ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা সাইয়েদ আলি খামেনির শোকানুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের কাছে পবিত্র কোরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াত শুনিয়ে আলাদা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে তেহরান। এই বিষয়টি যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, তখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজে সোমবার একটি আয়াত পোস্ট করা হয়েছে।
আয়াতটি হলো—‘তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’
সুরা মুহাম্মদ-এর ২৪ নম্বর আয়াতটি দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছে দলটি? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ধর্মীয় বার্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে দলটি।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মূলত মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিবেককে জাগ্রত করার জন্য একটি জোরালো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, কোনো বিষয়ের শেষ পরিণতি বা গভীর মূল নিয়ে চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলা মানুষকে কেবল কোরআন তিলাওয়াত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, এর অর্থ, শিক্ষা এবং হিদায়াত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আয়াতটি আরেক মর্মার্থ হলো, যারা সত্য জানার পরও কোরআনের বাণীকে উপেক্ষা করে, তাদের অন্তরের অবস্থাকে এখানে ‘তালাবদ্ধ’ বলা হয়েছে। অহংকার, কুসংস্কার, দুনিয়াবি মোহ এবং অন্ধ অনুকরণের কারণে মানুষের হৃদয় যখন সত্য গ্রহণের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে, তখন তার অন্তরে এক ধরনের আধ্যাত্মিক তালা বা মোহর পড়ে যায়।
এটি মূলত তৎকালীন মুনাফিক ও কাফিরদের উদ্দেশ্য করে বলা হলেও এটি সব যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। আয়াতটি আমাদের অন্ধত্ব ও উদাসীনতা পরিহার করে পরম সত্যকে বোঝার জন্য উন্মুক্ত মন নিয়ে কোরআন নিয়ে ভাববার আহ্বান জানায়।
জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দল যখন তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সূরা মুহাম্মদের ২৪ নম্বর আয়াত শেয়ার করে, তখন এর পেছনে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক বার্তা থাকতে পারে।
জামায়াত তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ বা উদারপন্থী দল ও বুদ্ধিজীবী মহলকে ইঙ্গিত করে প্রায়ই এই আয়াত ব্যবহার করে। তাদের বার্তা থাকে— যারা সমাজ বা রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন বা কোরআনের বিধান মানতে চায় না, তারা আসলে কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না এবং তাদের মন ‘তালাবদ্ধ’। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনকে আধ্যাত্মিকভাবে অন্ধ বা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা। তারা এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের কর্মী ও সমর্থকদের এই বার্তা দেয় যে, কোরআন নিয়ে গভীর গবেষণা বা ‘তাদাব্বুর’ করলে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় ইসলামের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে সাধারণ কোনো ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং একটি কোরআনিক দায়িত্ব— সেটি প্রমাণ করতেই এই ধর্মীয় রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়।
দলের অভ্যন্তরীণ কর্মীদের চাঙ্গা রাখতেও এটি ব্যবহৃত হয়। আয়াতটির মাধ্যমে কর্মীদের প্রতি বার্তা দেওয়া হয় যে, তারা যেন সমাজ ও চারপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কোরআনের আলোতে মূল্যায়ন করে এবং নিষ্ক্রিয় না থেকে দলের আদর্শিক লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের পেজে এই আয়াতের উপস্থিতি কেবলই একটি সাধারণ ধর্মীয় বাণী নয়; এটি তাদের ইসলামি রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক দর্শনকে দৃঢ়তা দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের আদর্শকে ভুল প্রমাণ করার একটি কৌশলগত মাধ্যমও।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


