আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নারীদের ওপর সহিংসতা

৯ দাবিতে ইসিতে মহিলা জামায়াতের স্মারকলিপি

স্টাফ রিপোর্টার

৯ দাবিতে ইসিতে মহিলা জামায়াতের স্মারকলিপি

দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐকের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী নারীদের উপর অব্যাহত সহিংসতা, বর্বরোচিত হামলা ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের নেতারা। স্মারকলিপিতে তারা ৯ দফা দাবি জানিয়েছেন।

রোববার বিকালে তারা এই স্মারকলিপি প্রদান করেন। এসময় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান, কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটাারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি সাঈদা রুম্মান ও মারজিয়া বেগম এবং মহিলা বিভাগের কর্মপরিষদ সদস্য ডা. হাবিবা চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

স্মারকলিপি প্রদান শেষে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় তিনি বলেন, প্রধান সৌন্দর্য হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভয়হীন চিত্তে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন নারীদের জন্য এক বিভীষিকাময় অঙ্গন। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোটের নারী কর্মীদের ওপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে পরিকল্পিত ও পৈশাচিক হামলার উৎসব চলছে, তা কেবল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়।

স্মারকলিপিতে তারা বলেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মিছিল, পোস্টার লাগানো, প্রচারণা সভা ও ভোট চাওয়ার সময় নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হুমকি, ইভটিজিং এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার মতো ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এরমধ্যে গত ৯ জানুয়ারি ভোলার লালমোহনের রায়চাঁদ বাজার এলাকায় নির্বাচন প্রচারণার অংশ হিসেবে নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি ভোটার সংযোগ কার্যক্রম চালানোর সময় মৌখিক হয়রানি ও বাধার মুখে পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয় বাজার এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে সংঘর্ষ শুরু হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও শারীরিক হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করায় এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

১৯ জানুয়ারি ভোলার চরফ্যাশনের চর মানিকা ইউনিয়নে এক নারী প্রচারকর্মী প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর শারীরিক হামলা চালানো ঠেকাতে এগিয়ে এলে তার ৯ মাসের অন্ত:সত্ত্বা কন্যাকেও পেটে লাথি মারা হয়। মা ও মেয়ে দুজনেই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঘটনাটি নির্বাচনকালীন নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এছাড়া গত ২২ জানুয়ারি নাটোর-২ (সদর) আসনে চাটনি ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনেই নারী কর্মীদের পথরোধ করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। ২৪ জানুয়ারি মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে নারী প্রচারকর্মীরা বাড়ি বাড়ি ভোট চাইতে গেলে তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়। এতে তারা কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হন। নারী কর্মীদের রক্ষায় এগিয়ে এলে কয়েকজন পুরুষ কর্মীর ওপর হামলা চালানো হয়। ২৫ জানুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছার কীর্তিপুর গ্রামে নারী প্রচারকর্মীদের একটি দলের ওপর দলবদ্ধ হামলা চালানো হয়। তাদের মারধর করা হয় এবং মোবাইল ফোন ভাঙচুর করা হয়। নগদ অর্থসহ ব্যক্তিগত ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় সেখানে নারী কর্মীদের প্রচারণা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া যশোর- ৩ আসনে, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায়, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ঢাকা মহানগর কদমতলীতে, কুষ্টিয়ার ৩ আসনে, টাঙ্গাইল-২ আসনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় জামায়াতের নারী কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা, প্রচারণা কার্যক্রমে বাধা দেওয়া ও হয়রানি করা হয়েছে। এছাড়াও সারাদেশে অহরহ নির্বাচনী প্রচরণায় বাধা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে।

তারা মনে করেন, নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত। নির্বাচনকালীন এ ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ এবং নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে। এমতাবস্থায়, তারা নির্বাচন কমিশনের নিকট ৯ দফা দাবি ও সুপারিশ পেশ করেন।

তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- নির্বাচন প্রচারণাকালে নারী কর্মী, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা, হয়রানি ও হুমকিকে আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান কার্যকর, নির্বাচনকালীন নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা, প্রত্যেক এলাকায় নারী প্রার্থী ও প্রচারকর্মীদের জন্য বিশেষ পুলিশ টহল, মোবাইল টিম ও নিরাপত্তা প্রটোকল চালু, নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি পৃথক নারী-সংবেদনশীল হেল্পলাইন, অভিযোগ ডেস্ক ও অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম চালু করে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত; কোনো প্রার্থীর সমর্থক বা কর্মীর দ্বারা নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে দায়ী করে সতর্কতা, জরিমানা বা প্রার্থিতা বাতিলের বিধান কার্যকর; নারী নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশ বা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা; হিজাব, পোশাক, লিঙ্গ বা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, হুমকি ও অপমানকে নির্বাচন আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ; যেসব এলাকায় নারী কর্মীদের ওপর বারবার হামলার ঘটনা ঘটছে, সেসব এলাকা ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে সেখানে অতিরিক্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত; নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে একটি ‘নারী-সহিংসতামুক্ত নির্বাচন’ নীতিগত ঘোষণা দিয়ে সকল প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার গ্রহণ করতে হবে।

নারী নেতারা মনে করেন, ভোট একটি সার্বজনীন ও মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার। দেশের প্রতিটি নাগরিক শান্তিপূর্ণ ও স্বাধীনভাবে যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে এবং নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই সাংবিধানিক অধিকারে বাধা প্রদান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুতর হুমকি এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিপন্থী। এমতাবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে সারাদেশে অবাধ ও নিরাপদ প্রচারণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের সময়োপযোগী, কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্রের সূর্য যেন সহিংসতার মেঘে ঢাকা না পড়ে সেই প্রত্যাশায় আপনার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ এবং নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশে একটি ভীতিহীন ও মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে পাড়ায় পাড়ায় ‘শান্তি কমিটি’গঠন নিয়ে বিএনপির অভিযোগকে ‘অসুস্থতার লক্ষণ’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

তিনি বলেছেন, ‘এই সমস্ত আজগুবি অভিযোগ কোনো সুস্থ মাথা থেকে আসতে পারে না। কোনো সুস্থ দল বা লোক এই ধরনের অভিযোগ করতে পারে না। একদল লোক জনগণের বিপুল সমর্থন দেখে ভীত হয়ে এই সমস্ত কথা বলছে। এটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। আমরা তাদের সুস্থতার জন্য দোয়া করি।’

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে দেশের বিভিন্নস্থানে জামায়াতের মহিলা কর্মীদের ওপর হামলার বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব বলেন। এ সময় তার সঙ্গে সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান এবং জামায়াতের মহিলা শাখার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর বিষয়ে বিএনপির অভিযোগ বিষয়ে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমরা কোথায় কী করি, তা আপনারা দেখেন। আমাদের কোনো প্রচারণাই রাতের অন্ধকারে নয়, দিনের আলোতেই হয়। আমাদের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিদিন জেলা সফর করছেন। ইতিমধ্যে তিনি ৩৫টি জেলা সফর করেছেন এবং সমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। সবই স্পষ্ট। আমাদের নায়েবে আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলরাও যাচ্ছেন। এই সমস্ত কথা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি অপপ্রয়াস মাত্র। এটি মোটেই সঠিক নয়।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...