আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জামায়াত আমিরকে নিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদন

তার সংযত আচরণ নজর কাড়ছে সবার, দেখা করতে উন্মুখ সবাই

আমার দেশ অনলাইন

তার সংযত আচরণ নজর কাড়ছে সবার, দেখা করতে উন্মুখ সবাই
তরুণদের সঙ্গে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে অতীতে জামায়াতে ইসলামীকে এড়িয়ে চলা লোকের সংখ্যাই ছিল বেশি। জুলাই বিপ্লব সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এখন দেশের অভিজাত মহল থেকে শুরু করে বিদেশি কূটনীতিক— সবাই দলটির প্রধান ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে একের পর এক লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার মতে, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে শীর্ষ অবস্থানের জন্য হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জামায়াত এগিয়ে আসায় অভিজাত মহলের দৃষ্টিভঙ্গিতে দৃশ্যমান এই পরিবর্তন আসে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান একটি উচ্চাভিলাষী নির্বাচনি ইশতেহার উন্মোচন করেন। ঢাকার অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ এই ইশতেহার বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের নেতৃত্বের কাছে এই ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য আর্থিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে বরং তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরা।

দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচকেরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দল জামায়াতকে এমন একটি দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, যারা ধর্মীয় মতাদর্শের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। যাদের তরুণ, বৈচিত্র্যময় ও ভবিষ্যৎমুখী জনগোষ্ঠীকে শাসন করার সক্ষমতা নেই। কিন্তু নতুন ইশতেহারটি একটি ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করছে। যেখানে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলকে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে তাদের ধর্মীয় ভিত্তি ও আধুনিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই।

একসময় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী অভিজাত শ্রেণি ও বিদেশি কূটনীতিকরা হয় জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন, নয়তো গোপনে যোগাযোগ করতেন। এখন সেই যোগাযোগ প্রকাশ্যেই হচ্ছে।

গত কয়েক মাসে ইউরোপীয়, পশ্চিমা এমনকি ভারতীয় কূটনীতিকরাও শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করেছেন। অথচ এই একই ব্যক্তি অল্প কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকের কাছে প্রায় রাজনৈতিকভাবে ‘অস্পৃশ্য’ বলে বিবেচিত হতেন।

যে নেতার দল দুই বার নিষিদ্ধ হয়েছে তার জন্য আসন্ন নির্বাচন এমন একটি প্রশ্ন সামনে আনছে, যা এক বছর আগেও খুব কম মানুষ সাহস করে করতে পারত। আর তা হচ্ছে—শফিকুর রহমান কি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন?

‘মানুষের জন্য লড়ব’

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াত এখন দেশের অন্যতম দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব কিছু জরিপে দলটিকে সরাসরি বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখানো হচ্ছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের মতে, এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শফিকুর রহমান।

সিলেট অঞ্চলে জামায়াতের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় শফিকুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জুবায়ের বলেন, এই পুনরুত্থান এসেছে তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজনীতিতে টিকে থাকার সংগ্রামের ফল হিসেবে।

শফিকুর রহমান অত্যন্ত নম্রভাষী একজন চিকিৎসক। যিনি ২০১৯ সালে জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব নেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে গভীর রাতে তাকে ‘জঙ্গিবাদে সহায়তার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ১৫ মাস পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। ২০২৫ সালের মার্চে ওই মামলায় অভিযুক্তদের তালিকা থেকে শফিকুর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। এর পর থেকে জনসমক্ষে তার সংযত ও আবেগঘন উপস্থিতি ব্যাপক মনোযোগ কাড়ছে।

গত জুলাইয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে প্রচণ্ড গরমজনিত অসুস্থতায় মঞ্চে তিনি দুবার জ্ঞান হারান। চিকিৎসকদের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

তিনি বলেন, আল্লাহ যতদিন আমাকে জীবন দেবেন, আমি মানুষের জন্য লড়াই করব। আমি তরুণদের স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমরা তোমাদের পাশেই আছি।

জামায়াতের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন

বর্তমানে টানা তৃতীয় মেয়াদে দলের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. শফিকুর রহমান। দলের ভেতরে তার কর্তৃত্ব এখন সুদৃঢ়।

লোকমান হোসেন নামে ঢাকার একজন জামায়াত সমর্থক দলের আমির সম্পর্কে বলেন, তিনি একজন ভালো ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। দলে সবাই তাকে বিশ্বাস করে।

তবে শফিকুর রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু নির্বাচনি নয়—এটি মূলত ভাবমূর্তির।

নতুন সমর্থকরা জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে থাকায় শফিকুর রহমান দলটির পরিচয় নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। যেখানে জামায়াতকে কেবল ধর্মীয় মতাদর্শ ও ইতিহাস দ্বারা সংজ্ঞায়িত একটি ইসলামপন্থি শক্তি হিসেবে নয়, বরং সুশাসন, শৃঙ্খলা ও পরিবর্তনের বাহক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রূপান্তর বাস্তবিক নাকি কেবল বাহ্যিক—তা-ই নির্ধারণ করবে শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব ও জামায়াতের ভবিষ্যৎ।

ঐতিহ্যগত সমর্থকদের আনুগত্য ধরে রেখে নতুন ভোটার ও বিদেশি মহলকে আশ্বস্ত করার জামায়াতের প্রচেষ্টা এক ধরনের স্থায়ী টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। যার ফল হিসেবে প্রায়ই দ্বৈত বার্তা দেখা যাচ্ছে।

এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত। ডা. শফিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জামায়াত একটি মধ্যপন্থি দল এবং দলটি ইসলামী আইন কঠোরভাবে চাপিয়ে দেবে না।

এ ছাড়া দলটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে।

জেন-জিদের ‘দাদু’

দেশব্যাপী নির্বাচনি প্রচারে তরুণ সমর্থকদের প্রায়ই শফিকুর রহমানকে ‘দাদু’ বলে ডাকতে শোনা যাচ্ছে। সাদা দাড়িওয়ালা, নম্রভাষী এবং সমর্থকদের প্রতি দৃশ্যমানভাবে মনোযোগী শফিকুর রহমান সেই প্রতিচ্ছবির সঙ্গেই মানানসই।

চট্টগ্রামের তরুণ জামায়াত সমর্থক আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, তিনি তার কথার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন। তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে দাদু আর নাতি-নাতনিদের সম্পর্কের মতো একটা অনুভূতি আছে। যেখানে বিএনপির নেতারা প্রায়ই তরুণদের তাচ্ছিল্য করেন, সেখানে শফিকুর রহমান তাদের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জুবায়ের বলেন, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনো বাংলাদেশি আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিকে সমর্থন করলে দলের অংশ হতে পারেন। আমরা দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি, শৃঙ্খলা ও জনসেবার ওপর জোর দিচ্ছি। বন্যা, কোভিড কিংবা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানুষ আমাদের নেতাদের পাশে পেয়েছে। এ কারণেই সমর্থন বাড়ছে।

জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণা নন্দীও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, যখন কোনো পরিবার দারিদ্র্যে পড়ে, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কল্যাণমূলক নেটওয়ার্ক ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়েই পাশে দাঁড়ায়। এই সেবামূলক সংস্কৃতিই বোঝায় কেন অনেক নাগরিক জামায়াতকে স্লোগানের দল নয়, বরং শৃঙ্খলা, কাঠামো ও দায়িত্ববোধের দল হিসেবে দেখেন।

জামায়াতের যোগাযোগ এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত হয়েছে। জুবায়ের বলেন, শফিকুর রহমান অসুস্থ থাকার সময় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিকরা সৌজন্য সাক্ষাতে তার সঙ্গে দেখা করেছেন। গত মাসে ভারতীয় হাইকমিশনে আয়োজিত ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনায় জামায়াত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়—যা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপীয় ও পশ্চিমা কূটনীতিকরাও শফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে ওয়াশিংটনেও।

আন্তর্জাতিক পরিসরে জামায়াতের যোগাযোগ বাড়তে থাকা এবং শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী নির্বাচনি শক্তি হিসেবে উঠে আসার প্রেক্ষাপটে, অনেক সাধারণ সমর্থক শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করছেন।

শফিকুর রহমানের ঢাকার নির্বাচনি এলাকার ভোটার আবুল কালাম বলেন, তিনি একজন দেশপ্রেমিক। তিনি প্রধানমন্ত্রী হোন বা বিরোধী দলের নেতা—যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, তিনি আমাদের ভালোভাবে নেতৃত্ব দেবেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...