মানব পাচার দমনে আইন-শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকল্প নেই: রিজভী

মানব পাচার দমনে আইন-শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকল্প নেই: রিজভী
ঢাবিতে ‘মানব পাচার প্রতিরোধে গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার। ছবি: আমার দেশ

মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানব পাচার প্রতিরোধে আইনের শাসন, শিক্ষার প্রসার এবং তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সাংস্কৃতিক সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘মানব পাচার প্রতিরোধে গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও বাংলাদেশ আর্ট ক্রিটিসিজম ট্রাস্ট যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

বিজ্ঞাপন

রুহুল কবির রিজভী বলেন, মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করা দরকার। যদিও আমাদের দেশে এসব বিষয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে গেছে। যে কারণে মানুষের মাঝে সচেতনতা কমছে, সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধে সমাজে আইনের শাসন প্রয়োজন। অন্যদিকে শিক্ষার বিকাশও প্রয়োজন। জাতিকে একটি গড় শিক্ষার ওপর দাঁড় করাতে হবে। যাতে তৃণমূলে নিরক্ষর যে মানুষটি সেও স্থানীয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। সে যাতে প্রতারণা, শোষণ, সহিংসতা ও মানব পাচারের শিকার না হয়।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন, এমপি। তিনি বলেন, মানব পাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা তথ্যপ্রমাণ ও উপাত্তভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রধান বক্তা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাংলাদেশ ও বিশ্বের মানব পাচারের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্দেশীয় মানব পাচারের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও জোরপূর্বক শ্রম, শিশু ও নারীর শোষণ এবং বিভিন্ন ধরনের পাচার উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকে মানব পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি সম্প্রতি পুনঃপ্রণীত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’-এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মানজুর হোছাঈন মাহি বলেন, গণমাধ্যমের চারটি মৌলিক দায়িত্ব হলো তথ্য প্রদান, শিক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টি, বিনোদন এবং মানুষকে ইতিবাচক কাজে উদ্বুদ্ধ করা। মানব পাচার প্রতিরোধে বিশেষ করে তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন Seafood from Slaves-এর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানব পাচার ও দাসশ্রমের ভয়াবহ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উঠে আসে। এর ফলে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়। এটি প্রমাণ করে, একটি শক্তিশালী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মানুষের জীবন রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ আর্ট ক্রিটিসিজম ট্রাস্টের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, “একটি পরিবারের একজন মানুষ পাচার হওয়া মানে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যাওয়া নয়; তার সঙ্গে সেই মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা এবং সমাজের সংস্কৃতিরও ক্ষতি হয়।” তিনি জানান, বাংলাদেশ আর্ট ক্রিটিসিজম ট্রাস্ট ভবিষ্যতেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানব পাচারসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সেমিনারে বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস, ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস মিশন (আইজেএম) বাংলাদেশ এবং মানব পাচার প্রতিরোধে ৩০টি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গঠিত ‘কোটনেট’-এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, শিল্পী, উন্নয়নকর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আর্ট ক্রিটিসিজম ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে। সঞ্চালনা করেন ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক রতন মালো।

সেমিনারের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কথক বিশ্বাস জয়ের নেতৃত্বে মানব পাচারবিষয়ক রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গান পরিবেশন করেন। পরে চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক শিল্পী এস এম রকিবুল হাসান বাঁশির সুরে মানব পাচারের শিকার মানুষের দুর্দশার শৈল্পিক উপস্থাপনা করেন।

এ বছরের বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Trapped Behind the Scam’ বা ‘প্রতারণার আড়ালের ফাঁদ’। অনলাইন প্রতারণার আড়ালে মানব পাচার, সাইবার দাসত্ব এবং ডিজিটাল শোষণের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন