চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় শিল্প, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিস দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কমটেম্পট নোটিসও দিয়েছে সংস্থাটি।
রোববার বেলার পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংস্থাটির প্রধান সমন্বয়কারী তাসলিমা ইসলাম এ নোটিস দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বেলা চট্টগ্রামের সমন্বয়ক মুনীরা পারভীন রুবা।
নোটিসে তিন সচিবসহ একাধিক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা অবজ্ঞা এবং আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। নোটিসে গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে তিন দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। তা না হলে ইয়ার্ড মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বেলা।
আইনি নোটিসে অন্য বিবাদীরা হলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্সের সভাপতি মহসীন চৌধুরী এবং ফেরদৌস স্টিলের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ।
নোটিসে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানির অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জাহাজভাঙা শিল্প নিয়ে বেলা একাধিক মামলা পরিচালনা করছে। কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শিপইয়ার্ডটি তা মানেনি। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অধিদপ্তরগুলোর গাফিলতি এবং যথাযথ তদারকির অভাবেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে বেলা।
বেলার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একই ইয়ার্ডে এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ছয়বার প্রায় একই ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অপ্রশিক্ষিত অন্তত তিন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত ও আহত শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিলেন সম্পূর্ণ নতুন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে কোনো ধরনের সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই কর্মরত ছিলেন।
নোটিসে বলা হয়, জাহাজভাঙা কার্যক্রম নিয়ে উচ্চ আদালত ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে জাহাজ কাটার আগে ‘গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট’ নিশ্চিত করা, কালো বা ছাই তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ইয়ার্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করতে না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
বেলার অভিযোগ, এসব স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত আইনি নজরদারি ও শিথিলতার সুযোগ নিয়ে ইয়ার্ড মালিকেরা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যা আদালত অবমাননার শামিল।
দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বেলা। সংস্থাটির মতে, জাহাজভাঙা মালিকপক্ষ নিজেরাই স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ। অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় জাহাজ আমদানি ও ভাঙার অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে স্বার্থের সংঘাত থাকায় এসব কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়।
এ কারণে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনার দাবি জানিয়েছে বেলা।
নোটিসে ২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ওই ইয়ার্ডে ঘটে যাওয়া সব মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ, ইয়ার্ড বন্ধ ও অনুমোদন বাতিল, সব অনাপত্তি ও লাইসেন্স বাতিল, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং পাসপোর্ট জব্দসহ আট দফা দাবি জানানো হয়েছে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

