জ্যোৎস্না ও নিঃসঙ্গতার কাব্য

নূর ছানজিদা স্মৃতি

জ্যোৎস্না ও নিঃসঙ্গতার কাব্য

আজ রাতের চাঁদটা একটু আলাদা। নামেই লুকিয়ে আছে তার বিরলতা ‘ব্লু মুন’। মে মাসের প্রথম দিন একটি পূর্ণিমা হয়ে গেছে, আর আজ মাসের শেষ রাতে ফিরে এলো আরেকটি পূর্ণিমা। একই পঞ্জিকা মাসে দুটি পূর্ণিমা হলে দ্বিতীয়টিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ব্লু মুন’। এই ঘটনা সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পরপর একবার ঘটে। তাই ইংরেজিতে কথা আছে, ‘Once in a blue moon.’ নামে ‘নীল’ থাকলেও চাঁদ কিন্তু নীল রঙের দেখায় না, এটি কেবলই একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিভাষা। বরং চাঁদ তার চিরচেনা রুপালি আলোয়ই আকাশ ভাসিয়েছে আজ রাতে।

আজকে মেঘ যেন চাঁদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। কীভাবে চাঁদটাকে দেখতে দেখতে এক নির্ঘুম রাত পার করলাম, তার উত্তর আমার জানা নেই। এই ক্ষুদ্র জীবনে চাঁদ উঠলে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়েছি, কিংবা কয়েক মিনিট। কিন্তু আজকের মতো সারাটা রজনি তার দিকে চেয়ে কাটাইনি কখনো। পূর্ব আকাশ থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ থেকে পশ্চিম—এই দীর্ঘ যাত্রার নীরব সঙ্গী হয়েছি আজ।

বিজ্ঞাপন

এই পথচলায় প্রথমে সে একা, কিন্তু সেই একাকিত্বে কোনো দীনতা নেই। বিস্তীর্ণ আকাশজুড়ে সে ছড়িয়ে আছে নিজের মতো, নিজের আলোয়। যেন নিঃসঙ্গতাই তার রাজকীয় পোশাক। রাত যত গভীর হয়, চাঁদের সৌন্দর্য তত উদ্ভাসিত হয়। অন্ধকার যেন তাকে আরো উজ্জ্বল করে তোলে, আরো অপার্থিব। একসময় সাদা মেঘ আসে, সঙ্গ দেয়, ভালোবাসা দেয়, যত্ন দেয়। চাঁদও তাকে আপন করে নেয়, মিশে যায় তার মাঝে। কিন্তু হঠাৎ সে সরে যেতে থাকে। বিদায় না জানিয়েই চলে যায়, পেছনে একবারও ফেরে না। শুধু থেকে যায় শূন্যতা, আর সেই শূন্যতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটু শীতল বাতাস।

এরপর আসে কালো মেঘ। রুপালি চাঁদের পাশে কুচকুচে কালো মেঘ, তাদের সাক্ষাতের মুহূর্তে আকাশটা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত চিত্রপট। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, চাঁদ মিলিয়ে যেতে চায় তার মাঝে এবং মিলিয়েও যায়। কিন্তু একসময় কালো মেঘও চাঁদকে ফেলে চলে যায়। এত ত্যাগ, এত যত্ন, এত ভালোবাসার পরেও চাঁদ তাকে থামাতে পারেনি, মেঘ থাকতে চায়নি। তবুও চাঁদ নিজের গতিতে এগিয়ে চলে। কারণ থামলে আলো নেভে, আর আলো নিভলে পৃথিবী হয় অন্ধকার।

নিঃসঙ্গতার মাঝেই সে খুঁজে পায় পরিপূর্ণতা। পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয় উজ্জ্বল আলো। গাছের পাতাগুলো চকচক করে ওঠে, ফুলেরা স্নান করে সেই জ্যোৎস্নায়, শীতল বাতাস বয়ে যায় ঘুমন্ত পৃথিবীর বুকের ওপর দিয়ে।

আর এই বিরল ব্লু মুনের রাতে পৃথিবীজুড়ে কত গল্প একসঙ্গে ঘটে চলে। কোথাও ছোট্ট পাখি তার নীড়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে, কেউ বা বিচ্ছেদের তীব্র যন্ত্রণায় নীড়ের ভেতরেই নীড়হারা হয়ে যায়, কবি প্রিয়াকে নিয়ে কাব্য লেখেন, কেউ নিজেকে খোঁজেন নিজের মাঝেই, কোথাও মধুচন্দ্রিমার উষ্ণতা, কোথাও পথের ধারে নিশ্চিন্ত ঘুম, কোথাও কেউ শেষ নিঃশ্বাসে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে দিচ্ছে, আবার কোথাও একটি নতুন প্রাণ প্রথমবার কাঁদছে; জানান দিচ্ছে তার আগমন। জন্ম ও মৃত্যু, মিলন ও বিচ্ছেদ—সব একই চাঁদের আলোর নিচে, একই রাতে, একই মুহূর্তে।

চাঁদ এই অবাক পৃথিবীর গল্প দেখতে দেখতে গুনছে তার শেষ প্রহর। পূর্ণিমার দিন চাঁদ যখন পশ্চিমে অস্ত যায়, সূর্য তখন পূর্বে জেগে ওঠে একই নিঃশ্বাসে। যেন একজন বিদায় না নিলে আরেকজনের আসার পথ খোলে না। এই চিরন্তন আবর্তনেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার বীজ। প্রতিটি অস্তের গভীরে জন্ম নেয় একটি নতুন ভোর।

শেষ প্রহরে চাঁদ ভাবে তার যাত্রার কথা। যারা এসেছিল, সঙ্গ দিয়েছিল, তারপর মিলিয়ে গেছে। তার আলোয়, ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। তবু সে বোঝে, সফর মানেই বোধহয় এটাই। কেউ সারাক্ষণ থাকে না, জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্তও না। কেউ সুন্দর স্মৃতি দিয়ে যায়, কেউ হৃদয়ে নীরব দাগ রেখে যায়। দুটোই কিন্তু বেঁচে থাকার প্রমাণ বহন করে। চাঁদের এই অন্তিম যাত্রায় কেউ থাকুক বা না থাকুক, আমি তাকে দেখছি, সারা রাত দেখেছি।

এই বিরল জ্যোৎস্নাসিক্ত যামিনীতে, এই নির্ঘুম প্রহরে, চাঁদের সঙ্গে একা একা বসে যা বুঝলাম, মানুষ যাকে নিজের চেয়েও আপন ভেবেছে, তার চলে যাওয়াটা প্রকৃতির নিয়মেরই অংশ। সময়ের স্রোত সব ভাসিয়ে নিলেও ভালোবাসা সে স্রোতের গভীরে পাথর হয়ে থাকে, অবিনশ্বর। চাঁদ শুধু নিজের আলোয় স্থির থাকে, প্রতি রাতে ওঠে, আলো দেয়, আবার অস্ত যায়। বিচ্ছেদের ভেতরে যে বেঁচে থাকা, ক্ষত বুকে নিয়ে অবিরাম দাঁড়িয়ে থাকা—এটাই হয়তো জীবন।

আজকের এই ব্লু মুন একদিন আবার আসবে, দুই কি তিন বছর পরে। কিন্তু ৩১ মে ২০২৬-এর এই রাতটা আর আসবে না কখনো। যে চাঁদকে আজ সারা রাত দেখলাম, যে শূন্যতার ভেতর বসে নিজেকে খুঁজে পেলাম, এই অনুভূতি কোনো ভাষায় পুরোপুরি ধরা যাবে না। শুধু জানি, এই রাতটুকু চিরকালের জন্য গেঁথে গেল হৃদয়ের এক অনির্বচনীয় কোণে, যেখানে শুধু চাঁদের আলো পৌঁছায়; আর কেউ না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন