পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বর্তমান বাস্তবতা

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বর্তমান বাস্তবতা

পার্বত্য চট্টগ্রাম—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—বাংলাদেশের অন্যতম কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এই এলাকা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, জাতিগত বৈচিত্র্য, অমীমাংসিত ভূমিবিরোধ, একাধিক সশস্ত্র সংগঠন, আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান এবং সংঘাতপূর্ণ মিয়ানমারের নৈকট্য—সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি কোনো আঞ্চলিক প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ সমস্যার শিকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। ষাটের দশকের গোড়ায় কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি পানির নিচে চলে যায় এবং প্রায় এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যাদের অধিকাংশ ছিলেন চাকমা জনগোষ্ঠীর। অনেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাননি এবং হাজার হাজার মানুষ ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও ভূমির অধিকার নিয়ে মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং এর সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীর উত্থান ঘটে। প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতে বহু মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, বাঙালি অধিবাসী ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি প্রধান সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্রধারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে। চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি অথবা শক্তিশালী করা হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন, কারণ এর মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও শান্তির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। ভূমির মালিকানা, স্থানীয় পরিষদের ক্ষমতা ও নির্বাচন, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন গড়ে উঠেছে। জনসংহতি সমিতির ভাঙনের পাশাপাশি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট—ইউপিডিএফ এবং এর বিভিন্ন অংশ নিজেদের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র কাঠামো তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানের কিছু এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টÑকেএনএফ এবং এর সশস্ত্র শাখার উত্থান নতুন নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্র লুট ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় কেএনএফের কথিত সংশ্লিষ্টতা দেখিয়েছে যে সীমিত ভৌগোলিক এলাকায় সক্রিয় একটি সংগঠনও জাতীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

চাঁদাবাজি, অপহরণ, গোষ্ঠীগত হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ কর আদায়ের কারণে ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, ঠিকাদার ও সাধারণ গ্রামবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠন বিশেষ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও তাদের সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সেই জনগোষ্ঠীর মানুষেরই স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, জীবিকা ও নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে। অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে মতামত দিতে বা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মিয়ানমারের সংঘাত এ পরিস্থিতিতে আরো বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে। রাখাইন ও চীন রাজ্যে যুদ্ধ, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান শক্তি, জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং অবাধ অস্ত্রপ্রবাহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে একটি অস্থিতিশীল রণসীমায় পরিণত করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্গম বনাঞ্চল, পাহাড়ি পথ এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে বিস্তৃত জাতিগত এবং পারিবারিক যোগাযোগকে কাজে লাগাতে পারে। মাদক—বিশেষ করে ইয়াবা ও মেথামফেটামিনÑছোট অস্ত্র, চোরাই পণ্য এবং মানব পাচারের পথগুলোও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি স্থানীয় ঘটনা খুব দ্রুত আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা-সংকটে রূপ নিতে পারে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতাকে বিদেশি শক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকা, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য যোগাযোগ করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। আন্তর্জাতিক অধিকার সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তঃসীমান্ত জাতিগত নেটওয়ার্ক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—সব পক্ষেরই এ অঞ্চলের ঘটনাবলির প্রতি আগ্রহ থাকতে পারে। এর কিছু মানবিক সহায়তা বা মানবাধিকারের বৈধ উদ্বেগ থেকে পরিচালিত হতে পারে; আবার কিছু তৎপরতার উদ্দেশ্য হতে পারে স্থানীয় সংগঠনকে প্রভাবিত করা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগানো অথবা ঢাকাকে কূটনৈতিক চাপে রাখা। তবে সরকারকে প্রমাণিত বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অনুমাননির্ভর অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। বিদেশি অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কিংবা নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। পাহাড়ি জনগণের প্রতিটি দাবি বা অভিযোগকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করলে নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং প্রকৃত বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ আরো প্রসারিত হবে। আবার সব নিরাপত্তা-আশঙ্কাকে প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। প্রয়োজন পেশাদার প্রতিগোয়েন্দা তৎপরতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্বচ্ছ তদন্ত।

অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ অমীমাংসিত থাকলেই বিদেশি পক্ষগুলো তা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। ভূমিবিরোধ, দুর্নীতি, দুর্বল স্থানীয় শাসন, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং সংস্কৃতি অবজ্ঞার ধারণা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে সেসব ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু গোপনীয়তা বা শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা প্রত্যেক নাগরিককে সমানভাবে সুরক্ষা দেয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন সড়ক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়, তখন সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারে না।

এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সীমান্ত নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদকের পথ বন্ধ এবং সশস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ প্রতিরোধ করতে হবে। অভিযান হতে হবে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনের সীমার মধ্যে। সামষ্টিক শাস্তি, নির্বিচার আটক কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে হয়রানি করা অন্যায় এবং কৌশলগতভাবেও ক্ষতিকর। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের পাশাপাশি সেখানে নিয়োজিত সদস্যদের স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, মানবাধিকার ও সংঘাত-সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকারকে একটি স্থায়ী জাতীয় সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় পরিষদ এবং সব সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন। এই কাঠামো সশস্ত্র সংগঠন, সীমান্তপথ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অর্থায়ন, ভূমিবিরোধ এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা সম্পর্কে সমন্বিত মূল্যায়ন করবে। সীমান্ত নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও দ্রুত চলাচলের সক্ষমতা দরকার; তবে প্রযুক্তি কখনো মানব গোয়েন্দা তথ্য এবং জনগণের আস্থার বিকল্প হতে পারে না। শান্তিচুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে সরকারকে প্রকাশ করতে হবেÑকোনগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনগুলো অসম্পূর্ণ এবং কোনগুলোতে আইনগত ব্যাখ্যা বা সংশোধন প্রয়োজন। এরপর একটি সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন-রোডম্যাপ প্রণয়ন করা উচিত। গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকার ভিত্তিতে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। ভূমি কমিশনকে পর্যাপ্ত জনবল, অর্থ, কার্যকর বিধিমালা, আধুনিক জরিপ, ডিজিটাল রেকর্ড এবং ভুয়া দাবি প্রতিরোধের ক্ষমতা দিতে হবে। ভূমিবিরোধের সমাধান জাতিগত উত্তেজনা বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়; আইন, দলিল, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে।

সরকার, শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারী পক্ষ, চুক্তিবহির্ভূত রাজনৈতিক সংগঠন, নারী, যুবক, প্রথাগত নেতা, বাঙালি অধিবাসী এবং তুলনামূলক ছোট পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। তবে সংলাপের অর্থ সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া নয়। যেসব সশস্ত্র সংগঠন সহিংসতা ত্যাগ, অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ এবং সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে অংশ নিতে রাজি হবে, তাদের জন্য যাচাইযোগ্য পুনর্বাসনের পথ রাখা যেতে পারে। যারা হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কিন্তু আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নয়নকে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু সড়ক ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই শান্তি আসবে না, যদি স্থানীয়রা বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় থাকে কিংবা উন্নয়নের সুফল না পায়। বাংলা, ইংরেজি ও উপযুক্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা, দুর্গম এলাকায় আবাসিক বিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, টেলিমেডিসিন, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত পর্যটন জীবিকা ধ্বংস এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং মিয়ানমার সীমান্তের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি, যাতে কোনো সশস্ত্র সংগঠন প্রতিবেশী ভূখণ্ডকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। সহযোগিতার ক্ষেত্র হবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার এবং অপরাধীদের প্রত্যর্পণ। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের নীতিনির্ধারিত হবে ঢাকায় এবং ওই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে।

সরকারকে দুটি বিপজ্জনক ধারণা পরিহার করতে হবে—একটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা; অন্যটি হলো, নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন নেই এবং শুধু ছাড় দিয়েই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। টেকসই শান্তির জন্য রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ন্যায়বিচার—উভয়ই দরকার। বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে সীমান্ত ও ভূখণ্ড রক্ষা, সশস্ত্র গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ অভিযোগের সমাধান, সমান নাগরিক মর্যাদা, বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার পূরণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে কখনো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা সরকারের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। পাহাড়ের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক; তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমৃদ্ধি দেশের সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে রাষ্ট্র সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে শক্তিশালী, আইন মানতে সংযত এবং মানুষের অভিযোগ সমাধানে আত্মবিশ্বাসীÑসেই রাষ্ট্রই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে শান্তি, যোগাযোগ ও সমৃদ্ধির সেতুতে রূপান্তর করতে পারবে।

hrmrokan@hotmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন