হাসিনাকে প্রশ্ন করে যা জানতে চাইলেন রিজভী

হাসিনাকে প্রশ্ন করে যা জানতে চাইলেন রিজভী
ওলামা দলের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই শেখ হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফেরার কথা বলছেন। তিনি দেশে ফিরতে পারেন, তবে তার বিরুদ্ধে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হবে।

বিজ্ঞাপন

রোববার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, তিনি নাকি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। তাহলে আবু সাঈদদের হত্যার বিচার হবে না? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর মতো অপরাধের বিচার কে করবে?

তিনি আরো বলেন, মাঝেমধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ভারত থেকে তিনি কোথায় নামবেন, প্যারাশুটে নাকি হেলিকপ্টারে? ঢাকায় নামবেন, নাকি গোপালগঞ্জে? বিষয়টি একটু জানিয়ে দিলে ভালো হয়।

রিজভীর ভাষায়, শহীদদের রক্তের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই একজন হত্যাকারী দেশে ফেরার কথা বলছেন। তিনি ফিরতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের সরকার, আইন ও আদালত রয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সবার জন্য আইনের শাসন নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করা হবে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।

অনুষ্ঠানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের সময়ে দেশে বহু রাজনৈতিক দল আবারো রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। গ্রাম-গঞ্জে কৃষি ও উৎপাদন কার্যক্রম নতুন করে গতি পায়। বিভিন্ন এলাকায় খাল খননের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো হয়। অর্থনৈতিকভাবে দেশ স্বাবলম্বী হতে শুরু করে এবং কলকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম সচল হয়।

রিজভী দাবি করেন, জিয়াউর রহমানের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। তখন মানুষ ঘরের দরজা খুলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারত। গ্রাম পুলিশ ও মহিলা পুলিশ ব্যবস্থা তার সময়েই চালু হয়েছিল। গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের একজন শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিককে হত্যা করে।

এরশাদের শাসনামল প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। এর মধ্য দিয়ে দেশে আবারো গণতন্ত্রের অবসান ঘটে। পরে খালেদা জিয়া দীর্ঘ নয় বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয় নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন, জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং বাংলাদেশকে অন্য একটি দেশের আধিপত্যের অধীনে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আধিপত্যবাদী এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধই ছিল ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব। এ কারণেই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর জনগণকে আবারো রাজপথে নেমে আসতে হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় গুম, খুন ও গুপ্তহত্যার মতো ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম ও হত্যা করা হয়েছে। তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

রিজভী বলেন, ছাত্র, তরুণ, শ্রমিক, রিকশাচালকসহ সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ঘটিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে ৭ নভেম্বরের চেতনা ও প্রেরণা কাজ করেছে। ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে জনগণের জেগে ওঠার মধ্যে একই ধরনের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতাকর্মীরা এখনো ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশকে কোনো দেশের অধীনস্থ বা সেবাদাস রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে বিএনপির এই নেতা বলেন, তিনি দেশের মানুষের সামনে স্বাধীনতার চেতনার কথা বললেও ভারতের কাছে গিয়ে নীরব থাকতেন। জনগণের কাছে স্বাধীনতার চেতনার কথা প্রচার করলেও দিল্লির কাছে তার অবস্থান ছিল ভিন্ন।

ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, একসময় তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা না থাকলে নড়াইল থাকবে না। এখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় নেই, তাহলে কি বাংলাদেশে নড়াইলের অস্তিত্ব নেই?

শেখ হাসিনার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রচেষ্টার সমালোচনা করে রিজভী বলেন, অনুগত ও তোষামোদকারীদের ওপর নির্ভর করে তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। একের পর এক বিনা ভোটের নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় তার ধারণা হয়েছিল, সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু তিনি জনগণের শক্তি ও ক্ষোভের গভীরতা বুঝতে পারেননি। যেকোনো সময় জনগণ জেগে উঠতে পারে—এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে।

বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ তুলে ধরে রিজভী বলেন, বিএনপির রাজনীতি সরল ও সঠিক পথের রাজনীতি, যা সিরাতুল মুস্তাকিমের আদর্শ অনুসরণ করে। খালেদা জিয়া তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেননি। তারেক রহমানও অঙ্গীকারের বরখেলাপ করেননি।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন