গণতন্ত্রে উত্তরণের ভোট উৎসব শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইতিহাসসেরা এ নির্বাচন ঈদ উৎসবে পরিণত হয়। ভোটের এ উৎসবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বিপুল বিজয়ের পথে এগিয়ে রয়েছে। দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের মানুষ মুক্ত পরিবেশে প্রতীক্ষিত ভোটে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। কোনো ধরনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অঘটন ছাড়াই অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে ঈদ উৎসব বলে আখ্যায়িত করেন ভোটাররা। শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় জাতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এ নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হয়েছে। এ নির্বাচন মহা আনন্দের ও উৎসবের। এর মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু হলো। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ভোট দিয়ে সবাইকে ‘ঈদ মোবারক’ জানান।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় সংস্কারসম্পর্কিত গণভোট। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয়েছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। সারা দেশে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টানা বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট গণনা করে কেন্দ্রভিত্তিক ফল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনে ৬১ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে।
নির্বাচন নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্তোষ প্রকাশ না করলেও দলটি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করায় নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, অন্তর্বর্তী সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত জোট উভয়েই বিজয়ের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। বিএনপি বলেছে, তাদের বিজয় অনিবার্য, এটি স্থিমিত করার অপপ্রয়াস সফল হবে না। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।
নির্বাচনে ভোটারসহ দেশবাসীর মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রগুলোয় বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে। দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ভোটারদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। প্রথমবারের মতো ভোটদানে সুযোগ পাওয়া তরুণদের মধ্যেও ছিল উল্লাস। অনেকে সপরিবারে ভোট দিতে আসেন। ভোটারদের অনেকে জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের পর এবারই তারা ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। নির্বাচনের দিন সংঘাতে কোথাও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভোট দিতে এসে অসুস্থতাজনিত কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছয়জন মারা গেছেন।
দেড়যুগ পর মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনকে ভোটাররা ঈদ উৎসব বলে আখ্যায়িত করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিহা আফরিন যশোরে গ্রামের বাড়ি ভোটাধিকার প্রয়োগ শেষে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জীবনের প্রথম ভোট, খুব ভালো লাগছে। ভোট দিতে পেরে ঈদের মতো খুশি লাগছে। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ৭৬ বছরের বৃদ্ধ নুরুল বাকী বলেন, গত ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি। কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না, হুমকিধমকিও ছিল না। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি। ভোটের আনন্দকে ঈদের আনন্দের মতো মনে হচ্ছে।
ঢাকা-১৪ আসনের ভোটার ওমর ফারুক (৬০) বলেন, ঝামেলা হয় বলে এর আগে ভোট দিতে আসিনি। এবার ভোট দিয়ে খুব ভালো লেগেছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দুই তরুণ মনসুর উদ্দিন ও আজমান আলী বলেন, আনন্দের সঙ্গে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। তরুণ হিসেবে জীবনের প্রথম ভোট দিতে পেরে সত্যি ভালো লেগেছে।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক দেখা গেছে। ভোটগ্রহণ চলাকালে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। এ সময় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বলেন, আমরা দুজন ভাই ভাই। যেই জিতি, এলাকার মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করব। জামায়াতের আমিরও বলেন, তারা একসঙ্গে সৌহার্দ বজায় রেখেই দেশ গড়বেন।
এদিকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই ব্যক্তিগত সোর্স থেকে পরাজয় জানতে পেরে সুনামগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী শিশির মুহাম্মদ মনির ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিএনপির প্রার্থী নাছির চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ভোটগ্রহণকালে বরিশালের হিজলা উপজেলার কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শনকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর কাজী জাহিদ ভোটারদের উদ্দেশ করে বলেন, আজ আপনাদের ঈদের দিন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা সংকোচের সুযোগ নেই। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মিয়া ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, বিশ্ব দেখল আমরাও অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারি।
রাজধানীর কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিক ও জাতির কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভোটের সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

