ককটেল নামের একটি কার্টুন পত্রিকা পাওয়া যেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৮০-এর দশকে। তার কোনো এক সংখ্যার স্টোরিতে দেখা যায়, স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ ছাত্রদের সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে বলছেন, ‘তগো লিগা আমি আরো হল বানাইয়া দিমু, ডাইনিং অ্যালাউন্স দিমু... খালি তোরা আমারে একটা বার জিন্দাবাদ ক।’
পরক্ষণেই শুরু হয় প্রতিবাদকারীদের ধাওয়া; আতঙ্কিত এরশাদ দৌড়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান উত্তরপাড়ায়।
ককটেলের প্রচ্ছদ ও বর্ণনা অনুসারে, এই ব্যাপারটি ঘটেছিল একনায়কের মনে মনে। ১৯৯০-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে পতিত এরশাদের ভারতে রাজনৈতিকভাবে পালিত ‘বোন’ শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে কিন্তু গণধাওয়াটি সত্যে পরিণত হয়, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঐতিহাসিক দিনে।
ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার বলছে, তিনি আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু এবার তিনি কী উপহার দেবেন দেশবাসীকে? কারণ তার হাত তো একেবারেই খালি! তার কারণ, তার ভান্ডারে থাকা প্রায় সব ভালো কথাই বলে ফেলেছেন ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফেরার পর ২০০৮-এর নির্বাচন পর্যন্ত। খারাপ কাজ করারইবা বাকি আছে কতখানি?
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে তার বাবা শেখ মুজিবের আওয়ামী-বাকশালী অপশাসনের জন্য ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে হাসিনা ইনিয়ে-বিনিয়ে ক্ষমা চেয়ে একটিবার ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ চান। ২০০৮-এর নির্বাচনি ইশতেহারে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন, চূড়ান্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়নসহ প্রতিশ্রুতি দিতে বাকি রাখেননি তেমন কিছুই!
হাসিনার শাসনামলে, তার নিজের ভাষায়, তিনি নেওয়ার চেয়ে বেশিই দিয়েছেন ভারতকে এবং তার যে গভীর বিশ্বাস ছিল গ্রহীতা তাকে ভুলবে না, সেই প্রমাণ মেলে ভারতে তার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে। অবশ্য দেড় দশকে হাসিনা বাংলাদেশের মানুষকেও দিয়েছেন অনেক কিছুই—শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার, বৃহত্তম সাইবার ডাকাতি ও শিল্প (রানা প্লাজা) দুর্ঘটনা, প্রায় সব খাতে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, গুম, খুন, গণহত্যার রেকর্ড, ভিন্নমত দমনে জিরো টলারেন্স এবং জনগণকে ভোট দেওয়ার ঝামেলা থেকে চিরতরে মুক্তি প্রদান।
যাই হোক, একটি ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ পেছনে ফেলে হাসিনা ও তার দল কি ক্ষমা চাওয়া এবং বদলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?
যেহেতু হাসিনা একজন রাজনীতিক এবং হোক নিষিদ্ধ, তবু সেই দল আওয়ামী লীগের তিনিই সভানেত্রী, তাই তার এবং দলের মতাদর্শ বা সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন জনগণকে জানানোর প্রাসঙ্গিকতা থাকে, যদি তা করা হয়। ফ্যাসিবাদী শাসনের সপক্ষে তিনি এবং তার লোকরা যে বৈধতা উৎপাদন করেছেন, সে হিসেবে তিনি এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ভাবতেই পারেন, অন্তত নিজস্ব চামচাদের গণ্ডিতে।
তবে তার জন্য মুশকিলের ব্যাপার হলো, বিপ্লবের ম্যান্ডেটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ী একটি রাজনৈতিক দল এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। সুতরাং শেখ হাসিনা বিনা বিপত্তিতে দেশে ফিরতে চাইলে হয় তাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে হবে, না হয় রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে এবং বিএনপি সরকার, জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী দলের রাজনৈতিক আনুকূল্য নিয়ে গণতান্ত্রিক ধারায় নতুন করে যুক্ত হতে হবে।
‘কেন?’ বলে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা গর্জে উঠতেই পারেন। উত্তর : তিনি ও তার দল গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, এমন প্রমাণ জোগাড় করা আজ আর সহজ নয়। ১৯৭২-৭৫-এর শাসনামলে আওয়ামী লীগ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থায় বিলুপ্ত হয় দলটি। ১৯৯৬-এ ক্ষমতায় এসে দলীয়করণ ও সন্ত্রাস ছাড়াও গণভবন হাসিনার নামে লিখে নেওয়া হয়। ২০০৮-এ নির্বাচন জয় করে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত ও জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে এবং জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অবশেষে গণরোষে বিদায় নেয়।
সে ক্ষেত্রে তার দলের নীতি-আদর্শ কী দাঁড়াচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের নতুন কোনো ধারণা নেই। দেশের বাইরে ও ভেতরে যারা মনে করেন এবং বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার আছে এবং এর আনুমানিক দুই কোটি কর্মী-সমর্থক-ভোটার কোথায় যাবে, দলটির সব কৃতকর্মের দায় বোধ হয় নিচ্ছেন তারাও। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যে দলটিকে বলা হচ্ছে মাফিয়া, ফ্যাসিবাদী ও অলিগার্কিক্যাল, সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীর ব্যাখ্যা ও নৈতিক অবস্থান ধোঁয়াশা বা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে ভরা।
তাদের অনেকের কাছেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যায় এমন সত্য অগ্রাহ্যই থেকে যায়। ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের জোরে বিদায় করা এবং দলটিকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অগণতান্ত্রিক কাজের জন্য জায়গা না দেওয়ার বিষয়ে সব পর্যায়ে এক জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত আছে। যে প্রায় আট কোটি বাংলাদেশি ২০২৬-এর নির্বাচনে ভোট দিয়েছে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দলকে, তাদের ভোটাধিকার রহিত করে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
চলমান বাস্তবতায় বিবেকবান মানুষ এবং গণতান্ত্রিক অ্যাক্টিভিস্টদের উচিত নির্বাচনি রাজনীতিতে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা আছে কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দাবি করা। দলটি এবং এর নেতাকর্মীরা এখন সাইবার জগতের বাসিন্দা; তাই আগামীতে রাজনীতি ও ক্ষমতায় এলে যেসব কর্মসূচি নিতে পারে, সেই ইশতেহারের মানবিকভাবে প্রস্তুত করা একটি খসড়া পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা যেতেই পারে—
‘নির্বাচনভিত্তিক বর্তমান সরকারব্যবস্থা যেহেতু হাসিনার ২০১৪-২৪ ক্ষমতাকালকে অবৈধ গণ্য করছে, তাই এটি ভেঙে তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আওয়ামী ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানো হবে।
জুলাই বিপ্লবী নেতৃত্ব এবং বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী জনতাকে জঙ্গি আখ্যা দেওয়া এবং আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করা শক্তিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
প্রজাতন্ত্রের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী হাসিনা সরকারকে রক্ষা করতে ব্যর্থ কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করেছে, ২০২৬-এর নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আনুগত্য প্রকাশ করেছে, তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী আওয়ামী লীগের চেতনাকে আঘাত করার যেকোনো উদ্যোগের প্রতি শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করা হবে। একই সঙ্গে, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের মতাদর্শের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য আছে—এমন ব্যক্তিদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হবে।
সংসদ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমকে শেখ হাসিনার উন্নয়ন যুগের সংস্কৃতিতে আবার দীক্ষিত করা হবে। শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিকল্পহীন, উচ্চতম এবং অপরাজেয় ইমেজ, তাদের মান্য-গণ্য করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
মানুষের ভোগবিলাস, ইউটিলিটি সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের যেকোনো উপায়ে সর্বোচ্চ লাভের প্রণোদনা দেওয়া হবে। সরকারের নীতি, পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিষ্কণ্টক করতে নীতিনির্ধারক, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুম-খুন, ঘুস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ এ জাতীয় অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে।
বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের করদরাজ্য বানানো হয়েছে—এ রকম অভিযোগ আনা দেশদ্রোহী বলে গণ্য হবে এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ককে পররাষ্ট্রনীতির এক নম্বর এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করা হবে।’
আওয়ামী নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কী নীতিকৌশল নিতে পারে, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) জিজ্ঞেস করেও সৃজনশীল কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়নি, কারণ মেশিন হাসিনাদের মনের খবর রাখে না। তবে রেকর্ডের ভিত্তিতে এআই বলে দিয়েছে তাদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার গড়মিলগুলো, যেগুলো আমাদেরও জানা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম কিন্তু অনুমান করতে পারে, আবার রাজনীতি করার সুযোগ পেলে আওয়ামী মন কী কী এজেন্ডা নিয়ে এগোতে চাইবে।
লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
khawaza@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



