মিথ্যা তথ্য ও গুজবের বিস্তার

মিথ্যা তথ্য ও গুজবের বিস্তার

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা যতটা সমৃদ্ধ, ততটাই ঝুঁকির মুখে আছি। হাতে একটা স্মার্টফোন থাকলেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তে চলে আসে আমাদের চোখের সামনে। তবে এই সুবিধার সঙ্গে বেড়েছে বড় ধরনের বিপদও। তথ্যের বিশাল ভান্ডারে সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে গেছে এখন। যেকোনো তথ্য গুজবের সঙ্গে এমন সূক্ষ্মভাবে মিশে যাচ্ছে যে, কোনটা আসল খবর আর কোনটা গুজব, তা বোঝাই যাচ্ছে না।

বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বেই মিথ্যা তথ্য ও গুজব এখন একটি ভয়ংকর সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এটি শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করে না, সমাজের শান্তি ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আজকের ডিজিটাল যুগে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, টিকটক আর হোয়াটসঅ্যাপ গুজবকে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই মিথ্যা খবর যাচাই-বাছাইয়ের আগেই মানুষ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

বাংলাদেশে গুজবের কারণে গত কয়েক বছরে অনেক দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি তাসলিমা বেগম রেনু নামের একজন মাকে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা গুজবে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে ২০১৯ সালে। অনেক সময় ধর্মীয় উসকানিমূলক গুজব থেকে সৃষ্টি হয়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিষয়ে ভুল তথ্যের কারণে অনেক সময় মানুষের জীবন পড়েছে ভীষণ সংকটে।

কিছু মানুষ জেনেশুনে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের জন্য গুজব ছড়ায়। আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি লাইক-কমেন্ট-শেয়ার পাওয়ার লোভে যাচাই না করেই গুজব রটিয়ে দেয়। আর সেই গুজব বা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। কারণ সামাজিক মাধ্যমের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে চাঞ্চল্যকর ও আবেগঘন কনটেন্টই বেশি প্রাধান্য পায়; ফলে সত্যের চেয়ে মিথ্যাই মানুষের চোখে বেশি ধরা পড়ে। সেসব তথ্য মানুষের নিজস্ব বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় বলেই অনেকে কোনো প্রমাণ যাচাই না করেই তা শেয়ার করেন। এ কারণেই মিথ্যা তথ্য অনেক সময় সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মিথ্যা তথ্য বেশি চমকপ্রদ ও উত্তেজনাকর হয়, যা মানুষের কৌতূহলকে উসকে দেয় এবং দ্রুত শেয়ার করতে প্ররোচিত করে।

এখন প্রশ্ন জাগছে—তাহলে এই সমস্যার সমাধান আমরা কীভাবে করব? এ বিষয়ে আমাদের মতামত হচ্ছে, এর জন্য একটি শক্তিশালী তথ্য যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যেন শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই কোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বরং এর উৎস যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, পরিবারের অভিভাবক ও প্রবীণদেরও এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার, কারণ সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে সব বয়সের মানুষই ঝুঁকিতে থাকেন।

গুজব ছড়ানোর আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে কিছু অখ্যাত বা অনির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করেই গুজবকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে এই গণমাধ্যমগুলো। তাই প্রতিটি গণমাধ্যমের উচিত একটি শক্তিশালী তথ্য-যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আলাদা তথ্য যাচাইকারী দল রাখা।

ফেসবুক-ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলো যেন মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করা ও অপসারণে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখে, সেজন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

এ ছাড়া প্রতিটি নাগরিকের উচিত কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে একটু ভাবা এবং উৎস যাচাই করে নেওয়া। কারণ গুজব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা তৈরি না হলে যতই আইন বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক না কেন, গুজবের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারি পর্যায়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহের একটি ব্যবস্থা করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, তথ্যের শূন্যতা তৈরি হলেই সেই স্থান দখল করে নেয় গুজব। মানুষ যখন সঠিক তথ্য না পায়, তখন তারা বিভিন্ন অসত্য সূত্রের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়; আর সেখান থেকেই গুজবের জন্ম হয়। তাই তথ্যের প্রবাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন