বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংকটের কেন্দ্রে একটি নির্মম সত্য কথা হলো—এই রাষ্ট্র কখনোই জনগণের পক্ষে আপসহীনভাবে কাজ করেনি। ‘কেন করেনি’-এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আদৌ কি এই রাষ্ট্রকে কখনো জনগণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সরাসরি তাকাতে হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মগত কাঠামো এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের দিকে।
১. কাঠামোগত সংকট
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র, আইনব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার। ব্রিটিশরা যে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়; বরং তাদের নিয়ন্ত্রণ, দমন এবং শোষণ। এই ব্যবস্থায় মানুষ ছিল ‘সাবজেক্ট’ বা প্রজা। নাগরিক হিসেবে তাদের কোনো মর্যাদা বা অধিকার ছিল না। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীনতার পরও, রাষ্ট্রের পতাকা বদলেছে, সংবিধান বদলেছে কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের ডিএনএ বদলায়নি। সেই একই নিয়ন্ত্রণমুখী মানসিকতা, একই কর্তৃত্ববাদী কাঠামো নতুন রূপে টিকে আছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে প্রতিষ্ঠান একবার গড়ে উঠলে তা নিজস্ব স্বার্থে টিকে থাকতে চায় এবং একই ধারায় এগোয়, যতক্ষণ না কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকম্প এসে সেটিকে ভেঙে চুরমার করে। বাংলাদেশে সেই ভাঙন কখনো ঘটেনি। ফলে ঔপনিবেশিক ‘নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্র; আজও ‘সেবার রাষ্ট্র’ হয়ে উঠতে পারেনি। এ ধরনের রাষ্ট্রকে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সরাসরি ‘শোষণকেন্দ্রিক’ বা ‘লুটপাটভিত্তিক’ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে রাষ্ট্রের মূল কাজ জনগণের ক্ষমতায়ন নয়, বরং সম্পদ আহরণ এবং ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখা। বাংলাদেশে এটি একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
এখানে একটি শক্তিশালী ‘এলিট কোয়ালিশন’ গড়ে উঠেছে, যেখানে আমলাতন্ত্র, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর এক অস্বচ্ছ জোট যারা মিলিতভাবে এক ধরনের ‘ডিপ স্টেট’ নির্মাণ করেছে। এই কাঠামো দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকে প্রকৃত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। এই ‘ডিপ স্টেট’ কাজ করে প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারিত হয় জনস্বার্থে নয়; বরং এলিট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করতে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন তার নিরপেক্ষ চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ার হয়ে উঠতে। তৃতীয়ত, ব্যবসা ও রাজনীতির অস্বচ্ছ আঁতাত একটি ‘রেন্ট-সিকিং’ বা প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায়ের অর্থনীতি তৈরি করে, যেখানে উৎপাদন নয়, প্রভাবই স্বার্থ লাভের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। আর এর ফলে সাধারণ নাগরিক আর অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি থাকে না সে পরিণত হয় রাষ্ট্রের দরবারে দাঁড়িয়ে থাকা এক ‘অনুগ্রহপ্রার্থী’ সত্তায়।
বাংলাদেশের সংকট তাই শুধু কাঠামোগত নয়; এটি মানসিক চিন্তায়ও। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে জন্ম নেওয়া ‘শাসক মানসিকতা’ এখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে প্রবল, যেখানে কর্মকর্তারা নিজেদের জনগণের সেবক না ভেবে শাসক হিসেবে কল্পনা করেন। ফলে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহি না হয়ে উল্টো তাদের ওপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়। গণতান্ত্রিক তত্ত্ব বলে, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় চিত্রটা উল্টো এখানে জনগণই ক্ষমতাহীন এবং প্রায় অদৃশ্য।
২. বাংলাদেশের কোনো ভিশন নেই
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গভীর সংকটগুলোর একটি হলো—এর কোনো সুস্পষ্ট ভিশন নেই, কোনো সম্মিলিত স্বপ্ন নেই। সফল রাষ্ট্রগুলো এই সত্যটি বোঝে বলেই তারা নিজেদের নাগরিকদের সামনে একটি স্পষ্ট ‘জাতীয় ভিশন’ তুলে ধরে। যেমন : যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান ড্রিম’, যেটি জনগণের জন্য একটি জাতীয় স্বপ্ন, যা অর্থনীতি, শিক্ষা এবং রাজনীতিকে চালিত করা এক ধরনের সামাজিক চুক্তি। তেমনি চীন, জাপানসহ অনেক রাষ্ট্র নিজেদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে কোনো সুসংহত ‘বাংলাদেশি ড্রিম’ বলতে কিছু নেই। রাষ্ট্র কোথায় যেতে চায়, নাগরিকদের কী প্রতিশ্রুতি দেয়, কী ধরনের সমাজ গড়তে চায়—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো পরিষ্কার, সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর নেই। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা দূরদর্শী পরিকল্পনার পরিচালিত না হয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতার হিসাবনিকাশে চলে। যদিও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; এটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন সমাজের কল্পনা। সেটিই হতে পারত একটি শক্তিশালী ফাউন্ডিং ভিশন। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই স্বপ্নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়নি। ১৯৭২ সালের সংবিধান নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘস্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় চুক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির ব্যাখ্যা ও স্বার্থের সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে সংবিধান ‘রুলস অব দ্য গেম’ (খেলার নিয়ম)’ হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে ‘পলিটিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট (রাজনৈতিক হাতিয়ার)’-এ রূপ নিয়েছে।
৩. নেতৃত্বের সংকট
বাংলাদেশের সংকট শুধু প্রতিষ্ঠানগত নয়; এটি এক গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বের সংকট। জনগণের প্রত্যাশা আছে, ত্যাগ আছে, সম্ভাবনা আছে কিন্তু সেই শক্তিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো নেতৃত্ব নেই। বাংলাদেশের নেতৃত্ব নীতিকেন্দ্রিক না হয়ে হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। যেখানে দক্ষ, সৎ এবং স্বাধীনচিন্তার মানুষ রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারে না, সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট নেটওয়ার্কে (পৃষ্ঠপোষকনির্ভর সম্পর্কের জাল) । এখানে যোগ্যতা নয়, আনুগত্যই টিকে থাকার কৌশল। ফলে নেতৃত্বের স্বাভাবিক পুনর্গঠন, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য, তা বারবার থেমে যায়, বাধাগ্রস্ত হয়, বা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—নেতৃত্ব জনগণের কাছে জবাবদিহি হওয়ার বদলে উল্টো জনগণকেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
জুলাই-পরবর্তী মুহূর্ত ও গণভোটের রাজনীতি
৫ আগস্টের জুলাই-উত্তর প্রেক্ষাপট এক বিরল ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করেছিল একটি পুরোনো, অকার্যকর রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে নতুনভাবে রাষ্ট্র গড়ার সুযোগ। তখন প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয়েছিল একটি স্পষ্ট লক্ষ্য : জনগণের জন্য রাষ্ট্র, ক্ষমতার জন্য নয়। এই মুহূর্তে একটি পরিবর্তনশীল প্রকল্প সামনে আসে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন, আইন বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলা এবং নিয়োগব্যবস্থাকে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করা। ‘ক্ষমতা নয়, জনতা’—জুলাইয়ের এই স্লোগান শুধু প্রতিবাদের ভাষা ছিল না; এটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। এই লক্ষ্য সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার সব রাজনৈতিক শক্তির ঐকমত্যে ‘জুলাই সনদ’ এবং একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর প্রস্তাবনা তৈরি করে। এর বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ—প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার—সমর্থন জানায়। এটি শুধু একটি ভোট ছিল না; এটি ছিল নতুন বাংলাদেশের পথে যাত্রার গণসম্মতি। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা, যা পরে নির্বাচিত সরকার সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে—এই প্রত্যাশা নিয়েই তারা দায়িত্ব হস্তান্তর করে।
অন্তর্বর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করবে। সেভাবে গণভোটে সমর্থন আদায়ে শীর্ষ নেতৃত্ব সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালায়—জনগণকে আশ্বস্ত করা হয় যে, এবার পরিবর্তন বাস্তব হবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর চিত্র পাল্টে যায়। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার পর এখন সেই গণভোটকেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে অবৈধ বলা হচ্ছে। এই অবস্থান শুধু রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নয়; এটি সরাসরি প্রতিশ্রুতির বিপরীত একটি স্পষ্ট দ্বিচারিতা।
এর সঙ্গে আরো অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। যে রাজনৈতিক শক্তি ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের পক্ষে দাঁড়িয়ে জনসমর্থন অর্জন করেছে, ক্ষমতায় এসে হঠাৎ তার অবস্থান কেন পাল্টায়? কী এমন ঘটল যে, সে নিজের ঘোষিত অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করল? এটি কি শুধু রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ফল, নাকি এর পেছনে কাজ করছে আরো গভীর, অদৃশ্য কোনো চাপ বা স্বার্থের বলয়? বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অবস্থান পরিবর্তন শুধু নীতিগত বিচ্যুতি নয়; এটি দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি আঘাত হানে। বিএনপির এই অবস্থান কি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি এটি বৃহত্তর কোনো ক্ষমতা-ব্যবস্থার চাপের ফল?
কোনো সন্দেহ নেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী অংশ নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এড়াতে এবং স্বার্থ হারানোর আশঙ্কায় পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব বিস্তার করছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, এমনকি জনমতকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এর ফলে শুধু একটি দল নয়, পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই চাপে পড়ে গেছে এবং জনগণের ভেতরে ক্ষোভ ও হতাশার পারদ বাড়ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একক দলের নয়; সমস্যাটি সেই গভীরভাবে প্রোথিত ক্ষমতাকাঠামো, যা পরিবর্তনের প্রতিটি প্রচেষ্টাকে শোষণ করে, বিকৃত করে, অথবা শেষ পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এই কাঠামো এমনভাবে কাজ করে যে, নতুন শক্তি ক্ষমতায় এলেও ধীরে ধীরে তাকে পুরোনো নিয়মেই খেলতে বাধ্য করা হয়। ফলে প্রশ্নটা আর শুধু ‘কে ক্ষমতায়’—তা নয়; বরং ‘কী ধরনের ক্ষমতা কার্যকর’ এটাই হয়ে ওঠে মূল প্রশ্ন। যত দিন পর্যন্ত এই অদৃশ্য কিন্তু প্রভাবশালী ক্ষমতাকাঠামো না ভাঙা যাবে, তত দিন একই চক্র চলতেই থাকবে—প্রতিশ্রুতি, আশা, ক্ষমতা, বিচ্যুতি এবং অবশেষে হতাশা।
লেখক : একাডেমিক ডিরেক্টর, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশনাল স্টাডিজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

