সৈনিক পিয়াসের শেষ বিদায়ে কাঁদল মালিপাড়া, পিতৃহারা ১৮ মাসের ফাতেমা

সৈনিক পিয়াসের শেষ বিদায়ে কাঁদল মালিপাড়া, পিতৃহারা ১৮ মাসের ফাতেমা
সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় ফিল্ড ফায়ারিং ফিল্ডে অনুশীলনের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণে প্রাণ হারান সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস। তিনি নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই তিনি। তার মৃত্যুতে পুরো গ্রাম এখন শোকে স্তব্ধ।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মালিপাড়া গ্রামে জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।

পিয়াসের শেষ বিদায়ে প্রিয়জন, স্বজন ও এলাকাবাসী যখন শোকে বিহ্বল, চোখ বেয়ে পড়ছে অশ্রু—ঠিক সেই মুহূর্তে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি তার ১৮ মাস বয়সী ছোট্ট মেয়ে ফাতেমা আক্তার। বাবার চলে যাওয়ার এই ব্যথা বোঝার বয়স এখনও তার হয়নি।

তবে সময়ের ব্যবধানে একদিন সে জানতে পারবে, দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তার বাবা না ফেরার দেশে চলে গেছেন; আর কোনোদিন ফিরবেন না। হয়তো সেদিনই এই পরিবারের জন্য শোকের স্মৃতিটি আরও গভীর হয়ে উঠবে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে অনুশীলনের সময় একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণকালে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই সৈনিক নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, চাকরির সুবাদে স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন পিয়াস। দেশের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারকে ঘিরে ছিল তার ছোট্ট এক স্বপ্নের সংসার। ১৮ মাস আগে সেই সংসারে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান। মেয়েকে ঘিরে পুরো পরিবারের আনন্দের মুহূর্তগুলো হঠাৎ করেই ঢেকে গেল শোকের কালো ছায়ায়।

নিহতের চাচা মোশারেফ হোসেন বলেন, ১৮ মাস আগে পিয়াসের ঘর আলো করে একটি কন্যাসন্তান আসে। মেয়েকে ঘিরে যখন পরিবারের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ঠিক তখনই এলো তার মৃত্যুর খবর। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা বোঝার আগেই বাবাকে হারাল শিশুটি।

নিহতের ভগ্নিপতি আবু সাঈদ বলেন, পিয়াস ছিলেন পরিবারের চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকেই শান্ত ও সহজ-সরল স্বভাবের ছিলেন তিনি। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন, তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অমায়িক। এ কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি খুব প্রিয় ছিলেন।

পিয়াসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কবিরহাটের মালিপাড়া গ্রামজুড়ে নেমে আসে গভীর শোক। বৃহস্পতিবার সকালে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ছুটে আসেন স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। নিহতের পরিবার ও স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে; সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

স্থানীয় বাসিন্দা এবাদ উল্যাহ বলেন, পিয়াস খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার এমন অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, মাত্র ১৮ মাসের একটি মেয়েকে রেখে তাকে চলে যেতে হলো।

কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা বলেন, সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে তাকে দাফন করা হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। দেশের সেবায় নিয়োজিত একজন তরুণের এভাবে অকালে চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিকেলে আমরা তার গ্রামের বাড়িতে যাব। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরো জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকেলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সানজিয়া ইসলাম জুই নিহতের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে তাদের বাড়িতে যান।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন