ইসলামি অর্থনীতির প্রকৃত অর্থ

ইসলামি অর্থনীতির প্রকৃত অর্থ

আধুনিক অর্থনৈতিক জীবনের ভেতর দিয়ে আজ এক নীরব অসন্তোষ বয়ে যাচ্ছে। লাগামহীন পুঁজিবাদ অভূতপূর্ব সম্পদ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে জন্ম দিয়েছে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, পরিবার ও রাষ্ট্রের ঋণের পাহাড়, বাস্তব উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি, পরিবেশগত চাপ এবং এমন এক সামাজিক মানসিকতা, যেখানে অর্থই যেন সব মূল্যবোধের চূড়ান্ত মাপকাঠি। অন্যদিকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্র সমতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বহু ক্ষেত্রে এনেছে স্থবিরতা, নিয়ন্ত্রণ ও উদ্যোক্তা-সত্তার দমন। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, ঋণচক্র এবং সম্পদের মালিক ও শ্রমনির্ভর মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যবধান পুঁজিবাদের সমর্থকদেরও অস্বস্তিতে ফেলেছে।

এই দুই ক্লান্ত মডেলের মাঝখানে মানবসমাজ আজ এমন এক অর্থনৈতিক দর্শনের সন্ধান করছে, যা সমৃদ্ধি ও উদ্দেশ্য—উভয়কেই মর্যাদা দেয়, যে অর্থনীতি প্রাচুর্য সৃষ্টি করবে, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে শূন্য করবে না। এই জায়গাতেই ইসলামি অর্থনীতি নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামি অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভুল ধারণা রয়েছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে ‘ইসলামি অর্থনীতি’ বলতে বোঝায় একটি ইসলামি ব্যাংক, কিছু হালাল পণ্য এবং সুদের নিষেধাজ্ঞা। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এগুলো কেবল ওপরের স্তর। ইসলামি অর্থনীতি আরবি পরিভাষায় সাজানো প্রচলিত অর্থনীতি নয়, কিংবা কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ কোনো আর্থিক পদ্ধতিও নয়। এটি অর্থনৈতিক জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমার বিবেচনায় একে বলা যায়—আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ। অর্থাৎ, এমন এক ব্যবস্থা, যা বাজার, উদ্যোগ, মালিকানা ও মুনাফাকে স্বীকার করে; কিন্তু সেগুলোকে শৃঙ্খলিত করে ন্যায়বিচার, সংযম, জবাবদিহিতা এবং মানবমর্যাদার সুরক্ষার মাধ্যমে।

এই বিভ্রান্তির একটি বড় কারণ হলো, আমাদের অনেক ইসলামি ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই অনুকরণ করেছে, শুধু নাম ও পরিভাষা বদলেছে। আমি আগেও বলেছি, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সমস্যা নামের মধ্যে নয়, মডেলের মধ্যে। যে খাত ঋণসদৃশ মার্ক-আপ চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা শরিয়াহসম্মত কাঠামো ধারণ করলেও ইসলামের মূল ঝুঁকি-বণ্টনভিত্তিক চেতনা থেকে দূরে সরে যায়। যখন একটি ব্যাংক নিজের জন্য নির্দিষ্ট রিটার্ন নিশ্চিত করে এবং সব ঝুঁকি গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন তা সুদভিত্তিক অর্থনীতিকেই পুনরুৎপাদন করে—শুধু কাগজপত্রের নাম বদলায়।

এর সমাধান প্রসাধনমূলক হতে পারে না। আমাদের মূলনীতিতে ফিরে যেতে হবে। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান আমরা উপেক্ষা করেছি, সেগুলোকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে—যেমন প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত করজে হাসানা ব্যাংক, যেখানে কল্যাণমূলক ঋণ ব্যালেন্স শিটের নয়, ঋণগ্রহীতার কল্যাণের সেবা করবে। ইসলামি অর্থনীতি কোনো ব্যাংকিং পণ্য নয়; এটি মানুষ কীভাবে উৎপাদন করবে, বিনিময় করবে এবং ভাগাভাগি করবে, তার এক নৈতিক দর্শন।

ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তি কয়েকটি মৌলিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাওহিদ আমাদের শেখায়, সবকিছুর চূড়ান্ত মালিক স্রষ্টা। মানুষের মালিকানা বাস্তব হলেও তা পরম নয়; সম্পদ আমাদের হাতে অর্পিত আমানত। খিলাফাহ মানুষকে করে তোলে প্রতিনিধি ও তত্ত্বাবধায়ক—সম্পদের স্বেচ্ছাচারী মালিক নয়। আমানাহ সেই তত্ত্বাবধানের নৈতিক দায়। আর আদল ও ইহসান—ন্যায়বিচার ও কল্যাণশীলতা—প্রতিটি লেনদেনের দুই মানদণ্ড। ন্যায়বিচার হলো ন্যূনতম ভিত্তি; ইহসান হলো উচ্চতর নৈতিক আদর্শ।

এই মূলনীতি থেকেই ইসলামি অর্থনীতির বাস্তব প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। জাকাত ধনীর অনুগ্রহ নয়; দরিদ্রের অধিকার। ওয়াক্‌ফ ব্যক্তিগত সম্পদকে দীর্ঘ মেয়াদে জনকল্যাণে নিয়োজিত করার এক অসাধারণ প্রতিষ্ঠান। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে হাসপাতাল, বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, পানির কূপ এবং জনসেবামূলক বহু প্রতিষ্ঠান ওয়াক্‌ফের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। রিবা বা সুদের নিষেধাজ্ঞা অর্থায়নের প্রতি শত্রুতা নয়; বরং এই নীতির ঘোষণা যে অর্থ বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজে নিজে অর্থ জন্ম দিতে পারে না। বৈধ রিটার্নকে বাণিজ্য, উৎপাদন ও বাস্তব সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।

এর ওপর রয়েছে মাকাসিদ আল-শরিয়াহ—শরিয়াহর উচ্চতর উদ্দেশ্য—যার লক্ষ্য দ্বীন, জীবন, জ্ঞান, পরিবার ও সম্পদ রক্ষা করা এবং তারও বাইরে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলামি অর্থনীতি তাই কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়। ইবনে খালদুনের মতো চিন্তাবিদ বহু শতাব্দী আগে অর্থনৈতিক জীবনকে ন্যায়বিচার, সামাজিক সংহতি এবং সভ্যতার নৈতিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন। ইসলামি অর্থনীতি বিশ্বকে কোনো অপ্রমাণিত তত্ত্ব গ্রহণ করতে বলছে না; বরং বহু শতাব্দীর জ্ঞানচর্চা ও অনুশীলনে পরিশীলিত এক পুরোনো, গুরুতর এবং প্রাসঙ্গিক তত্ত্বকে আবার স্মরণ করতে বলছে।

ইসলামি অর্থনীতি বাজার অর্থনীতির যন্ত্রপাতি প্রত্যাখ্যান করে না। এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্বীকার করে, উদ্যোগকে সম্মান করে, প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানায় এবং সৎ মুনাফাকে বৈধ মনে করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ইসলামি আইন বাণিজ্য, চুক্তি ও সৎ উপার্জনের প্রতি অনুকূল। এই অর্থে ইসলামি অর্থনীতির অনেক বৈশিষ্ট্য পুঁজিবাদের সঙ্গে মিলে যায়।

কিন্তু ইসলামি অর্থনীতি যে জিনিসটি প্রত্যাখ্যান করে, তা হলো পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ—মুনাফা সর্বাধিকীকরণকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং অর্থকে নীরবে উপাস্য করে তোলা। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ মুহাম্মদ আকরাম খান তার গ্রন্থ ‘What is Wrong with Islamic Economics?’-এ বিষয়টি একটি স্মরণীয় সূত্রে ধরেছেন—আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ হলো পুঁজিবাদ প্লাস ফালাহ। ফালাহ অর্থ সাফল্য—কিন্তু এমন সাফল্য, যা শুধু এই পৃথিবীর নয়, পরকালেরও; শুধু বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্যের নয়, অন্তরের শান্তিরও।

আধুনিক পুঁজিবাদ আমাদের সমৃদ্ধি দিয়েছে, কিন্তু প্রশান্তি দেয়নি। উন্নত বাজার অর্থনীতির প্রায় প্রত্যেক মানুষ সম্পদ অর্জনের জন্য ঋণের ফাঁদে প্রবেশ করে এবং জীবনের বড় অংশ কাটায় সেই ঋণের বোঝা বহন করে। আমরা প্রাচুর্যের অর্থনীতি গড়ে তুলেছি; কিন্তু তার অংশগ্রহণকারীদের রেখেছি ক্লান্ত, ঋণগ্রস্ত এবং অদ্ভুতভাবে অপূর্ণ। আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বলে, কিন্তু মানুষের অন্তঃসত্তাকে শূন্য করে নয়। এটি আত্মাসম্পন্ন সম্পদের কথা বলে—এমন প্রবৃদ্ধির কথা বলে, যা প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটে চলা মানুষটিকেই গ্রাস করে না।

এখানেই ইসলামি অর্থনীতি প্রচলিত পুঁজিবাদ থেকে আলাদা, কিন্তু তার বিপরীত মেরু নয়। মুনাফা এখানে বৈধ, তবে তা হতে হবে সৎ উপার্জন, প্রতারণা ও শোষণমুক্ত এবং প্রকৃত সামাজিক কল্যাণে সহায়ক। মুনাফা সেবক, প্রভু নয়। প্রতারণা, বাজার দখল বা দুর্বল মানুষকে ঋণের ফাঁদে ফেলে অর্জিত লাভ ইসলামের নৈতিক হিসাবে লাভ নয়, ক্ষতি।

একইভাবে ইসলামি অর্থনীতি কোনো ছদ্মবেশী সমাজতন্ত্রও নয়। এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা উদ্যোক্তা-সত্তা বিলোপ করে না; বরং এগুলোকে মানবমর্যাদা ও আল্লাহপ্রদত্ত সৃজনশীলতার প্রকাশ হিসেবে সুরক্ষা দেয়। ইসলামি অর্থনীতি যা যোগ করে, তা হলো সম্পদের ওপর নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা—জাকাতের দাবি, তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব, ক্ষতি না করার নীতি, প্রতিবেশী ও শ্রমিকের অধিকার। এটি খামার ও কারখানার মালিকানা ব্যক্তির হাতে রাখে; কিন্তু বলে—মালিকানা দায়িত্ব বহন করে; সম্পদে দরিদ্রের অংশ আছে।

বাংলাদেশের জন্য এ আলোচনা আজ বিশেষভাবে জরুরি। আমাদের ব্যাংক খাত দুর্বল সুশাসন ও খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব, গ্রামীণ ও শহুরে দারিদ্র্য, অগভীর পুঁজিবাজার, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়নের সংকট এবং বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি—সব মিলিয়ে আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। জাকাত ও ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান, যা একসময় মুসলিম বিশ্বের সামাজিক সুরক্ষার মেরুদণ্ড ছিল, বাংলাদেশে এখনো অনুন্নত, বিচ্ছিন্ন ও দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত। অথচ এর মধ্যে সুপ্ত রয়েছে বিরাট সম্ভাবনা।

আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ এখানে কোনো স্লোগান নয়; এটি সংস্কারের দিকনির্দেশনা। প্রথমত, ইসলামি ব্যাংকিংকে ঋণভিত্তিক অনুকরণ থেকে বের করে প্রকৃত ঝুঁকি-বণ্টন ও লাভ-ক্ষতি অংশীদারত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, শরিয়াহ গভর্ন্যান্সকে শক্তিশালী করতে হবে এবং শরিয়াহ পণ্ডিতদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সম্মতি রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত না হয়। তৃতীয়ত, জাকাত ও ওয়াক্‌ফকে সামাজিক সুরক্ষার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে—পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ সুশাসন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে। চতুর্থত, করজে হাসানাভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক অর্থায়ন গড়ে তুলতে হবে, যা দরিদ্রকে আত্মনির্ভরতার দিকে নেবে, ঋণদাসত্বে নয়। পঞ্চমত, বাস্তব সম্পদ ও নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত সুকুক বাজার গড়ে তুলতে হবে। ষষ্ঠত, নৈতিক উদ্যোক্তা-সত্তা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে, যাতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিশাল জনগোষ্ঠী ন্যায্য ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতরে আসে।

এসব কোনো অতীতচারিতা নয়, বরং নবায়নের আহ্বান। ইসলামি অর্থনীতি বাজারকে ধ্বংস করতে বলে না; বাজারকে নৈতিক করতে বলে। এটি অর্থায়ন বিলোপ করতে বলে না; অর্থায়নকে মানবিক করতে বলে। এটি সমৃদ্ধি ত্যাগ করতে বলে না; সমৃদ্ধিকে উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে বলে। অর্থনীতির লক্ষ্য সম্পদের জন্য সম্পদ সঞ্চয় নয়; মানুষের কল্যাণ—এই দুনিয়ায় এবং পরকালে।

বিশ্ব আজ এমন এক অর্থনীতিতে ক্লান্ত, যা সবকিছুর দাম জানে, কিন্তু কোনো কিছুর মূল্য বোঝে না। আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ সেই ক্লান্তির জবাব দেয়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য—যে দেশ তরুণ, বিশ্বাসী, পরিশ্রমী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং ন্যায্য ভবিষ্যতের জন্য অস্থির—এই ধারণা কোনো দূরবর্তী আদর্শ নাও হতে পারে। বরং এটিই হয়তো আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ধারণা।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের এলএসইউ–নিউ অরলিয়েন্সের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে ২০১৬ সালের আইডিবি পুরস্কারপ্রাপ্ত; এএওআইএফআই এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য এবং এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন