বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় অতিক্রম করছে। শিল্প, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল, তথ্যপ্রযুক্তি—প্রতিটি খাতেই প্রবৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা এখনো স্পষ্ট—আমাদের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) কার্যক্রম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তব চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে গবেষণা হচ্ছে, প্রবন্ধ প্রকাশ হচ্ছে; কিন্তু সেই জ্ঞান শিল্প, খামার, কারখানা কিংবা বাজারে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারছে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন সময় এসেছে গবেষণাকে জ্ঞান উৎপাদন থেকে সমস্যা সমাধান এবং অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির দিকে পুনর্গঠন করার।
বাংলাদেশে আরঅ্যান্ডডি খাতে বিনিয়োগ এখনো খুবই সীমিত—জিডিপির এক শতাংশেরও অনেক কম (আনুমানিক শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের নিচে)। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, বেলজিয়াম, ভারত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বিনিয়োগ করে এবং সেই বিনিয়োগকে শিল্পোৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও রপ্তানিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের দেশে শুধু বরাদ্দ কম নয়, বরং বরাদ্দের কার্যকারিতাও সীমিত। অধিকাংশ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ, যেখানে শিল্প খাতের সম্পৃক্ততা দুর্বল এবং গবেষণার ফল বাণিজ্যিক পণ্য বা সেবায় রূপ নেয় না।
বাস্তবমুখী গবেষণা বলতে এমন গবেষণাকে বোঝায়, যা সরাসরি মানুষের সমস্যা সমাধান করে এবং অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি হতে পারে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফাইবার উদ্ভাবন, এআই ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি কিংবা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম। একইভাবে পরিবেশবান্ধব কনস্ট্রাকশন মেটেরিয়ালস খাতে কম খরচে টেকসই নির্মাণ উপকরণ, ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত উপাদান তৈরি, জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন এবং ভ্যাকসিন উন্নয়নে গবেষণা—এসব ক্ষেত্র সরাসরি জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশে গবেষণা বাস্তবমুখী না হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব অন্যতম। গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যাল, নির্মাণ বা খাদ্যশিল্প—এসব খাতের বাস্তব চাহিদা অনেক সময় গবেষণার এজেন্ডায় প্রতিফলিত হয় না। ফান্ডিং কাঠামো প্রকল্পভিত্তিক হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণে ধারাবাহিকতা থাকে না। পাশাপাশি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম দুর্বল হওয়ায় গবেষণার ফল উদ্যোক্তা উদ্যোগে রূপ নিতে পারে না এবং স্পিন-অফ কোম্পানি গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত থাকে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সফল দেশগুলো গবেষণাকে সরাসরি শিল্প ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে; দক্ষিণ কোরিয়া টেক্সটাইল ও ইলেকট্রনিক্স খাতে গবেষণা-নির্ভর শিল্প গড়ে তুলেছে, চীন এআই, ডেটা ও নির্মাণ প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে, আর ইসরাইল বায়োটেক, ভ্যাকসিন ও ন্যানো প্রযুক্তিতে স্টার্টআপ ও স্পিন-অফ কোম্পানির মাধ্যমে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট—গবেষণাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে তা অবশ্যই শিল্পমুখী ও উদ্যোক্তাবান্ধব হতে হবে, যা চূড়ান্তভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন করবে, তেমনি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আগ্রহ সৃষ্টি করবে।
গবেষণার চূড়ান্ত মেধাস্বত্বের বাস্তব প্রয়োগে স্টার্টআপ ও স্পিন-অফ কোম্পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; গার্মেন্টস খাতে স্মার্ট ফ্যাক্টরি সল্যুশন, টেক্সটাইল রিসাইক্লিং প্রযুক্তি, এআই-ভিত্তিক কোয়ালিটি কন্ট্রোল সিস্টেম, কিংবা ডেটা-চালিত সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট—এসব উদ্ভাবন সহজেই স্টার্টআপ রূপ নিতে পারে। বায়োটেক ও ভ্যাকসিন গবেষণা থেকে স্পিন-অফ কোম্পানি তৈরি হয়ে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে শক্তিশালী করতে পারে। কনস্ট্রাকশন মেটেরিয়ালস, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য ও অপ্রচলিত পণ্যের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার বিস্তৃতির ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা রয়েছে।
বাস্তবমুখী আরঅ্যান্ডডি গড়ে তুলতে হলে কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। জাতীয় অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করে চাহিদাভিত্তিক গবেষণা পরিকল্পনা করতে হবে, যেখানে গার্মেন্টস, এআই, ডেটা, পরিবেশ, নির্মাণ, বায়োটেক ও খাদ্যনিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদার করে যৌথ গবেষণা প্রকল্প চালু করতে হবে এবং শিল্প খাতকে গবেষণায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে কর-সুবিধা দিতে হবে। ফলাফলভিত্তিক রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরঅ্যান্ডডি) ফান্ডিং চালু করে স্টার্টআপ ও স্পিন-অফ কোম্পানির জন্য আলাদা তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইনকিউবেশন ও এক্সেলারেশন সেন্টার গড়ে তুলে গবেষকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যা স্পিন-অফ কোম্পানিতে রূপ নেবে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে দেশে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস (টিটিও) গঠন করা প্রয়োজন, যা পেটেন্ট, লাইসেন্সিং ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করবে। স্পিন-অফ কোম্পানি গঠনের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে গবেষকরা তাদের উদ্ভাবনের মালিকানা ও আর্থিক সুবিধা পান। বর্তমান বিশ্বস্বীকৃত এ ধরনের মেধা-বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে উঠলে গবেষণা কাগজ থেকে বের হয়ে বাস্তব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারবে এবং বিদেশ থেকে বিদেশি অংশীদারভিত্তিক স্টার্টআপ বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, অপ্রচলিত পণ্য ও উদ্ভাবনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন—যেমন বিকল্প প্রোটিন, হেলথ-ফোকাসড ফুড যেমন প্রোবায়োটিকস ও প্রিবায়োটিকসের ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং, কিংবা ন্যানো-ভিত্তিক কৃষি ইনপুট ও ভেষজ পণ্য। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও ভ্যাকসিন উন্নয়ন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত, যা দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেবে।
বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাস্তবতায় বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে আমরা কতটা গবেষণাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তার ওপর। শুধু গবেষণা খাতে অপরিকল্পিত বাজেট বৃদ্ধি নয়, বরং সঠিক দিকনির্দেশনা, শিল্প খাতের সম্পৃক্ততা এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে গবেষণাকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ রূপ দিতে হবে। গবেষণা যদি মানুষের জীবনে পরিবর্তন না আনে, তবে তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু যখন গবেষণা থেকে স্টার্টআপ সৃষ্টি হয় এবং প্রতিশ্রুতিশীল স্পিন-অফ কোম্পানি গড়ে ওঠে, তখনই তা অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়—এটাই উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিশ্ববাস্তবতা। বাংলাদেশের এখন সময় এসেছে গবেষণাকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, জনস্বার্থ, অর্থনীতি ও টেকসই সমৃদ্ধির প্রাথমিক ভিত্তিতে রূপান্তর করার।
লেখক : গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

