আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জ্বালানি সংকটে ভাঙছে জোট : রাশিয়ামুখী ভারত

সানা খান

জ্বালানি সংকটে ভাঙছে জোট : রাশিয়ামুখী ভারত

ইরান যুদ্ধ দ্রুত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও কূটনৈতিক জোটের বিন্যাসে পরিবর্তন আনছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের নতুন করে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এই পরিবর্তনের অন্যতম স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেটাকে ওয়াশিংটনের প্রতি ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা সম্পর্ক বলে মনে হচ্ছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে কেন্দ্র করে তা এখন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্কের দিকে মোড় নিচ্ছে।

ভারত যে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আবারও জোরদার করছে, তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তারা দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দিয়েছে গত ২৭ মার্চ। এসব সমরাস্ত্রের মধ্যে যুদ্ধবিমান, এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সশস্ত্র ড্রোন, ট্যাংকবিধ্বংসী গোলাবারুদসহ বিভিন্ন ধরনের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের সঙ্গে গত বছর যুদ্ধের পর ভারত তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ নিয়েছে। একই লক্ষ্যে গত মাসে ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফাল যুদ্ধবিমানসহ ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দিয়েছে মোদি সরকার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনবিরোধী কৌশলগত নিরাপত্তা জোট কোয়াডের সদস্য হওয়ার পরও চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়া থেকে ভারতের ২৫ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র কেনার উদ্যোগ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি পণ্যে ট্রাম্পের ব্যাপক মাত্রায় শুল্ক আরোপের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সৃষ্ট জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে বলে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।

প্রেক্ষাপট : ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ইরান সংকট

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, যা শীতল যুদ্ধ থেকে শুরু হয়েছে। তখন থেকেই মস্কো ছিল ভারতের প্রধান প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদার। নয়াদিল্লি বিশ্বব্যাপী তার পররাষ্ট্র সম্পর্ককে বৈচিত্র্যময় করার পরেও রাশিয়ার সমরাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম এবং জ্বালানি সহযোগিতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল সব সময়ই।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর এই সম্পর্কটি নতুন করে গুরুত্ব লাভ করে। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় মস্কো বিপুল ছাড়ে তার অপরিশোধিত তেল বিক্রি শুরু করে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার তেল ভারতের জ্বালানি কৌশলের একটি প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়, যা শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

তবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বিরোধ সৃষ্টি করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে আরো আগ্রাসী অবস্থান গ্রহণ করে এবং ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমাতে বাধ্য করার জন্য শুল্ক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা বাড়িয়ে দেয়। ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে নয়াদিল্লি এ বছরের শুরুতে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ওমানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সামরিক আগ্রাসন চালায়। প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। ইরান এর জবাবে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলসহ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়।

এটি ভারতের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। দেশটির তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইরান-নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালি দিয়েই আসে। কিন্তু ইরানের বাধার কারণে সংকীর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। জ্বালানি সরবরাহে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই নৌপথের ওপর নির্ভর করার দুর্বলতা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। তেলের দাম বেড়ে যায়, গ্যাসের বাজার সংকুচিত হয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খল চাপের মুখে পড়ে।

ভারতের জন্য এর অর্থ ছিল জ্বালানির ক্রমবর্ধমান খরচ, পারিবারিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। ভারতের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নেও সতর্ক করা হয়েছিল, এই সংকট অব্যাহত থাকলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ ও মুদ্রার দুর্বলতা বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যাবে। ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক স্বীকার করেছেন, ছাড়কৃত মূল্যে রুশ তেল কেনা কমিয়ে দেওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এমন একটি পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যা সংকটের প্রভাবকে প্রশমিত করতে পারত।

জোটের চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাই মুখ্য

এসব চাপের মুখে ভারত এখন তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। রাশিয়ার সঙ্গে একাধিক ক্ষেত্রে ভারতের আলোচনা এগিয়ে চলেছে। আলোচনায় আছে সরাসরি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ আবার শুরু করার সম্ভাবনা এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রুশ জ্বালানি আমদানির একটি বড় সুবিধা হলো—এটি পারস্য উপসাগর এড়িয়ে এমন একটি নৌপথে ভারতে পৌঁছাতে পারে, যা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের সংস্পর্শ কমিয়ে দেয়। ভূরাজনৈতিক জটিলতা সত্ত্বেও এই বিকল্প মস্কোকে আবারও ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তুলেছে।

নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং কৌশলগত ভারসাম্য

রাশিয়ার সঙ্গে আবার ভারতের সম্পৃক্ত হওয়ার পরিণতি নেতিবাচক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি সম্পর্ক সম্প্রসারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। ভারত এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও বজায় রাখছে। এটি কোনো একটি জোটের প্রতি পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়ে স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার ভারতের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলেরই প্রতিফলন।

সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে রাশিয়া

এই পরিবর্তন রাশিয়ার জন্য একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। রাশিয়ার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর বাজার বন্ধ থাকায় তার জ্বালানি রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এশিয়া। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা রাশিয়ার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। তবে চাহিদা বাড়তে থাকায় মস্কো হয়তো আগের মতো ব্যাপকভাবে ছাড় মূল্যে জ্বালানি দিতে আর আগ্রহী হবে না, যা ইউক্রেন যুদ্ধের সময় প্রাথমিকভাবে ভারতকে দিয়েছিল।

বৃহত্তর প্রভাব

ভারতের এই কৌশলগত পরিবর্তন বেশ কয়েকটি বৃহত্তর প্রবণতারই প্রতিফলন। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে তুলে ধরে, যেখানে একটিমাত্র প্রতিবন্ধকতার কারণে সৃষ্ট সংকট স্বাভাবিক বাণিজ্য প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে একটি নতুন রূপ দিতে পারে। এই সংকট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপের মুখে ঘনিষ্ঠ অংশীদাররাও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়, যেখানে দেশগুলো নির্দিষ্ট জোটের পরিবর্তে পরিবর্তিত পরিস্থিতির ভিত্তিতে তাদের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলছে।

বাস্তববাদে প্রত্যাবর্তন

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের নতুন করে সম্পৃক্ততা কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নয়, বরং একটি পরিচিত ধারায় প্রত্যাবর্তন। যখন নতুন সংকট দেখা দেয়, তখন নয়াদিল্লি তার মূল স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন কৌশল নির্ধারণ করে এবং ইরান যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। ভূরাজনৈতিক সংকেত প্রদানের চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত নমনীয়তা প্রাধান্য পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিচ্ছে না, বরং এটি তার নিজস্ব অগ্রাধিকারকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দুই শক্তিধর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে পথ চলছে।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি অবলম্বনে

মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন