ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলের বিগত ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, গুম-খুন, নির্যাতন-নিপীড়ন, জেল-জুলুমসহ রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র তৈরির কাজ করছে বিএনপি। এর প্রাথমিক নাম হচ্ছে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের ন্যারেটিভ’।
বিএনপির কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে এরই মধ্যে এক দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতও চেয়েছে দলটি। এর সঙ্গে জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বীকৃতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত ৩১ ডিসেম্বর জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার কথা বলেছিল। ছাত্রদের এ ঘোষণাপত্রের কথা জানার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হয়। এ নিয়ে বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া ঘোষণাপত্রের বিষয়ে সম্মত ছিলেন না অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও।
ঘোষণাপত্র প্রকাশের আগের দিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দল ও পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্রটি প্রস্তুত করা হবে। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিত, ঐক্যের ভিত্তি ও জনগণের অভিপ্রায় ব্যক্ত হবে। এরপরই এ নিয়ে বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্ররাও দফায় দফায় বৈঠক করে ওইদিন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জুলাই বিপ্লবের একটি খসড়া ঘোষণাপত্রের জন্য বিএনপির কাছে মতামত চেয়েছেন। এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন, এক দিনের নোটিসে তাদের পক্ষে মতামত জানানো সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সাহেবের কাছ থেকে ঘোষণার খসড়াপত্র পেয়েছি এবং তিনি অনুরোধ করেছেন এ বিষয়ে আমাদের মতামত জানানোর জন্য।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিষয়টি এত বেশি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ যে, এটা একদিনের নোটিসে করা সম্ভব নয়। আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি, আমরা আরও আলোচনা করছি। আমাদের অন্যান্য দলও আছে; তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, সংবিধান বিশেষজ্ঞ যারা আছেন, তাদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে। কারণ, এই ঘোষণাপত্রের মধ্যে সংবিধানের ব্যাপারেও বহু কথা আছে, যেটি আমাদের দেখতে হবে।
বিএনপি ওই খসড়া ঘোষণাপত্রে মতামত জানাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে দলটি এরই মধ্যে নিজেরাই একটি ঘোষণাপত্র তৈরির কাজ শুরু করেছে। এই ঘোষণাপত্র তৈরির কাজে জড়িত একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে বিএনপি তার সমমনা দলগুলোর কাছে মতামত জানতে চেয়েছে। তারা সমমনা দলগুলোর কাছে যে তিনটি বিষয়ে মতামত জানতে চেয়েছে, তার একটি হচ্ছে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী এক দফা আন্দোলনের বিজয়ের ন্যারেটিভ প্রণয়ন’।
অন্য দুটি হচ্ছে ন্যূনতম প্রয়োজনী সংস্কার শেষে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন ও আগামী দিনের সম্ভাব্য কর্মসূচি কী হতে পারে- এ বিষয়েও সমমনা দলগুলোর মতামত জানতে চেয়েছে বিএনপি।
ছাত্রদের জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, তারা মনে করেন, এ ঘোষণায় বিগত ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, গুম-খুন, নির্যাতন-নিপীড়ন, জেল-জুলুমসহ রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা—সব থাকতে হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে একমত হয়ে তা করতে হবে।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা নাম প্রকাশ না করে জানান, বর্তমানে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। ৫ আগস্ট এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতিতে কোনো একক দল বা ব্যক্তির অবদান নেই। ২০০৯ সালের পর থেকে ওই সময় পর্যন্ত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি হয়েছে। সুতরাং এসবের একটা ‘ন্যারেটিভ’ (বয়ান) থাকা প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে যে কোনো প্রয়োজনে তা কাজে লাগে।
এ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে তাড়াতে বিগত ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতাই হচ্ছে জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। এটা আমাদের সবার গৌরবময় অর্জন। সুতরাং ঘোষণাপত্রে সবকিছুরই বর্ণনা থাকা উচিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

