূরীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, তেমনি মায়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতি সন্তানের মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারি (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখের বেশি নারী জীবিকার তাগিদে দেশ ছাড়ছেন। যাদের একটি বড় অংশই বিবাহিত ও সন্তানসম্পন্ন মা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী পুরুষকর্মীদের তুলনায় নারী কর্মীরা তাদের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই দেশে পাঠিয়ে দেন। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো রেমিট্যান্স গ্রহণ করে জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। প্রবাসী মায়ের পাঠানো অর্থ দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ, পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ে। তাদের পাঠানো অর্থে বাড়িঘর নির্মাণ ও ছোট ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। এর ফলে স্থানীয় বাজারগুলোতে কেনাবেচা বাড়ে।
প্রবাসী নারী অথবা পুরুষ বৈধভাবে অর্থ পাঠালে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ে। এই অর্থ দেশের আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রার খাতে স্থিতিশীলতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
অন্যদিকে, মায়েরা জীবিকার তাগিদে বিদেশে গেলে তাদের সন্তানদের ওপর মানসিক চাপ পড়তে পারে। মায়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে শিশু একাকিত্ব ও পড়াশোনায় অমনোযোগের শিকার হতে পারে। এই একাকিত্ব দমন করতে গিয়ে শিশুরা খুব সহজেই কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া এবং মাদকের মতো মরণব্যাধিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। আবার, সঠিক তদারকির অভাবে মায়ের পাঠানো অর্থ সন্তানের প্রয়োজনে যথাযথভাবে ব্যয় না-ও হতে পারে, যা শিশুর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি পরিবারে অস্থিরতা, সমাজে নানা সমস্যা এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই এ সমস্যাগুলোর সমাধানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, মা বিদেশে থাকলে সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের শিশুর প্রতি যত্নশীল হতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী মায়ের সন্তানদের একটি সুনির্দিষ্ট ডেটাবেস তৈরি করতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দিতে হবে এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে শিশুদের উচ্চশিক্ষা ও সুরক্ষার বিশেষ সঞ্চয় প্রকল্প চালু করা প্রয়োজন, যেন তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। পঞ্চমত, দেশে নারীদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের সুযোগ বাড়াতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক দিকটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিশুদের মানসিক সুস্থতা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী মায়েদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, তাদের সন্তানদের যেন শৈশব ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রবাসী মায়েদের অর্থনৈতিক অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের সন্তানদের সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি একটি মানবিক ও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

