আওয়ামী ঠিকাদারদের সঙ্গে সখ্য, ঝালকাঠি এলজিইডির কাজে ধীরগতি

আওয়ামী ঠিকাদারদের সঙ্গে সখ্য, ঝালকাঠি এলজিইডির কাজে ধীরগতি

ঝালকাঠিতে আওয়ামী ঠিকাদারদের সঙ্গে এলজিইডি কর্মকর্তাদের সখ্যের অভিযোগে দুটি সড়ক ও পাঁচটি ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের কাজে চলছে ধীরগতি। এসব কাজের প্রায় সবকটির নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও কোনো কোনোটির ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে দাবি করা হলেও বাস্তবে আরো কম হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এদিকে কাজ অসম্পূর্ণ রাখলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদাররা এলজিইডির সঙ্গে যোগসাজশ করে দফায় দফায় কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে কালক্ষেপণ করছেন। এতে অর্ধসমাপ্ত সড়ক ও ব্রিজে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী। এসব বিষয়ে তথ্য চাইতে গেলে জেলা ও উপজেলা কার্যালয় পরস্পরের দিকে দায় ঠেলে দেয়।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী ঠিকাদারদের এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ছাড় দেওয়ার কারণে তারা কাজে গাফিলতি করছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ব্রিজের ঢাল হতে হিমানন্দকাঠি হয়ে বেরমহল পর্যন্ত সড়কটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের মে মাসে। কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর। অথচ এখনো ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলছে এ সড়কের কাজ । গত ১৭ আগস্ট এলজিইডির দেওয়া তথ্যমতে সড়কটির কাজের মেয়াদও এখন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়নি।

৫.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ৫ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছে। এ সড়কটির কাজ করছে ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম তালুকদারের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্স। এলজিইডি কর্তৃপক্ষ সড়কটির কাজ ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে দাবি করলেও এলাকাবাসী বলছেন ভিন্ন কথা।

যদিও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কটির কাজ সম্পন্ন করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার মৌখিকভাবে নির্দেশ এবং চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

জেলার নলছিটি উপজেলার দরগাবাড়ী এলাকার খয়রাবাদ ব্রিজটি এখন গ্রামবাসীর গলার কাঁটা। ১২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৩০ মিটার দৈর্ঘ্য নির্মাণাধীন এ ব্রিজটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের মে মাসে। কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিলে। অথচ কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএম বিল্ডার্স এবং পোদ্দার এন্টারপ্রাইজ ইতোমধ্যে ২০ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছে। পোদ্দার এন্টারপ্রাইজ আওয়ামী লীগ নেতা বলরাম পোদ্দারের মালিকানাধীন বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, কাজের গতি খুবই ধীর। কবে নাগাদ জনগুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজটির কাজ শেষ হবে, তা নিয়ে তারা শঙ্কায় রয়েছেন। মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ না হওয়ায় কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে এলজিইডির তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা জানালেন, সময় বৃদ্ধি প্রক্রিয়াধীন ।

এদিকে নলছিটির খেজুরতলা থেকে শিমুলতলা হয়ে হালতা পর্যন্ত সড়কটি এখন জনদুর্ভোগের কারণ। ৪ কিলোমিটার সড়কটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে। কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আর কোনো সময় বৃদ্ধি করা হয়নি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়কটির কাজ চলছে শ্লথগতিতে। যদিও এলজিইডি বলছে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ধরা সড়টির ৫ কোটি টাকা ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল ইসলাম তালুকদারের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্স তুলে নিয়েছে। কাজটি কবে শেষ হবে, তা কেউই জানেন না।

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায়ও দেখা গেছে একই চিত্র । রাজাপুরের শুক্তাগড়-সাঙ্গর আয়রন ব্রিজটি ভেঙে জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করায় ব্রিজটি ভেঙে যায়। এ ব্রিজটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৯ জুলাই আর কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ২০ মে।

১৬ মিটার দৈর্ঘ্য ব্রিজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন সুরুজের মালিকানাধীন শান্ত এন্টারপ্রাইজ। ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা আয়রন ব্রিজটির এখন আবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সে মেয়াদও শেষ হবে আগামী সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখ। কিন্তু গত ১৭ তারিখ পর্যন্ত ব্রিজটির কাজ শুরুই হয়নি।

এদিকে রাজাপুর গালুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রবেশদ্বারের সেতুতে এখন রোগীদের উঠতে হয় মই দিয়ে। আবার সেতুর ওপারে গিয়ে নামতেও হয় মই দিয়ে। এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুতে কোনো এপ্রোচ সড়ক নেই। এ সেতুটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। শেষ হওয়ার কথা ২০২১ সালের মে মাসে। অথচ এখনো সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়নি।

কাজ শেষ না করায় অবশেষে সেতুটির পুনঃটেন্ডার করা হয়েছে। গত সোমবার এই টেন্ডার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

জানা যায়, এ কাজের ঠিকাদার ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সৈয়দ হাদিসুর রহমান মিলন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক কোটি ১০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। তবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ঠিকাদারের জামানত ও পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাতিল করা হয়েছে।

এলাকাবাসী বলছেন, রাজাপুর উপজেলার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার পূর্বের ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কারণে পুনঃটেন্ডার প্রক্রিয়া এত দেরিতে হলো।

ঝালকাঠি জেলার উপকূলীয় কাঠালিয়া উপজেলায়ও এলজিইডির কাজে ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। এখানে ধোপার নদীর ব্রিজের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ২৭ এপ্রিলে। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর। এরপর একবার কাজের সময় বৃদ্ধি করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুপ্তি কনস্ট্রাকশন। বাড়ানো সময় অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবারও সময় বৃদ্ধি করিয়ে নেয়। চলতি মাসের ৩০ তারিখে সে সময়ও শেষ হয়ে যাবে। অথচ এলজিইডির তথ্যমতে এখনো ব্রিজের কাজ ৩০ শতাংশ বাকি। ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ ব্রিজটির ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল নিয়েছে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে কাঠালিয়া মাঝিবাড়ি ব্রিজের কাজ এখন বন্ধ। যদিও এলজিইডি কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্রিজটির ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৪০ মিটার দৈর্ঘ্য ব্রিজটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএম এন্টারপ্রাইজ বিল তুলে নিয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

প্রথমে কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ১০ মার্চ। পরে সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে চলতি মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত। তবে কাজ বর্তমানে বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে এমএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমান আমার দেশকে বলেন, ব্রিজের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ওখানে বন বিভাগের ৫টি গাছ রয়েছে। গাছগুলো না কাটলে আমরা বাকি কাজ করতে পারছি না। গাছ কাটা হলেই বাকি কাজ শেষ হবে।

কাজে ধীরগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী মাহমুদুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, আমি নতুন এসেছি। সবকিছু এখনো জেনে উঠতে পারিনি। তবে যেসব কাজের ধীরগতি রয়েছে, তাদের মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। তারপরও কাজ না করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন