হাম দিয়ে জুলাইকে খাটো করা যাবে না

কাকন রেজা

হাম দিয়ে জুলাইকে খাটো করা যাবে না
ছবি: সংগৃহীত

সাজু খাদেম নামে এক অভিনেতা আছেন। গালি দেওয়া উচিত, দিলাম না। তিনি শিশুদের হাম বিষয়ে ফেসবুকে স্যাটায়ারিক পোস্ট দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘হাম দিল দে চুকে সনম’। এই কুষ্মাণ্ডদের জিহ্বায় হিন্দি, হৃদয়ে ইন্ডিয়া।

এরা জুলাইকে শিশুদের হামজনিত মৃত্যু দিয়ে আন্ডারমাইন করতে চায়। এদের বলি, বাংলাদেশে প্রতিবছর নিউমোনিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সি ২৪ হাজার শিশু মারা যায়। ঘণ্টা হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় মারা যায় দুই থেকে তিনজন শিশু। এটা আমার কথা নয়। ২০২৩ সালের ১০ নভেম্বর প্রথম আলোর করা খবর থেকে নেওয়া এই পরিসংখ্যান। প্রথম আলো আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) বিজ্ঞানীদের উদ্ধৃত করে এই তথ্য জানিয়েছে। এই রাজনৈতিক বদমাশরা কি এসব পরিসংখ্যান জানে। এই বদমাশগুলো শুধু জুলাইকে নিচু দেখানোর জন্য শিশুদের অসুস্থতাকে ব্যবহার করছে। আর সে কারণেই ২০২৩-এর পরিসংখ্যান ব্যবহার করলাম, যখন এই রাজনৈতিক বদমাশগুলোর প্রিয় রেজিম ক্ষমতায় ছিল। আর এই পরিসংখ্যান ছিল ২০২২ সালের। সে বছরই ২৪ হাজার শিশুর প্রাণ গিয়েছিল নিউমোনিয়ায়। গুগলে সার্চ করলে দেখবেন, বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া। প্রতিবছর মারা যায় শিশুরা এ রোগে। কিন্তু গত দেড় দশকে নিউমোনিয়ার প্রতিকারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে জিজ্ঞাসা নেই রাজনৈতিক বদমাশগুলোর।

বিজ্ঞাপন

এই কুষ্মাণ্ডরা কি জানে না, বাংলাদেশে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পুরোপুরি সুযোগ আওয়ামী লীগ সরকার ও এরশাদ পেয়েছিলেন। এরশাদের ৯ বছর আর আওয়ামী লীগের ২০ বছর। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছরের মধ্যে ২৯ বছরই শাসন করেছে একই গুরুর শিষ্যরা। গুরু বলতে ভারতমাতা আর কী। সুতরাং তাদের পক্ষে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজানো অসম্ভব কিছু ছিল না। অথচ কিছু অবকাঠামো তথা বিল্ডিং গড়া ছাড়া তারা আর কিছু করেনি। এই রাজনৈতিক বদমাশগুলো কি বলতে পারবে, গত দেড় দশকের শাসনে বাংলাদেশের একটা জেলাতেও কেন পূর্ণাঙ্গ কার্ডিওলজি, নিউরোলজি বিভাগ গড়ে ওঠেনি! কেন হার্টে একটা রিং বসানোর জন্য ঢাকায় ছুটতে হয়! কেন উপজেলাপর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় শিশুদের চিকিৎসায় জরুরি ইনকিউবেটর নেই! তারা কি এসব বিষয়ে কখনো প্রশ্ন করেছে গত দেড় দশকে? তারা কি জানতে চেয়েছে কেন নিউমোনিয়ায় প্রতিবছর ২৪ হাজার শিশু মারা গিয়েছে? তারা কি মামলা করতে চেয়েছে এর বিরুদ্ধে? তারা কি এসব শিশুমৃত্যুকে হত্যা বলে অ্যাড্রেস করেছে কখনো? তাহলে এখন কেন?

এখন একটা সরকার অল্প কিছুদিন হলো বসেছে। এর আগে যে ইন্টেরিম ছিল, তারাও ছিল স্বল্পকালীন। তাদের সময়ে সরকার চালানোর চেয়ে আন্দোলন সামলাতে হয়েছে বেশি। কথায় কথায় যমুনা ও সচিবালয় ঘেরাও হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সব কাজ বন্ধ করে আন্দোলনে গেছে। টিকাদান কর্মসূচিও বন্ধ ছিল। কই সেসব স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে তো কোনো কথা উঠছে না! তাদের তো শিশুহত্যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে না! সুতরাং এই প্রোপাগান্ডা শুধুই রাজনৈতিক। এর বাইরে আর কিছু নেই।

সিলেকটিভ প্রতিবাদ চুপ থাকার চেয়েও খারাপ। আর রাজনৈতিক বদমাশগুলো তাই করে। তাদের কাজই উদ্দেশ্য হাসিল করা এবং তা লাশের বিনিময়ে হলেও। এই বদমাশগুলো হাম বা হামের উপসর্গে মৃত্যুকে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তুলনা করছে। অথচ করোনাকালে বিগত রেজিমের চরম ব্যর্থতাকে তারা ভুলে গেছে। তারা ভুলে গেছে দরবেশখ্যাত সালমান এফ রহমান টিকার অজুহাতে কীভাবে হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে। বিনাপয়সায় পাওয়া টিকাকে দেখানো হয়েছে ক্রয় হিসেবে। হাসপাতালগুলোয় চরম অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাণ বাঁচানোর জরুরি অক্সিজেনও পায়নি রোগীরা। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘুরতে হয়েছে আমাদের গণমাধ্যমকর্মীর বাবাকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে অক্সিজেনের জন্য। আইসিইউ পাওয়া যায়নি। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে অক্সিজেনের অভাবে ও আইসিইউ না পেয়ে। কই তখন তো এসব রাজনৈতিক বদমাশরা এসব মৃত্যুকে হত্যার সঙ্গে তুলনা করেনি! মামলা করতে চায়নি! অথচ সেই রেজিমের পক্ষে সম্ভব ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের। অথচ তারা তা না করে লুটপাটের মচ্ছব করেছে। সেই লুটপাট নিয়েও কোনো রা নেই তাদের মুখে।

যারা একটা স্বল্পকালীন সরকার এবং নতুন বসা সরকারকে বিগত রেজিমের ধারাবাহিকতার দায়, যে দায় প্রায় দেড় যুগের, চাপাতে চায়, তা নিতান্তই রাজনৈতিক। এতে যাদের সন্দেহ আছে, তাদেরও বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। শিশুদের অসুস্থতাকে পুঁজি করে একটা বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা স্রেফ বদমায়েশি। সুতরাং এই বদমায়েশির গোড়ায় পানি ঢালা বন্ধ করে সংকট মোকাবিলায় পথ খুঁজে বের করার চেষ্টাই হবে এখনের জরুরি কর্তব্য।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন