অসুস্থ প্রতিযোগিতার আবর্তে সন্তানের শৈশব

অসুস্থ প্রতিযোগিতার আবর্তে সন্তানের শৈশব

আমরা এমন একসময়ে অবস্থান করছি, যেখানে পড়াশোনা পরিণত হয়েছে এক নির্মম সামাজিক মর্যাদার লড়াই ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। প্রতিটি পরিবার যেন একেকটি অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র, আর সেই যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে আমরা ব্যবহার করছি আমাদের ছোট সন্তানদের।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এখন আর জ্ঞান অর্জন, চারপাশের জগৎকে জানা কিংবা মননশীল মানুষ গঠন নয়। এর একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জিপিএ ৫, গোল্ডেন প্লাস কিংবা কোনো নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির একটা টিকিট পাওয়া। আর এই টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে সন্তানদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন স্বয়ং অভিভাবকরা, যেন সন্তানের সাফল্যই সমাজে তাদের নিজেদের স্ট্যাটাস বা মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র চাবিকাঠি।

বিজ্ঞাপন

সন্তান কতটুকু শিখল, তার নৈতিক ও মানবিক বিকাশ কতটা হলো, সেই ভাবনার চেয়ে সে অন্যকে পেছনে ফেলে কতদূর এগিয়ে গেল—এই আদিম ও ভোগবাদী প্রতিযোগিতাই এখন অভিভাবকত্বের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রয়িংরুমের আড্ডা থেকে শুরু করে স্কুলের গেটের সামনে মায়েদের জটলা—সবখানেই চলে কার বাচ্চা কত নম্বর পেল আর কার বাচ্চা কত ঘণ্টা টেবিল ঘড়ি ধরে পড়াশোনা করল, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ অসম প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে আমাদের শিশুদের। একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য যে পরিমাণ মুক্ত বাতাস, খেলার মাঠ, সামাজিক মেলামেশা এবং কিছুটা অলস ও ভাবনাহীন সময়ের প্রয়োজন, তার সবকিছুই আজ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সকালের স্কুল শেষ হতে না হতেই শুরু হয় প্রাইভেট টিউটরের তাড়া, সেখান থেকে তাকে টেনে নিয়ে দৌড়াতে হয় নামি কোনো কোচিং সেন্টারে। দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে আবার তাকে বসতে হয় বাড়ির কাজের পাহাড় নিয়ে। ফলে শৈশবের যে স্বাভাবিক কৌতূহল এবং নতুন কিছু নিজে নিজে আবিষ্কারের আনন্দ—তা এই রুটিনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে। আমরা আমাদের সন্তানদের মানুষ হিসেবে নয়, বরং একধরনের নম্বর পাওয়ার যন্ত্র বা জিপিএ ৫ উৎপাদনের কারখানা হিসেবে গড়ে তুলছি।

এই অবদমিত ও আনন্দহীন শৈশবের পরিণতি অত্যন্ত ভয়ংকর এবং সুদূরপ্রসারী হচ্ছে। তীব্র মানসিক অবসাদ, একাকিত্ব ও একধরনের হীনম্মন্যতায় ভুগছে শিশু-কিশোররা। আমাদের এই সমাজ শিশুদের শেখাচ্ছে কীভাবে সফল হতে হয়, কিন্তু কীভাবে ব্যর্থতাকে মেনে নিতে হয়, তা শেখাচ্ছে না। ফলে সহপাঠীকে তারা সহযাত্রী বা বন্ধু ভাবার বদলে ভাবছে পথের কাঁটা বা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ ধরনের বৈরী পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে তাদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা একদমই গড়ে উঠছে না। ফলে জীবনের সামান্য কোনো ধাক্কা, প্রত্যাশামতো ফল না পাওয়া কিংবা ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তারা চরম ভেঙে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামান্য পরীক্ষার ফল খারাপের জেরে অবুঝ ও কিশোর সন্তানদের আত্মহননের মতো মর্মান্তিক ঘটনাও আমাদের দেখতে হচ্ছে, যা মূলত আমাদের সামষ্টিক অভিভাবকত্বের গালে একেকটি চপেটাঘাত।

অথচ বিশ্বজুড়ে আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের মূল কথাই হলো—একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা হতে হবে সম্পূর্ণ ভীতিহীন, উৎসবমুখর ও আনন্দময়। শিক্ষা কোনো রিংটোন বা যুদ্ধক্ষেত্র নয়, যেখানে কাউকে না কাউকে পরাজিত করে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। শুধু মুখস্থবিদ্যা আর পরীক্ষার খাতায় তা নিখুঁতভাবে উগড়ে দিয়ে আসা কখনো প্রকৃত মেধার পরিচয় হতে পারে না, যদি না সেই শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে সহানুভূতি, পরোপকার ও জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক শক্তি গড়ে ওঠে। আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা হয়তো ভালো ইংরেজি বলতে পারে, জটিল অঙ্কের সমাধান করতে পারে, কিন্তু রাস্তায় একজন মানুষকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই মানবিক দেউলিয়াত্বের দায় কিন্তু আমাদের এই অসুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার এবং আমাদের ত্রুটিপূর্ণ অভিভাবকত্বের।

এই সর্বনাশা আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবার আগে পরীক্ষা পদ্ধতিসহ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। অভিভাবকদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিটি শিশুই নিজস্ব মেধা, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়—এই ধ্রুব সত্যটি আমাদের মন থেকে মেনে নিতে হবে। সন্তানদের শুধু পাঠ্যবই আর চার দেয়ালের খাঁচায় বন্দি না রেখে তাদের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে দিতে হবে, রূপকথার গল্প বা সাহিত্যের বই পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে, ছবি আঁকা, গান বা খেলাধুলার মতো সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে। সন্তানকে ক্লাসের সেরা বা জিপিএ ৫-এর ট্রফি বানানোর অন্ধ মোহ ছেড়ে, তাকে একজন সৎ, সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দীক্ষা দেওয়াই হোক আমাদের প্রকৃত অভিভাবকত্ব।

লেখক : শিক্ষক, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন